হাইড্রেশন বিরতিটা কাজে লাগছে
ম্যাচের আবহাওয়া আর গ্যালারির শোরগোলের মধ্যে দূর থেকে চিৎকার করে খেলোয়াড়দের নির্দেশনা দেওয়া প্রায় অসম্ভব কোচদের পক্ষে। ঠিক এই জায়গাতেই এবারের বিশ্বকাপে ‘হাইড্রেশন ব্রেক’ বা পানিপানের ছোট্ট বিরতিটা কোচদের বড় কৌশলগত অস্ত্র বা গেম চেঞ্জার হয়ে উঠছে।
দুই অর্ধে ২২ মিনিট পর ৩ মিনিট করে দেওয়া এই বিরতিটা শুধু খেলোয়াড়দের তৃষ্ণা মেটানোর সুযোগ নয়, বরং ডাগআউটের কোচদের জন্য বিরতির ১৫ মিনিটের চেয়েও কার্যকর এক মিনি ট্যাকটিক্যাল সেশন। এই সংক্ষিপ্ত বিরতিতে খেলোয়াড়দের কাছে ডেকে নিয়ে সুনির্দিষ্ট ও কার্যকর বার্তা পৌঁছে দিচ্ছেন কোচরা, যা কখনো কখনো বদলে দিচ্ছে মাঠের দৃশ্যপট।
চলমান বিশ্বকাপের গ্রুপ পর্বে ফুটবলের এমন অনেক সূক্ষ্ম ও আধুনিক রূপান্তর চোখে পড়েছে। প্রথম রাউন্ডে ২৪ ম্যাচে দেখা গেছে ৭৫টি গোল, ম্যাচপ্রতি গড়ে ৩.১২টি! ১৯৫৮ বিশ্বকাপের পর প্রথম রাউন্ডে গোলের এমন বন্যা আধুনিক ফুটবলে বিরল।
অবশ্য দল বেশি হওয়ায় এবার গ্রুপ পর্বে কিছুটা অসমান প্রতিদ্বন্দ্বিতা লক্ষ করেছি, যার প্রমাণ কুরাসাওয়ের বিপক্ষে জার্মানির ৭-১ বা কাতারের জালে কানাডার ৬-০ গোলের মতো বড় স্কোরলাইন। তবে সময় বাড়ার সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতার তীব্রতাও বাড়বে।
ফুটবল মাঠে আর্ট হিসেবে আক্রমণাত্মক খেলাই বেশি মূল্য পেলেও রক্ষণকাজও যে কতটা শৈল্পিক হতে পারে, তা দেখিয়েছে কেপ ভার্দে। কোচদের ট্যাকটিক্যাল বোর্ডের ঘুঁটির মতো নিখুঁত পজিশনিং ও জমাট ব্লক করেছে বিশ্বকাপের নবাগত দলটি।
ডিফেন্সিভ ব্লক আর খেলোয়াড়দের মাঝখানে কোনো খালি জায়গায় দেয়নি। আমার চোখে স্পেনের লেফট উইং ব্যাক মার্ক কুকুরেয়া তাঁর পজিশনে বিশ্বসেরা। সেই কুকুরেয়ার বিপক্ষে কোনো ফাউল ছাড়াই পুরো ৯০ মিনিট কেপ ভার্দিয়ানদের এই পরিচ্ছন্ন ‘কপিবুক ডিফেন্ডিং’ দারুণ লেগেছে।
তবে এটাও সত্যি, স্পেন লো ব্লক ভাঙার চেষ্টা করলেও তাদের উইঙ্গাররা দ্রুত বল না ছাড়ায় এবং দ্রুত উইং প্লে বা সুইচ না করায় জিততে পারেনি।
ট্যাকটিক্যাল শেপের ক্ষেত্রে বেশির ভাগ দলই সতর্কতাবশত ৪-২-৩-১ ফর্মেশনে শুরু করলেও বল পজেশনের সময় দ্রুত রূপ বদলাচ্ছে। যেমন স্পেন আক্রমণে গেলে হয়ে গেছে ২-৩-৫, আবার দক্ষিণ আফ্রিকা আক্রমণ গড়ার সময় ৩-৪-৩ বা ২-৫-৩ হয়েছে।
ইংল্যান্ড বনাম ক্রোয়েশিয়া ম্যাচে দেখা গেছে হাই প্রেসিং ও চাপের মুখে নিচ থেকে বল ধরে রেখে নিখুঁত বিল্ডআপের দারুণ প্রদর্শনী। একজন কোচের দৃষ্টিকোণ থেকে প্রথম রাউন্ডে এই ম্যাচটি বেশ ভালো লেগেছে আমার।
গরম ও প্রতিকূল আবহাওয়ার কারণে দলগুলোকে শক্তি ধরে রাখতে কিছুটা রয়েসয়ে খেলতে হচ্ছে, যার ফলে আক্রমণের একধরনের ‘লেট ট্রানজিশন’ বা ধীরগতি লক্ষ করা গেছে। আমার চোখে গ্রুপ পর্বের প্রথম ২৪টির মধ্যে মাত্র ৭-৮টি ম্যাচ ‘হাই-ইনটেনসিটি’ ছিল, যা সামনে আরও বাড়বে আশা করি।
তবে ছাদঢাকা স্টেডিয়ামের ম্যাচগুলোতে বাতাসের বাধা না থাকায় বলের গতিপথ নিখুঁত থাকছে, গতিও বেশি হচ্ছে। ফলে দূরপাল্লার শুটিং বাড়ছে। তথ্য অনুযায়ী, কাভার্ড স্টেডিয়ামের ম্যাচগুলোতে ফরোয়ার্ডরা ৬-৭টি শট নিচ্ছেন।
এটা আসলে আজকের প্রযুক্তির অবদান বলব। কাভার্ড স্টেডিয়ামে শটের গতি বেশি হওয়ায় ক্রোয়েশিয়ার মার্তিন বাতুরিনার ঘণ্টায় ১২৪ কিলোমিটার গতির শটটি ইংলিশ গোলকিপার জর্ডান পিকফোর্ড চোখের পলক দেখার আগেই গোল হয়ে যায়!
সেট পিসের ক্ষেত্রে দলগুলো এখন লং কর্নারের চেয়ে শর্ট কর্নারে বেশি মনোযোগী, যা রক্ষণের নির্দিষ্ট অর্গানাইজেশন ভেঙে দেয়। নেদারল্যান্ডস এভাবেই জাপানের রক্ষণ এলোমেলো করে ভার্জিল ফন ডাইককে ফ্রি করে গোল আদায় করেছিল। পাশাপাশি খেলোয়াড় বদলের ক্ষেত্রে কিছু ম্যাচে ভালো দিক চোখে পড়েছে।
ইংল্যান্ডের মতো দলগুলো লিড বাড়াতে মিডফিল্ডার তুলে ফরোয়ার্ড নামিয়েছে। বদলি হিসেবে নেমে মার্কাস রাশফোর্ড গোলও করেছেন। টমাস টুখেলের মতো কোচদের এমন খেলোয়াড় বদল ম্যাচের ফলে দারুণ প্রভাব ফেলছে। সব দলের প্রথম ম্যাচ শেষে বদলি খেলোয়াড়েরা প্রায় ১৩ শতাংশ গোল করেছেন।
আধুনিক ফুটবলে ‘নাম্বার নাইন’ বা স্ট্রাইকারের ভূমিকা যে কতটা বদলেছে, তার বড় প্রমাণ হ্যারি কেইন। সাধারণত গোলকিপারের পর ম্যাচে সবচেয়ে কম দৌড়ায় নাম্বার নাইন। তবে এই পজিশনে খেলে কেইন ক্রোয়েশিয়া ম্যাচে ১০.৯ কিলোমিটার রান করেছে, যা আমার কোচিং অভিজ্ঞতায়ও অভাবনীয়।
আমি নিজেও অনেক ‘নাম্বার নাইন’ব্যবহার করেছি, কিন্তু কখনো কাউকে এত রান করতে দেখিনি। ক্রোয়েশিয়া ম্যাচে ইংল্যান্ডের সম্ভবত দ্বিতীয় সর্বোচ্চ রানিং খেলোয়াড় ছিল কেইন। দলের ডিফেন্ডিং ও বিল্ডআপে দারুণ অবদান রাখার পাশাপাশি দুটি গোলও করেছে, যদিও একটি পেনাল্টিতে। সময়ের সঙ্গে পজিশনভেদে খেলোয়াড়দের মাঠের এমন ট্যাকটিক্যাল বিবর্তন সত্যিই মুগ্ধ করার মতো।