কে প্রথম কাছে এসেছিল—মেসি, না রোকুজ্জো
মাঠের লিওনেল মেসিকে আমরা সবাই কমবেশি জানি। তাঁর মতো অসাধারণ ফুটবলার ইতিহাসেই খুব কম। মসৃণ দৌড় থেকে মায়ার জাল বিছানো ড্রিবলিং, প্রখর ফুটবল-মস্তিষ্ক, কঠোর পরিশ্রম এবং নিবেদনের কারণে ক্যারিয়ারজুড়ে থরে–বিথরে সাফল্য পেয়েছেন আর্জেন্টাইন কিংবদন্তি। প্রতিযোগিতামূলক সবচেয়ে বেশি ট্রফি জয়ের রেকর্ডও তাঁর। কিন্তু এই সবই মাঠের মেসির গল্প। মাঠের বাইরে অর্থাৎ ফুটবলের বাইরে মেসির জীবনটা আসলে কেমন?
ক্যামেরার সামনে ব্যক্তিগত জীবন তুলে ধরতে মেসি তেমন একটা স্বস্তিবোধ করেন না কখনো। সে কারণে আর্জেন্টাইন কিংবদন্তির ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে সম্ভবত কারও সেভাবে জানা নেই। তবে সম্প্রতি নিজের ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে আর্জেন্টিনার স্ট্রিমিং চ্যানেল লুজু টিভির সঙ্গে খোলামেলা কথা বলেছেন কিংবদন্তি। গত মাসে এই সাক্ষাৎকার নেওয়া হলেও ইউটিউবে তা গতকাল প্রকাশ করে চ্যানেলটি। এই সাক্ষাৎকারে মেসি মেলে ধরেন তাঁর একাকিত্ব, রোমান্টিকতা এবং নিজের ভেতরকার কিছু কথা।
রোমান্টিকতা, প্রথম চুমু এবং কাছে আসা
বলা হয়, ‘প্রতিটি সফল পুরুষের পেছনেই আছেন একজন নারী।’ মেসির জীবনে সেই নারী তাঁর কৈশোরের প্রেমিকা থেকে ঘরনি আন্তোনেল্লা রোকুজ্জো। তিন সন্তানের এই জননীর সঙ্গে প্রেমের শুরুটা জানিয়েছেন মেসি, ‘ছয় বছর বয়স থেকে আমরা একে অপরকে চিনি; তবে একপর্যায়ে আমরা ছিলাম শুধু “দরকারের খাতিরে বন্ধু”।’
মেসি বার্সায় যোগ দেন ১৩ বছর বয়সে। এরপর রোকুজ্জোর সঙ্গে তাঁর যোগাযোগ কমে যায়, ‘বার্সেলোনায় যাওয়ার পর যোগাযোগ পাল্টে যায়। খুব কঠিন হয়ে পড়ে। চিঠি পাঠাইনি, তবে মেইল করেছি। তবে বন্ধুদের সঙ্গে যোগাযোগ থেমে যায়নি (লুকাস স্কাগলিয়া, রোকুজ্জোর কাজিন)। কথা হতো না, দেখা হতো খুব কম।’
প্রথম চুমুটা (২০ বছর বয়সের) আগেই ঘটেছে। সেই মুহূর্তে তাকে অনুভব করেছি, পূর্ণ মনে হয়েছে নিজেকে। বুঝে ফেলেছিলাম সে–ই আমার জীবনের নারী।
মেসির বয়স যখন ১৬–১৭ বছর, তখন থেকে রোকুজ্জোর সঙ্গে তাঁর সম্পর্কের ধরন পাল্টে যায়। আমাদের মধ্যে আরও বেশি কথা হয়। মেইল চালাচালি হয়। ২০ বছর বয়স থেকে আমরা একে অপরের সঙ্গে দেখা (ডেটিং) করা শুরু করি (হাসি)। তত দিনে আমি অনেক বিখ্যাত।’
প্রেমে পড়লে প্রথম চুমুটা অনেকেই মনে রাখেন। মেসির কবে? শুনুন তাঁর মুখেই, ‘প্রথম চুমুটা (২০ বছর বয়সের) আগেই ঘটেছে। সেই মুহূর্তে তাকে অনুভব করেছি, পূর্ণ মনে হয়েছে নিজেকে। বুঝে ফেলেছিলাম সে–ই আমার জীবনের নারী। যে সময়ে এটা ঘটার কথা ছিল, ঠিক তখনই শুরু হয়েছে। আমার মনে হয় না তাঁকে জিজ্ঞেস করেছি, সে আমার প্রেমিকা হতে চায় কি না। রোজারিওতে সেদিন রাতে বাইরে গিয়েছিলাম...সম্ভবত তাকে বলেছিলাম, ঠিক মনে নেই। কিন্তু তারপর আমরা খুব কাছাকাছি চলে আসি।’
রোমান্টিক সিনেমায় যেমন দেখা যায়, শৈশব থেকেই চোখে চোখ পড়া, দুজনেরই লাজুক হাসি—অতঃপর একটু বড় হয়ে প্রেমে ডুবে যাওয়া। রোকুজ্জোও মেসির জীবনে ঠিক এভাবেই ধরা দিয়েছেন, ‘খুব ছোটবেলায় যখন কিছুই বুঝতাম না, তখনো জানতাম আমরা একে অপরকে পছন্দ করি। পরিবারের সবাই মিলে খাওয়ার টেবিলে আমরা একে অপরের প্রতি লাজুকভাবে তাকিয়েছি। বার্সেলোনায় সে যখন আসার সিদ্ধান্ত নিল, সেটা ছিল এক কঠিন সময়। অল্প বয়সী একটা মেয়ে, লেখাপড়া করছিল। ব্যাপারটা আমার কাছে পাগলামি মনে হলেও সে এটাই করেছিল।’
প্রেমের নদীতে এভাবে ডুবে ডুবে জল খেয়ে শেষ পর্যন্ত ২০১৭ সালের জুনে বিয়ের পিঁড়িতে বসেন মেসি ও রোকুজ্জো। তাঁদের সংসারে তিন সন্তান—থিয়াগো, মাতেও ও চিরো। রোকুজ্জোর সঙ্গে সম্পর্কের ধরন নিয়ে মেসি বলেছেন, ‘আমি অদ্ভুত মানুষ, খুব একটা আবেগ প্রকাশ করতে পারি না। তবে আমার ভেতরেও রোমান্টিক একটা দিক আছে। ছোটখাটো উপহার দিতে ভালো লাগে, চিঠি লেখা আমার জন্য একটু কঠিন।’
একাকিত্ব, মন খারাপ, মাতেও ও ফুটবল
সবাই মনের ভেতরকার কথা বা অনুভূতি প্রকাশ করতে পারেন না। মেসিও তেমন মানুষ, ‘নিজের ভেতরকার আবেগ–অনুভূতি প্রকাশ করা আমার জন্য কঠিন। তবে যাদের আমি সত্যিই ভালোবাসি, তাদের সব সময় ভালো দেখতে চাই, সুখী করতে চাই।’
যেহেতু মনের কথাটা সব সময় মুখ ফুটে বলতে পারেন না, তাই ধরে নিতে হচ্ছে মেসি একটু অন্তর্মুখী মানুষ। আর এমন মানুষদের কাছে একাকিত্ব উপভোগ্য। মেসিরও ঠিক তা–ই—শুনুন তাঁর মুখেই, ‘আমি একা থাকতে সত্যিই খুব পছন্দ করি। এটা উপভোগ করি—সেটা ঘরের কোলাহল এবং বাচ্চাদের এদিক–ওদিক দৌড়ানো ছাড়া। তুচ্ছ কোনো কিছুতে কিংবা ছোটখাটো বিষয়ে আমার মেজাজ বদলে যেতে পারে। সবকিছু নিজের ভেতরেই রেখে দিই এবং সমস্যাগুলো একাই সামলাতে পছন্দ করি। নিজের যে বিষয়টি আমার কম পছন্দ, তা হলো, কোনো কিছুতে আঘাত পেলে নিজেকে গুটিয়ে নিই এবং সেখান থেকে বের হতে পারি না। খুব কমসংখ্যক মানুষই আমাকে এখান থেকে বের করে আনতে পারে এবং তাদের মধ্যে মাতেও একজন।’
মেসি এমনিতে ঘরে বেশ সুশৃঙ্খল মানুষ। রোকুজ্জো সে তুলনায় বেশি অগোছালো। এই দাবিটি কিন্তু মেসিরই, ‘আমি আমার কাপড়গুলো রং অনুযায়ী সাজাতে পছন্দ করি। কেউ কিছু স্পর্শ করলে তা ভালো লাগে না। কোনটা কোথায় আছে, সেটা আমাকে জানতে হয় এবং শৃঙ্খলার প্রতি আমি আচ্ছন্ন। সেটা আন্তোনেল্লার চেয়েও বেশি। বলতে পারেন, আমিই তাকে পাল্টেছি। কারণ, শুরুতে সে খুবই বিশৃঙ্খল ছিল। বাচ্চাদের সঙ্গে আমি সারা দিনই বল নিয়ে খেলি। মাতেও পায়ের কারুকাজ খুব পছন্দ করে।’
রোকুজ্জোর শাসন, বেরসিক আমেরিকান ও রোজারিও
স্বামী যত বড় ফুটবলারই হোক, বাসার ভেতর সন্তানদের সঙ্গে ফুটবল খেলা কোনো স্ত্রীর পক্ষে মেনে নেওয়া একটু কষ্টেরই। কারণ, তাতে বাসার জিনিসপত্র অনিষ্ট হওয়ার শঙ্কা থাকে। মেসির জীবনটাও এ ক্ষেত্রে আর দশজন সাধারণ স্বামীর মতোই। শুনুন তাঁর মুখেই, ‘ঘরের ভেতর আন্তোনেল্লা আমাদের খেলতে দেয় না। এ কারণে আমরা খুব একটা শোরগোল করতে পারি না।’
ঘরের বাইরে অবশ্য সে সমস্যা নেই। তবে অন্য সমস্যা আছে। মেসির যে তারকা ইমেজ তাতে ঘরের বাইরে বের হলেই তাঁকে সবার ছেঁকে ধরার কথা। অবশ্য ইন্টার মায়ামিতে যোগ দেওয়ার পর তাঁর যুক্তরাষ্ট্র–জীবনে এর প্রভাব খুব সামান্যই, ‘মনে পড়ে না সর্বশেষ কবে কোথাও যাওয়ার পর লোকে আমাকে চিনতে পারেনি। তবে এখন যেখানে থাকি সেখানে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করি। অনেক আমেরিকান আছে এবং তারা ফুটবল অতটা পছন্দ করে না।’
কিন্তু জন্মভূমি রোজারিওতে ব্যাপারটা তেমন নয়। মেসি সেখানে যেমন চিরকালীন তারকা তেমনি সবার ঘরের ছেলেও। মেসির ভাষায়, ‘রোজারিওতে বাড়ি থেকে বের হই না, তবে গেলে যাই মায়ের কাছে কিংবা ভাইয়ের কাছে। এটা ভালো লাগে, এটা আমার জীবনের সেরা বিষয়। যাদের ভালোবাসি তাদের বাড়ি থেকে বাড়িতে যাই। গ্রীষ্মকাল ও গরম ভালো লাগে (রোজারিওতে)। দারুণ উপভোগ করি।’
পছন্দের পানীয়
আনন্দের মুহূর্ত উদ্যাপনে প্রায় সব দেশেই পানীয় প্রচলিত একটি প্রথা। মেসির এ ক্ষেত্রে পছন্দের পানীয় হলো ওয়াইন। শুনুন তাঁর মুখেই, ‘আমার ওয়াইন পছন্দ। সেটা না হলে নিয়মিত যেটা, সেটাই নিই—স্প্রাইট মিশিয়ে ওয়াইন (হাসি)। এটা দ্রুত কাজ করে, হা হা হা।’
মেসি নিয়মিত মদ্যপান করেন না। তবে তাঁর নিজের নামে ওয়াইনের ব্র্যান্ড আছে। ‘লিওনেল কালেকশন’—নামে এই ওয়াইনের ব্র্যান্ড একই নামের ওয়েবসাইটে বিক্রি করা হয়।