ক্লাব ফুটবল শেষে বেশির ভাগ খেলোয়াড় এখন বিশ্বকাপে মনোযোগ দিয়েছেন। যাঁদের দেশ বিশ্বকাপে সুযোগ পায়নি, তাঁরা চলে গেছেন অবকাশে। কিন্তু দুটি ক্লাবের খেলোয়াড়দের জন্য বিষয়টা ভিন্ন। তাঁরা রোমাঞ্চভরে ক্ষণ গণনা করছেন মৌসুমের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচটির।
ক্লাব ফুটবলের চূড়ান্ত প্রাপ্তি বলে ধরা হয় যেটিকে, সেই চ্যাম্পিয়নস লিগ ফাইনালে আজ রাত ১০টায় মুখোমুখি হবে পিএসজি ও আর্সেনাল। নিজেদের ইতিহাসে সেরা সময় পার করতে থাকা পিএসজির সামনে সুযোগ শিরোপা ধরে রাখার। আর ২০ বছর পর দ্বিতীয়বারের মতো ফাইনালে ওঠা আর্সেনালের আকাঙ্ক্ষা ইউরোপ শ্রেষ্ঠত্বের প্রথম শিরোপা স্মারকটি ছুঁয়ে দেখার।
লম্বা সময় ধরে চ্যাম্পিয়নস লিগকে পাখির চোখ করেছিল পিএসজি। নেইমার, এমবাপ্পে এবং লিওনেল মেসিদের মতো তারকাদের এনেও চেষ্টা করেছিল। কিন্তু সাফল্য মেলেনি। এই তিন মহাতারকার বিদায়ের পরই যেন নিজেদের আসল রূপটা খুঁজে পায় পিএসজি। স্প্যানিশ কোচ লুইস এনরিকের অধীনে অবিশ্বাস্য এক দলে পরিণত হয় প্যারিসের ক্লাবটি এবং গত মৌসুমে জিতে নেয় নিজেদের প্রথম চ্যাম্পিয়নস লিগ শিরোপা।
যেটি একেবারেই আকস্মিক কোনো ঘটনা ছিল না; বরং ইউরোপিয়ান ফুটবলে নিজেদের ছাপ রেখে যেতেই যেন দলটির উত্থান। যার প্রমাণ বলতে পারেন টানা দ্বিতীয়বারের মতো ফাইনালে ওঠা। বুদাপেস্টের পুসকাস অ্যারেনায় আর্সেনালকে হারাতে পারলে রিয়াল মাদ্রিদের পর দ্বিতীয় ক্লাব হিসেবে (রিয়াল টানা তিনবার জিতেছিল) চ্যাম্পিয়নস লিগে টানা দুটি শিরোপা জেতার কীর্তি গড়া হয়ে যাবে।
গত মৌসুমে চ্যাম্পিয়নস লিগ সেমিফাইনালে আর্সেনালের মুখোমুখি হয়েছিল পিএসজি। এমিরেটসে প্রথম লেগ ১-০ গোলে জেতার পর পার্ক দে প্রিন্সেসে দ্বিতীয় লেগে পিএসজি জিতেছিল ২-১ গোলে। আর্সেনালকে কীভাবে হারাতে হয়, সেটা ভালোই জানা আছে পিএসজির। যদিও ম্যাচের ফল ছাড়া বাকি পরিসংখ্যানে ছাপ ছিল আর্সেনালেরই আধিপত্যের। মাঝের এক বছরে আর্সেনাল অনেক বদলেও গেছে। সেটা ইতিবাচক অর্থেই। ২২ বছর পর প্রিমিয়ার লিগ শিরোপাও পুনরুদ্ধার করেছে। আর্সেনালকে নিয়ে তাই একটু বেশিই সতর্ক থাকতে হবে এনরিকেকে।
এই ম্যাচে পিএসজির তুরুপের তাস আক্রমণভাগের দুই খেলোয়াড় উসমান দেম্বেলে ও খিচা কাভারাস্কেইয়া। সেমিফাইনালের প্রথম লেগে বায়ার্ন মিউনিখের বিপক্ষে দুজনেই জোড়া গোল করেছেন। দেম্বেলে-কাভারাস্কেইয়া জুটি যদি ফাইনালে একসঙ্গে জ্বলে উঠতে পারেন, তবে পিএসজির টানা দ্বিতীয় শিরোপা ঘরে তোলার পথটা অনেক সহজ হয়ে যাবে।
আর্সেনালের জন্য সময়টা এখন ইতিহাসের পাতাটাকে নতুন করে সাজানোর। আজ রাতে পিএসজিকে হারাতে পারলেই ঐতিহাসিক ‘ডাবল’। প্রিমিয়ার লিগ শিরোপা জয়ের অভিজ্ঞতা চ্যাম্পিয়নস লিগ ফাইনালের মঞ্চেও নিশ্চিতভাবেই বড় অনুপ্রেরণা হবে। গত মৌসুমের সঙ্গে তুলনা করলে আর্সেনালের প্রায় প্রতিটি বিভাগই নতুনভাবে গড়ে উঠেছে। গত মৌসুমের ব্যাক ফোর থেকে সম্ভবত একমাত্র উইলিয়াম সালিবাই এবার একাদশে থাকবেন।
মাঝমাঠেও এসেছে নতুন মাত্রা। একটু নিচে থেকে খেলা নিয়ন্ত্রণ করার জন্য আছেন ডেক্লান রাইস, মার্টিন জুবিমেন্দি ও মার্টিন ওডেগার্ড। সৃষ্টিশীল বিকল্প হিসেবে আছেন এবেরেচি এজে। উইংয়ে গতিময় ও পরিশ্রমী বিকল্প হিসেবে যোগ হয়েছেন ননি মাদুয়েকে। আর আক্রমণভাগে গতবার চোটের কারণে না থাকা কাই হাভার্টজের সঙ্গে আছেন ভিক্টর ইয়োকেরেসের মতো শক্তিশালী ফরোয়ার্ড। আর এঁদের সঙ্গে দলের অন্যতম সেরা তারকা বুকায়ো সাকা তো আছেনই।
ফাইনালের আগে আর্সেনালের সঙ্গে নিজেদের দলের তুলনা করে পিএসজি কোচ এনরিকে বলেছেন, ‘আমি মনে করি না, এই দুই দল একেবারে বিপরীতধর্মী। আর্সেনাল আসলে আরতেতার চিন্তা ও ব্যক্তিত্বের প্রতিচ্ছবি।’ অন্য দিকে আর্সেনাল তারকা হাভার্টজ শুনিয়েছেন নিজেদের লক্ষ্যের কথা, ‘আমার মনে হয়, আমরা আন্ডারডগ কি না, সেটা খুব একটা গুরুত্বপূর্ণ নয়। আমরা মাঠে নামব এবং ওদের হারাব।’
গত মৌসুমের সেমিফাইনালের স্মৃতি উঁকিঝুঁকি মারলেও এবারের ফাইনাল তাই অনেক দিক থেকেই আলাদা। দলে নতুন গভীরতা ও বৈচিত্র্য যোগ হওয়ায় গতবারের পরাজয়ের বদলার স্বপ্ন দেখতেই পারে আর্সেনাল। আর পিএসজি তো চাইবেই, টানা দ্বিতীয়বার ট্রফিটা হাতে নিয়ে আরও জোরালোভাবে ইউরোপীয় ফু্টবলে নিজেদের শ্রেষ্ঠত্বের জানান দিতে।
স্মরণীয় একটা ফাইনাল তাই আশা করাই যায়।