২ কোটি ৮৪ লাখের খ্যাতিতে ‘অসহায়’ ভোজিনিয়া

ভোজিনিয়ারয়টার্স

ফোনে ইনস্টাগ্রামের নোটিফিকেশন বন্ধ করে দিয়েছেন ভোজিনিয়া। কারণটা শুনলে হাসি পায়। নিজের ওপর ভরসা ছিল না তাঁর। কে নতুন করে অনুসরণ করল, তা বারবার দেখার লোভ সামলানো কঠিন। তাই ফোনকেই চুপ করিয়ে দিলেন। গোলপোস্টের নিচে যাঁর কাজ অন্যের আক্রমণ ঠেকানো, খ্যাতির ‘আক্রমণ’ ঠেকাতে গিয়ে তিনি যেন অসহায়!

কেপ ভার্দের এই গোলরক্ষকের বয়স ৪০। এই বয়সে বেশির ভাগ ফুটবলার অবসরের হিসাব কষেন। ভোজিনিয়া বিশ্বকাপে এসে হয়ে গেলেন সারা দুনিয়ার আলোচনার বিষয়। স্পেনের বিপক্ষে প্রথম ম্যাচেই অসাধারণ পারফরম্যান্সের পর ইনস্টাগ্রামে তাঁর অনুসারী ৫৬ হাজার থেকে কয়েক ঘণ্টার মধ্যে ছাড়িয়ে গেল ১০ লাখ!

আরও পড়ুন

খবরটা তিনি প্রথম শুনেছিলেন এক অদ্ভুত জায়গায়, ক্যাটারিং টিমের এক সদস্যের মুখে। লোকটি এসে বললেন, আপনার তো মিলিয়ন অনুসারী! ভোজিনিয়া ভেবেছিলেন ঠাট্টা। লোকটা ছাড়লেন না, বারবার একই কথা বললেন।

সন্দেহ ভাঙল একটু পরে, মিক্সড জোনে। কাজেটিভির এক সাংবাদিক জিজ্ঞাসা করলেন, কী ঘটছে তিনি জানেন কি না। তারপর নিজের ফোনটা বাড়িয়ে ধরলেন। স্ক্রিনে ১০ লাখের বেশি অনুসারীসংখ্যা। ভোজিনিয়া বলেন, ‘এরপরই আমি ইনস্টাগ্রামের নোটিফিকেশন বন্ধ করে দিই, যাতে কে অনুসরণ করছে, বারবার তা দেখার লোভ না হয়।’

ভোজিনিয়া জন্মেছিলেন মেক্সিকো বিশ্বকাপের সময়। আর তিনি যখন প্রথম বিশ্বকাপ খেললেন, তখনও সহ–আয়োজক দেশ হিসেবে আছে মেক্সিকো
ইনস্টাগ্রাম থেকে

সেই ভোজিনিয়া পরে উরুগুয়ে, সৌদি আরব ও আর্জেন্টিনার বিপক্ষে ম্যাচেও দুর্দান্ত খেললেন। ওদিকে পাল্লা দিয়ে বাড়তে থাকল ইনস্টাগ্রাম অনুসারী। এখন যা এসে দাঁড়িয়েছে ২ কোটি ৮৪ লাখে! বিশ্বকাপের পরপরই সমর্থকদের ভোটে সেরা একাদশে জায়গা পেয়েছিলেন, এখন ব্যালন ডি’অরের মনোনয়নেও তাঁর নাম।

আরও পড়ুন

গোলরক্ষকের জীবন এমনিতেই একটু আলাদা। মাঠের বাকি ১০ জন যখন দল বেঁধে ছোটেন, তিনি দাঁড়িয়ে থাকেন একা। ভোজিনিয়া সেই নির্জনতায় অভ্যস্ত মানুষ। হঠাৎ একদিন সেই একাকিত্বের ঘরে ঢুকে পড়ল দুনিয়াসুদ্ধ মানুষ।

দ্য অবজারভারকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি সেই ভিড়ের কথাই বলেছেন। কথাগুলো খ্যাতির গল্পে সচরাচর শোনা যায় না। ভোজিনিয়া বলেন, ‘খ্যাতির আগের জীবনই আমার বেশি পছন্দের ছিল। আমি শান্তি আর নিস্তব্ধতা হারিয়ে ফেলেছি।’

চিলির শীর্ষ লিগের দল কোলো কোলোর সঙ্গে ছয় মাসের চুক্তি সই করেছেন ভোজিনিয়া।
রয়টার্স


খ্যাতির আলোয় হারানো নির্জনতার কথা বলতে গিয়ে তো তিনি আরও খোলামেলা, ‘আমার আর ব্যক্তিগত জীবন নেই, অন্তত আগের তুলনায় অনেক কমে গেছে। এখন বাইরে বের হই, রেস্তোরাঁয় যাই, সব সময় কেউ না কেউ ছবি তুলতে চায় বা অটোগ্রাফ চায়। আরও খারাপ হলো, কেউ কেউ আমার ভিডিও করতে থাকে। আমার জীবনে সবচেয়ে বড় বদলটা এটাই। আর আমার মনে হয় না, এ নিয়ে আমার কিছু করার আছে।’

আরও পড়ুন

সাক্ষাৎকারে তিনি এ কথাও বলেন, ‘অনেকেই বিখ্যাত হতে চায়, সামনে থাকতে চায়। কিন্তু তারা ওই বাস্তবতার শুধু ভালো দিকটাই দেখে। সত্যি বলতে, এখনকার জীবন আর আগের জীবনের মধ্যে একটা বেছে নিতে বললে আমি আগেরটাই নেব।’

এই ঝড় শুধু তাঁর একার ওপর দিয়ে যাচ্ছে না। চিলির ক্লাব কোলো-কোলোর এই গোলরক্ষকের আশপাশের মানুষও এর ধাক্কা টের পাচ্ছেন। ভোজিনিয়া বলেন, ‘তাদেরও পরিস্থিতির সঙ্গে মানিয়ে নিতে শিখতে হবে, সীমারেখা টানতে শিখতে হবে।’

কেপ ভার্দের সাও ভিসেন্তে শহরে থাকেন ভোজিনিয়া। সেই শহর থেকে আফ্রিকা ও ইউরোপের বিভিন্ন দ্বিতীয় সারির ক্লাবে খেলেছেন ভোজিনিয়া।
ইনস্টাগ্রাম


বিশ্বকাপের পর খ্যাতির সঙ্গে সঙ্গে এল টাকার হাতছানি। অনেক কোম্পানি ও ব্র্যান্ড তাঁর সঙ্গে কাজ করতে চেয়েছিল। কিন্তু টুর্নামেন্ট চলাকালে রাজি হয়েছেন মাত্র একটিতে, ইউএফএল মোবাইলের সঙ্গে। ভবিষ্যতে কী প্রস্তাব আসবে, তা তাঁর জানা নেই। তবে একটা রেখা তিনি এখনই টেনে দিয়েছেন। জোর দিয়ে বলেছেন, ‘তামাক, অ্যালকোহল কিংবা বেটিং প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে আমি কাজ করতে চাই না।’

আরও পড়ুন

তবে নতুন এই পরিচিতির একটা ভালো দিকও তিনি দেখছেন। তিনি স্রেফ একজন মানুষ, কিন্তু তাঁকে ঘিরে আলো পড়েছে গোটা কেপ ভার্দের ওপর। সেটা নিয়ে গর্ব আছে ভোজিনিয়ার, ‘নিজেকে একধরনের দূত মনে হচ্ছে, ভালোই লাগে। তবে স্পষ্ট করে বলে রাখি, আমরা যা অর্জন করেছি, তা সম্মিলিত প্রচেষ্টার ফল।’

দেশের কথা যখন বলেন, তাঁর কণ্ঠে তখন কিছু খ্যাতির আক্ষেপ নেই, আছে উচ্ছ্বাস, ‘আমরা ইতিহাস গড়েছি। সবচেয়ে ভালো খবর হবে, এই গতিকে কাজে লাগিয়ে দেশকে এগিয়ে নেওয়া আর মানুষের জীবনযাত্রার মান বাড়ানো।’

ভোজিনিয়া
ইনস্টাগ্রাম থেকে


বিশ্বকাপের পর অবসরের সিদ্ধান্তটা আপাতত তুলে রেখেছেন ভোজিনিয়া। নতুন ঠিকানা চিলির ক্লাব কোলো-কোলো। কেন সেখানে, তাঁর সহজ উত্তর, ‘এই ক্লাবটাই সবচেয়ে বেশি আগ্রহ দেখিয়েছিল। যুক্তরাষ্ট্র থেকে কোনো প্রস্তাব পাইনি। সৌদি আরবের সঙ্গে কিছু যোগাযোগ হয়েছিল, তবে নির্দিষ্ট কিছু হয়নি। আশা করি, শিগগিরই কোপা লিবের্তাদোরেসে খেলতে পারব।’

জীবন বদলে গেছে। অখ্যাত এক গোলরক্ষকের জীবনে এখন গ্যালারির করতালি, ক্যামেরার ঝলকানি, অগণিত অনুসারী। তবু গোলবারের নিচে দাঁড়িয়ে এই ভোজিনিয়া খুঁজে বেড়ান সেই পুরোনো মানুষটিকে।

যে শুধু একটু নীরবতা চেয়েছিল।

আরও পড়ুন