১৯৮২ বিশ্বকাপ থেকে শুরু করা যাক। সেবার বিশ্বকাপ শেষ হওয়ার পর ফিফার প্রেসিডেন্ট হোয়াও হাভেলাঞ্জ মেক্সিকো সিটির উদ্দেশে রওনা হন। তিনি যে বিমানে করে যাত্রা করেন, সেটির মালিক ছিল এমিলিও আজকারাগা—টেলিভিসা মেক্সিকানার মালিক। পরের বিশ্বকাপে মেক্সিকো স্বাগতিক হিসেবে নির্ধারিত হলেও কলম্বিয়া মনে হয় সেদিনই বুঝে গিয়েছিল, তাদের কপালে ’৮৬ বিশ্বকাপ আয়োজনের স্বত্ব নেই।

অবাক করা বিষয়, ’৮৬ বিশ্বকাপে ম্যারাডোনার খেলাই বিস্ময়। কয়েক মাস আগে বার্সেলোনার হয়ে ম্যাচে এক জঘন্য ফাউলে ম্যারাডোনার পা ভেঙে কয়েক টুকরা হয়ে যায়। মনের জোর আর কঠোর সাধনায়, মাত্র ১০৬ দিনের মাথায় ম্যারাডোনা আবার মাঠে নামেন। কিন্তু ডান হাঁটু প্রায় অবশই থাকত বেশির ভাগ সময়। ইনজেকশন দিয়ে পা ঠিক করতে হয়েছে। এই অবস্থায় পায়ের ধাপ ফেলাই যেখানে বিপজ্জনক, ম্যারাডোনা সেখানে ধীরে ধীরে সুস্থ হয়ে বিশ্বকাপে খেলেন। পুরো টুর্নামেন্টে একটিবারের জন্যও বুঝতে দেননি, কী অসম্ভব শারীরিক যন্ত্রণা সয়ে খেলছেন!

আর্জেন্টিনা দলের কোচ ছিলেন ডক্টর কার্লোস বিলার্দো। খেলার পাশাপাশি বুয়েনস এইরেসের বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ডাক্তারিটাও পাস করেন, ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডকে হারিয়ে এস্তোদিয়ান্তেস দোলা প্লাতার ইন্টারকন্টিনেন্টাল কাপ জেতায় দারুণ ভূমিকা রেখেছিলেন। তবে ১৯৭৬ সাল থেকে চিকিৎসাবিদ্যা ছেড়ে তিনি কোচিংকেই ধ্যানজ্ঞান করেন।

বিলার্দোর খেলানোর ছক ৩-৫-২ ছিল অনেকের জন্যই অপছন্দের। এর মধ্যে ছিলেন তাঁর নিজের বাবাও। এমনকি দেশের প্রেসিডেন্ট রাউল আলফোনসিন প্রকাশ্যেই বিলার্দোর কৌশলের সমালোচনা করেন। বিলার্দো তবু টিকে যান প্রিয় শিষ্য ম্যারাডোনার দৃঢ়তায়। বিলার্দোকে বাদ দিলে আমাকেও বাদ দিতে হবে, মুখের ওপর তিনি এই কথা বলে দেন। এরপরই শুরু হয় দুজনের এক ঐতিহাসিক অভিযাত্রা। যদিও দুজনের সম্পর্কটা সব সময়েই মধুর ছিল না। বরং সাংবাদিক ড্যানিয়েল আরকুচির সঙ্গে লেখা বইয়ে ম্যারাডোনা বেশ কয়েকবার উল্লেখ করেন, তিনি ও অন্যরা প্রায়ই বিলার্দোর ওপর ভীষণ খেপে যেতেন।

কোরিয়ার সঙ্গে প্রথম ম্যাচ খেলার আগে শাপেবর হয় সিনিয়র খেলোয়াড় ড্যানিয়েল পাসারেলার চোট। এই ইনজুরি দলের সংহতি বাড়িয়ে দেয়। কোরিয়ানরা প্রচুর ফাউল করলেও ম্যারাডোনা তিনটি ‘অ্যাসিস্ট’ করেন, আর হোর্হে ভালদানো সেদিন দুই গোল দিয়েছিলেন।

ভালদানোর মনে হয়েছিল, ছয় মিনিটের মাথায় প্রথম গোলটি দিয়ে যে স্বস্তি লাভ করেছিলেন, তা ফাইনালের গোলের চেয়েও বেশি ছিল! খেলায় ৩-১ গোলে জয়ের জন্য আলবিসেলেস্তেরা কোরিয়ান গোলকিপারকেও ধন্যাবাদ দিতে পারেন। ‘ওহ’ নামের এই গোলকিপারকে দেখে তাঁর নামটা অস্ফুটভাবে উচ্চারণ করেছিলেন প্রায় সব দর্শকই।

পরের ম্যাচে আর্জেন্টিনা ইতালির সঙ্গে ড্র করে। সেদিন ইতালির কড়া ডিফেন্স ম্যারাডোনা বারবার ভাঙলেও দল গোল পায় একটিই, সেটিও তাঁর পা থেকেই। পরের খেলায় বুলগেরিয়ার বিপক্ষে অবশ্য গোল পান ভালদানো আর হোর্হে বুরুচাগা। আরেক কিংবদন্তি ফ্রান্সের প্লাতিনিও ভালো শুরু করতে পারেননি। ফ্রান্স গ্রুপ ‘সি’–এর প্রথম ম্যাচ কোনোমতে এক গোলে জেতে কানাডার বিরুদ্ধে, ড্র করে গ্রুপ চ্যাম্পিয়ন সোভিয়েত ইউনিয়নের বিরুদ্ধে।

ব্রাজিলও প্রথম ম্যাচ কোনোমতে জেতে স্পেনের বিরুদ্ধে আর পরের ম্যাচে আলেজরিয়ার বিপক্ষে জয়টাও কষ্টেসৃষ্টে। তবে ব্রাজিল স্বরূপে ফিরে আসে গ্রুপের শেষ ম্যাচে উত্তর আয়ারল্যান্ডের বিরুদ্ধে। কারেকার জোড়া গোল আর চনমনে রাইট ব্যাক জোসিমারের এক গোলের দিন আলেমাও, ব্রাংকো জুনিয়ররা ‘জোগো বনিতো’র (সুন্দর ফুটবল) পসরা সাজিয়ে বসেন।

সেই যুগের এত তারকার মধ্যেও জ্বলজ্বল করা মাইকেল লাউড্রপের ডেনমার্ক ‘ই’ গ্রুপে সেরা হয় পশ্চিম জার্মানি আর উরুগুয়েকে পেছনে ফেলে। লা লিগায় টানা পাঁচ বছর শিরোপা জেতা, রিয়াল মাদ্রিদ ও বার্সেলোনা উভয় ক্লাবেই কিংবদন্তির সম্মান পাওয়া লাউড্রপ ডেনমার্কের মতো শক্তিতে ‘ছোট দেশের’ হয়ে খেলাতেই সম্ভবত কিংবদন্তিদের কাতারে সেভাবে বিবেচিত হন না।

সবচেয়ে বড় চমক ছিল অবশ্য গ্রুপ এফ ‘এ’। ইংল্যান্ড, পোল্যান্ড আর পর্তুগালকে পেছনে ফেলে চ্যাম্পিয়ন হয় মরক্কো। দ্বিতীয় রাউন্ডে উরুগুয়ের সঙ্গে ম্যারাডোনা গোটা চারেক সুযোগ বানিয়ে দিলেও দল জেতে মাত্র এক গোলে। সে রাউন্ডের সেরা ম্যাচে বেলজিয়াম ৪-৩ গোলে হারায় সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নকে। পোল্যান্ডকে হারায় ব্রাজিল। আর প্লাতিনির ফ্রান্স ১৯২০ সালের পর প্রথমবারের মতো ইতালিকে হারিয়ে কোয়ার্টার ফাইনালে জন্ম দেয় বিশ্বকাপ ইতিহাসের অন্যতম সুন্দর এক ম্যাচের।

ইতালিয়ানদের ‘ঘরের শত্রু বিভীষণ’ প্লাতিনি ছিলেন ইতালিয়ান লিগের সে সময়ের সেরা খেলোয়াড়, তিনি দলকে জেতান ২-০ গোলে। ফ্রান্স ১৯২০ সালের পর প্রথম কোনো আন্তর্জাতিক স্বীকৃত ম্যাচে হারায় ইতালিকে। একদিকে সক্রেটিস আর অন্যদিকে প্লাতিনি। কিন্তু ম্যাচের নায়ক হয়ে ওঠেন ফরাসি গোলরক্ষক জোয়েল ব্যাটস। সেই ব্যাটস, যিনি শিশুদের জন্য কবিতা আর গান লিখতেন, ক্যানসারকে জয় করে ফিরে আসেন ফুটবলে।

আর্জেন্টিনার ফুটবল ‘ঈশ্বর’

ঈশ্বর দুনিয়ায় আসার আগে নানা লক্ষণ দেখা যায়, কখনো দূর আকাশে তারা জ্বলে ওঠে, বাতাসে গন্ধ পাওয়া যায়, বহু বছর আগ থেকে তাঁকে নিয়ে লেখা হয় কিংবদন্তি—আর্জেন্টিনার ফুটবল ‘ঈশ্বর’ ম্যারাডোনাকে নিয়ে এমন সব কিংবদন্তি রচনা করেছিল সে দেশের বিখ্যাত সংবাদপত্র ‘এল গ্রাফিকো’র উরুগুইয়ান সম্পাদক রিকার্ডো লরেঞ্জো। দুনিয়ার কাছে যিনি বোরোকোটো নামেই পরিচিত।

গত শতাব্দীর বিশের দশক, আর্জেন্টিনা তখন লাতিন আমেরিকায় অর্থনৈতিক উন্নয়নের এক জ্বলজ্বলে দেশ, লাখ লাখ অভিবাসীর স্বপ্নভূমি। নিজেদের পরিচয়ে উদ্ভাসিত হতে চাওয়ায় বিভোর এই জাতির ঐক্যের প্রতীক হয়ে উঠছে ফুটবল।
এল গ্রাফিকো–জুড়ে তখন অবশ্য বিতর্ক চলছে ফুটবলের প্রকরণটা সে দেশে কেমন হবে। ব্রিটিশদের এই খেলা সে দেশের কলোনিয়াল প্রভুদের কাছে ছিল শৈর্য, পৌরুষত্ব আর ভিক্টোরিয়ান নৈতিকতার প্রতীক।

অন্যদিকে আর্জেন্টাইনরা খেলাটা শিখেছে আস্তাবলে, ঘিঞ্জি–বস্তির খোলা জায়গায়, ব্যস্ত রাজপথে। ইংরেজদের এই খেলা তাদের কাছে পরিণত হয়েছিল রাস্তায় টিকে থাকার কৌশল, ধূর্ততা আর চতুরতার সঙ্গে যেকোনো মূল্যে জয় তুলে নেওয়া।

বোরোকোটা তাই ঘোষণা দেন, আর্জেন্টিনার ফুটবল ‘ঈশ্বর’ ব্রিটেনের মতো নয়। আর্জেন্টিনার দেবতার মূর্তি কেমন হবে, তা তিনি বলে দেন ১৯২৮ সালে, ‘এক জীর্ণ পোশাকের নোংরা চেহারার বস্তির ছেলে, সিংহের কেশরের মতো চুলগুলোতে কখনো চিরুনির ছোঁয়া পড়েনি, বুদ্ধিদীপ্ত, চঞ্চল, ফক্কড়বাজ, এক জোড়া প্রত্যয়দীপ্ত চোখে জ্বলজ্বলে চাহনি আর চুরি করে জেতার খুশি ছড়িয়ে পড়া হাসির আভা, মুখভর্তি ছোট ছোট দাঁত, যেগুলো বাশি রুটি খেয়ে ক্ষয়ে গেছে।’

‘তাঁর ট্রাউজারের এখানে–সেখানে তালি মারা, গেঞ্জিতে আর্জেন্টিনার ডোরাকাটা দাগ, বহু ব্যবহারে জায়গায় জায়গায় এমনভাবে ক্ষয়ে গেছে মনে হয় অদৃশ্য ইঁদুরে কেটেছে…হাঁটুগুলো ভরে আছে ক্ষতের দাগে, যেগুলো তৈরি হয়েছে ভাগ্যের কশাঘাতে, খালি পায়ে কিংবা ছেঁড়া জুতা পায়ে, যার ছিদ্র দিয়ে বেরিয়ে থাকা বুড়ো আঙুল সাক্ষী হয়ে আছে অসংখ্য শটের। তার ভঙ্গিটা খুব চেনা, যেন সে ছেঁড়া কাগজ দিয়ে বানানো বল দিয়ে ড্রিবল করছে।’

(*পিকারেস্ক শব্দটা ইংরেজি বা বাংলায় অনুবাদ করা অসম্ভব প্রায়। স্প্যানিশ সাহিত্যে এই ধারা খুব গুরুত্বপূর্ণ। বস্তির শিশুরা ছোটবেলা থেকে নানা রকম বাটপারি করে জীবনে টিকে থাকার বুদ্ধিদীপ্ত গল্পগুলোই পিকারেস্ক। এই সাহিত্যে চুরি করাটাকে মহৎ হিসেবে দেখানো হয়। কাসা দো পাপেল বা মানি হাইস্ট ওয়েব সিরিজ যাঁরা দেখেছেন, তাঁরা পিকারেস্কের ধারণা পেয়েছেন)।

ম্যারাডোনার বাবা ছিলেন দেশের উত্তর–পূর্বাঞ্চলের করিয়েন্তেসের একজন নৌকার মাঝি। তিনি বুয়েনস এইরেসে এসে স্ত্রীকে সঙ্গে নিয়ে থাকেন। তাঁর স্ত্রী লোকের বাড়িতে কাজ করতেন। এই দম্পতি ভিয়া ফিয়োরিতো নামক এমন এক বস্তিতে ছিলেন, যা ছিল অপরাধের প্রাণকেন্দ্র। দারিদ্র্য আর অপরাধের মধ্যে বেড়ে উঠতে থাকা শিশু ম্যারাডোনা একদিন খোলা ড্রেনে পড়ে যান।

দূর থেকে তাঁর চাচা সিরিলো তা দেখে চিৎকার করে বলেন, ‘দিয়েগিতো, তোমার মাথাটাকে গুয়ের দলা থেকে ওপরে তুলে রাখো।’ সেদিন বেঁচে যাওয়া বাচ্চাটার মাথায় বেঁচে থাকার মন্ত্র গেঁথে গিয়েছিল। সারা জীবন সে ঠিক এই চেষ্টাই করে গেছে। আসলে ম্যারাডোনার গল্পটা যদি সিনেমা হয়, তবে সেই শিশু বয়সের দৃশ্যটা হচ্ছে মাস্টার শট, যা বারবার তাঁর জীবনের সংগ্রামকে তুলে ধরে।

বস্তিতে বিদ্যুৎ কিংবা ট্যাপের জল ছাড়া বড় হওয়া ম্যারাডোনা কখনো রাজপথে ট্যাক্সির দরজা খুলে বা মুছে দিয়ে, ভাঙারি বা সিগারেট অথবা সংবাদপত্র বিক্রি করে জীবনধারণ করতেন শৈশব থেকে। আর খেলতেন ফুটবল। ভাগ্যক্রমে পাওয়া এক ছবিতে দেখা যায়, চার কি পাঁচ বছর বয়সের ম্যারাডোনা কাগজের বল দিয়ে লাথি মারছেন এক তারজালের বেড়ায়, যা বলের আঘাতে বিক্ষত। বোরোকোটো এমন এক ছবির কথা তথা ফুটবলের এই শিক্ষার কথাই বলতেন।

বিশ্ব অবাক হয়ে দেখে বোরোকোটোর বিবরণের মতোই এক অবতার হাজির হলেন মেক্সিকোতে। বিশ্বকাপের ইতিহাসে সেরা একক পারফরম্যান্স করলেন তিনি, দলীয় খেলা ফুটবলেও একাই একটা দলকে করলেন চ্যাম্পিয়ন। শুধু যে অনবদ্য কিছু গোল দিলেন তা–ই না, সেই গোলগুলো হলো আর্জেন্টিনার বস্তিতে বেড়ে ওঠাদের মতো, সেই খেলা দিয়েই বিশ্বজয় করলেন, তা–ও ইংরেজদের হারিয়েই।

২২ জুন, ১৯৮৬। ঠিক দুপুরবেলা, অ্যাজটেকা স্টেডিয়ামের ১ লাখ ১৫ হাজার দর্শক আর টিভিতে কয়েক কোটির সামনে ‘ঈশ্বর’–এর বোধন হয়। প্রথমার্ধটা মোটামুটি নীরস হওয়ার পরে দ্বিতীয়ার্ধের ৬ থেকে ১০ মিনিট, ফুটবল বিশ্ব দেখল ঈশ্বরের দুই রূপ। একটি হাতের গোল, অন্যটি পায়ের গোল। একটা বস্তি থেকে উঠে আসা যে মূল্যে জিততে চাওয়া এক ‘এল পিবে’র গোল, আরেকটি শিল্পের চূড়ান্ততম নিদর্শন।

এরপর? সেমিফাইনালে আবার বেলজিয়ামের বিপক্ষে ঐশ্বরিক প্রদর্শনী, ফাইনালে দলকে জেতানো। ম্যারাডোনার হাতে কাপ। একদল উচ্ছ্বসিত ভক্তের কাঁধে তাঁর অমর ছবি। এই ছবির গুরুত্ব কী? এরপর সম্ভবত আর কোনো দিন কোনো খেলোয়াড় বিশ্বকাপ জয়ের পর এভাবে ভক্তদের কাঁধে চেপে কাপ হাতে উদ্‌যাপন করতে পারেননি।

আসলে সেদিন অ্যাজটেকায় যিনি উৎসব করছিলেন, তিনি তো তারকা ছিলেন না, ছিলেন ঈশ্বর। এই মাটির পৃথিবীতে তিনি উদ্‌যাপন করেছিলেন তাঁদের বিজয়, যাঁদের কাঁধে তিনি চেপে ছিলেন, যাঁদের হৃদয়ে তিনি আজীবন থাকবেন।
সত্যিকারের ‘ঈশ্বরে’রা এমনই হন!