ফ্রি–কিক থেকে আসলে কার গোলসংখ্যা কত, মেসি–রোনালদো কোথায়
গোল নম্বর ৯০১। এর মধ্যে সরাসরি ফ্রি–কিক থেকে গোলসংখ্যা ৭১টি।
তালিকাটা কার—তা না বললেও চলে—লিওনেল মেসির। এমএলএসে গতকাল রাতে নিউইয়র্ক সিটির বিপক্ষে ইন্টার মায়ামির ৩–২ গোলের জয়ে মেসি গোল করে তাঁর পরিসংখ্যান হালনাগাদ করেন। নিউইয়র্কের কিংবদন্তিতুল্য ইয়াঙ্কি স্টেডিয়ামে গোল করে একটি হিসাবও সমান করলেন মেসি। এ মাঠে আগের দুবার গোল না পেলেও এবার পেলেন।
তাতে অবশ্য কিছুটা ভাগ্যের পরশও আছে। মায়ামি ২–১ গোলে পিছিয়ে থাকতে ৬১ মিনিট দূরপাল্লার ফ্রি–কিক থেকে গোল করেন আর্জেন্টাইন কিংবদন্তি। বল ‘মানবদেয়াল’–এ লেগে কিছুটা গতিপথ পাল্টে ঢুকে পড়ে জালে।
মেসির নামের পাশেই যোগ হয়েছে ফ্রি–কিক থেকে এই গোল। মেসি কিংবা ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো ফ্রি–কিক থেকে গোল করলে স্বাভাবিকভাবে একটি প্রশ্ন ওঠে—ফ্রি–কিক থেকে সরাসরি গোল করায় শীর্ষে কে? কিংবা ফ্রি–কিক থেকে সর্বোচ্চ গোলের রেকর্ড ভাঙতে আর কত গোল করতে হবে মেসি–রোনালদোকে?
আর্জেন্টিনার খেলাধুলার সাময়িকী ‘এল গ্রাফিকো’ এটা নিয়ে গবেষণা করেছে। গুগল করলে ফ্রি–কিক থেকে গোলের তালিকা সব সময় এক রকম পাওয়া যায় না। কোথাও অমুক শীর্ষে তো অন্য কোথাও আরেকজন। এমনকি গোলসংখ্যা নিয়েও সন্দেহ প্রকাশ করেন কেউ কেউ। ১৯১৯ সালে যাত্রা শুরু করা এবং ‘খেলাধুলার বাইবেল’ নামে খ্যাতি পাওয়া এই সাময়িকী ফুটবল ইতিহাসে ফ্রি–কিক থেকে সর্বোচ্চ গোলদাতাদের ‘আসল তালিকা’ প্রকাশ করেছে।
ফ্রি–কিকে গোল নিয়ে বিতর্ক
‘এল গ্রাফিকো’র প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গুগলে খুঁজলেই ইতিহাসে সর্বোচ্চ ফ্রি-কিক গোলদাতাদের নিয়ে শত শত নিবন্ধ চোখে পড়ে। তবে এসব তথ্যের সত্যতা খুব কমই যাচাই করা হয়। অধিকাংশ সংবাদমাধ্যম তথ্যের নির্ভুলতা নিয়ে প্রশ্ন না তুলেই অনেকটা মন্ত্রের মতো একই সংখ্যা বারবার প্রকাশ করে যায়, যা মূলত একে অন্যের থেকে হুবহু নকল করা।
কিছু ওয়েবসাইটে দাবি করা হয়, ফ্রি-কিকে সর্বোচ্চ ১০১টি গোল করেছেন ব্রাজিলিয়ান কিংবদন্তি জিকো। তবে ‘সাদা পেলে’খ্যাত জিকো নিজেই এই তথ্য অস্বীকার করেন। জিকোর দাবি, ফ্রি-কিক থেকে তাঁর গোলসংখ্যা ৮১। যদিও এই হিসাবটিও পুরোপুরি সঠিক নয়। প্রকৃতপক্ষে অফিশিয়াল ম্যাচে তিনি ফ্রি-কিকে মোট ৬৮টি গোল করেছেন, যার মধ্যে জাপানের দ্বিতীয় বিভাগে করা ৬টি গোলও অন্তর্ভুক্ত।
এরপর আসে জুনিনহোর নাম। অনেকে দাবি করেন, ফ্রি–কিক থেকে ব্রাজিলের সাবেক এই মিডফিল্ডারের গোল ৭৭টি। ‘এল গ্রাফিকো’র দাবি, জুনিনহোর গোল আসলে ৭২টি। পাশাপাশি সাবেক আর্জেন্টাইন মিডফিল্ডার ভিক্টর লেগ্রোতাগ্লির নামের পাশে ফ্রি–কিক থেকে ৬৬টি গোল লেখা হলেও এর কোনো দালিলিক প্রমাণ নেই। এটি অনেকটা ‘আরবান মিথ’ বা লোককথার মতোই প্রচলিত।
এল গ্রাফিকো জানিয়েছে, গোলসংখ্যা ‘ফুলিয়ে-ফাঁপিয়ে’ দেখানোর তালিকায় আছেন রোনালদিনহো ও ডেভিড বেকহামও। রোনালদিনহোর গোল সংখ্যা ৬৬ বলা হলেও আসলে তা ৫৭টি। একইভাবে বেকহামের নামের পাশে ৬৫টি গোল লেখা হলেও অফিশিয়াল ম্যাচে তিনি করেছেন ৫৩ গোল। এমনকি ফুটবলের ‘রাজা’ পেলের ক্ষেত্রেও অধিকাংশ প্রকাশনায় ৭০টি গোলের কথা বলা হয়, তবে বাস্তবে ফ্রি–কিক থেকে তার গোলসংখ্যা ৪৪টি।
তবে একটি বিষয়ে কোনো দ্বিধা নেই বলে মনে করে ২০১৮ সাল থেকে ওয়েবসাইট চালু করা এই সংবাদমাধ্যম। সেটা হলো, আর্জেন্টাইনদের মধ্যে ফ্রি–কিকে মেসির গোলসংখ্যাই সর্বোচ্চ। ৭১টি গোল করে তিনি ছাড়িয়ে গেছেন ডিয়েগো ম্যারাডোনাকে। শুধু তা–ই নয়, এল গ্রাফিকোর তালিকা অনুযায়ী বর্তমান ফুটবলারদের মধ্যে ফ্রি–কিকে মেসির গোলই সর্বোচ্চ।
ম্যারাডোনা তার ক্যারিয়ারে ফ্রি–কিক থেকে মোট ৬১টি গোল করেছেন, যার মধ্যে আর্জেন্টিনোস জুনিয়র্সের হয়ে ২০টি, বোকা জুনিয়র্সে ৫টি, বার্সেলোনায় ৫টি, নাপোলিতে ২৪টি, সেভিয়ায় ১টি, আর্জেন্টিনা জাতীয় দলে ৪টি ও অনূর্ধ্ব-১৯ দলের হয়ে ২টি গোল করেছেন।
ম্যারাডোনার ক্যারিয়ার নিয়ে কাজ করেছেন ঐতিহাসিক, গবেষক ও লেখক ডিয়েগো দাল সান্তো। ‘এল ডিয়েগো এন নিউমেরোস’ (ডিয়েগো ইন নাম্বারস/সংখ্যায় ডিয়েগো) নামে একটি বইও আছে তাঁর। এক সাক্ষাৎকারে ডিয়েগো দাল সান্তো জানিয়েছেন, প্রীতি ম্যাচগুলোতে ম্যারাডোনা ফ্রি–কিক থেকে আরও ২০টি গোল করেছিলেন। আরও চমকপ্রদ তথ্য হলো, ফ্রি–কিক থেকে ম্যারাডোনার নেওয়া অন্তত ২২টি শট সাইডপোস্টে এবং ৩৫টি শট ক্রসবারে লেগে ফিরেছে।
ফ্রি–কিক থেকে গোলের আসল তালিকা: কার অবস্থান কোথায়
গবেষক হেক্টর ডেভিড সানচেজ এবং একদল ঐতিহাসিকের সহযোগিতায় ফুটবল ইতিহাসের ফ্রি–কিক থেকে সর্বোচ্চ গোলদাতাদের একটি নির্ভরযোগ্য তালিকা পুনর্গঠন করেছে ‘এল গ্রাফিকো’। তথ্যের সর্বোচ্চ নির্ভুলতা নিশ্চিত করেই এই তালিকা তৈরি করা হয়েছে বলে তাঁরা দাবি করেছে।
পুনর্গঠন করা এ তালিকায় সবার ওপরে ব্রাজিলের সাবেক অ্যাটাকিং মিডফিল্ডার মার্সেলিনিও ক্যারিওকা। নিজ দেশের ক্লাব ছাড়াও ইউরোপ, জাপান ও সৌদি আরবের লিগে খেলে ফ্রি–কিক থেকে তিনি মোট ৭৮টি গোল করেছেন। এ ছাড়া প্রীতি ম্যাচে ২টি, পরোক্ষ ফ্রি–কিক থেকে ২টি এবং কর্নার থেকে সরাসরি (অলিম্পিক গোল) ৪টি গোলও করেছেন।
এই তালিকায় দ্বিতীয় স্থানটিও যৌথভাবে দুই ব্রাজিলিয়ানের—রবার্তো দিনামিতে ও জাইর রোসা পিন্টো, তাঁদের গোলসংখ্যা ৭৪। তৃতীয় স্থানও আরেক ব্রাজিলিয়ানের, যাঁর কথা বলা হয়েছে আগেই—জুনিনহো পারনামবুকানো (৭২)। এর পর চারে আছেন লিওনেল মেসি (৭১)। শীর্ষ সাতজনের মধ্যে মেসি ছাড়া বাকি সবাই ব্রাজিলের ফুটবলার। ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো এ তালিকায় শীর্ষ দশের বাইরে। ৬৩ গোল নিয়ে তিনি ১১তম।
এল গ্রাফিকো জানিয়েছে, এ তালিকা চূড়ান্ত নয়। ফুটবল ইতিহাসের আরও তথ্য সংগ্রহের কাজ চলমান থাকায় এতে নতুন নাম যুক্ত হওয়ার সুযোগ রয়েছে। শুধু অফিশিয়াল ম্যাচে সরাসরি ফ্রি–কিক থেকে করা গোলগুলোই বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে। কোনো প্রীতি ম্যাচ বা নিচু সারির লিগের (লোয়ার ডিভিশন) গোল এ তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি।