আফ্রিকা মহাদেশ নিয়ে কথা হচ্ছিল। বিশ্বকাপের সেই আসরে আফ্রিকানরা খেলেনি। ফিফা নিয়ম করেছিল, শুধু নিজেদের মহাদেশ থেকে কোয়ালিফাই করলেই চলবে না, সেই সঙ্গে এশিয়ান কোয়ালিফায়ারদের হারালেই আফ্রিকার দেশ মূল পর্বে খেলতে পারবে। এই আইনটাই ছিল আফ্রিকানদের জন্য অপমানজনক।

শুধু তা-ই না, বর্ণবাদী দক্ষিণ আফ্রিকাকেও বিপুল সমর্থন দিচ্ছিল ফিফা। বিশ্বকাপে গল্পের কোনো একসময় জেনে নেওয়া যাবে, কীভাবে এই ব্যাপারটাই বিশ্ব ফুটবলের নিয়ন্ত্রক সংস্থার রাজনীতি পুরো পাল্টে দিয়েছিল।

আপাতত ’৬৬ বিশ্বকাপে ফেরা যাক, যেখানে সেরা খেলোয়াড় একজন আফ্রিকান। মোজাম্বিকে জন্ম নেওয়া ইউসেবিও-র জাদুতে মোহাবিষ্ট ছিল সেই বিশ্বকাপ। ও রকম ক্ষিপ্র গতির খেলোয়াড় আজতক ফুটবল-বিশ্বে আর দেখা যায়নি বলেই অনেকে মনে করেন।

অন্যান্য সাম্রাজ্যবাদী দেশগুলোর অধিকাংশ কলোনি খোয়া গেলেও পর্তুগাল নিজের আফ্রিকান কলোনি মোজাম্বিক আর অ্যাঙ্গোলা তখনো ধরে রেখেছিল, আর সেই কারণেই ‘কালো চিতা’ ইউসেবিও পর্তুগালের হয়ে খেলেন।

সেটি ছিল পর্তুগালেরও প্রথম বিশ্বকাপ আর সেবার এশিয়া থেকে খেলা একমাত্র দেশ উত্তর কোরিয়াও প্রথমবারের মতো খেলে চূড়ান্ত পর্বে। এ দুই দেশই বিশ্বকাপ মাতিয়ে তোলে অপ্রত্যাশিত সাফল্যে। সে আলোচনায় পরে যাওয়া যাবে। পর্তুগালসহ ইউরোপের ১০টি, লাতিন আমেরিকার ৪টি আর মেক্সিকো ও উত্তর কোরিয়া চার গ্রুপে ভাগ হয়ে অংশ নেয়। প্রতিটি ম্যাচই টেলিভিশনে সরাসরি দেখানো হয়। এই সরাসরি সম্প্রচার নিয়ে একটু ঝামেলাও হয়।

উইম্বলডন আর ওপেন গলফ চ্যাম্পিয়নশিপ নিয়ে বিবিসির ব্যস্ততার কারণে গোটা টুর্নামেন্টটাই পিছিয়ে শুরু করা হয় ১১ জুলাই থেকে (কেবল প্রথম বিশ্বকাপ, যেটি ১৩ জুলাই শুরু হয়েছিল বাদে আর কোনো আসর আজ পর্যন্ত এত দেরি করে শুরু হয়নি) আর ফাইনাল হয় ৩০ জুলাই।

ইউরোপিয়ানরা সেবার ভীষণ রক্ষণাত্মক কৌশলে খেলা শুরু করে। গোলকিপারের ঠিক সামনে, সুইপার পজিশনে একজন করে বাড়তি সুইপার খেলিয়ে গোল করার থেকে গোল বাঁচানোকেই একমাত্র কর্তব্য হিসেবে অলিখিত ঘোষণা দেয়। সেটা না হয় খেলার কৌশল! কিন্তু সেই ব্রিটিশ বিশ্বকাপে খেলার কৌশলের বাইরেও রেফারিরা যেন একজোট হয়ে ইউরোপিয়ান দলগুলোকে জেতাতে উঠেপড়ে লেগেছিল!

মোট ২৪ জন ইউরোপিয়ান রেফারির কমবেশি সবাই পক্ষপাতের বাঁশি বাজালেও দুটি খেলায় সব সীমা যেন একেবারে ছাড়িয়ে গিয়েছিল। দুটোই ছিল বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনাল ম্যাচ। ইংলিশ রেফারি জিম ফ্যানি বীরবিক্রমে একতরফা রেফারিং করে জার্মানিকে জোর করে জেতান উরুগুয়ের বিপক্ষে।

জার্মান ডিফেন্ডার শ্নেলিঙ্গার গোললাইন থেকে হাত দিয়ে বল ফেরালেও পেনাল্টি তো দূরের কথা প্রতিবাদ করায় উরুগুয়ের দুজনকে মাঠ থেকে বহিষ্কার করেন। আর নিজের দেশের দলকে সেমিতে ওঠানোর দায় শোধ করতেই কি না, জার্মান রেফারি ক্রেইটলেইন রুডলফ ইংলিশদের সাহায্য করেন আরেক লাতিন দেশ আর্জেন্টিনাকে হারানোয়।

এই রেফারি আর্জেন্টাইন খেলোয়াড় আন্তোনিও রাটিনকে বহিষ্কারাদেশ দেন। রাটিন দাবি করেন, তিনি ফাউল করেননি। রেফারির পাল্টা যুক্তি অনেকটাই এমন ছিল, ‘ফাউল করেছো কি করোনি জানি না, তোমার চাহনি আমার ভালো ঠেকছে না বাপু, তুমি বেরিয়ে যাও।’ এরপর জিওফ হার্স্টের গোলটা অফসাইড—আর্জেন্টিনার খেলোয়াড়দের এই দাবিতেও কর্ণপাত করেননি তিনি। কোয়ার্টারের এই ম্যাচকে আর্জেন্টিনায় বলা হয় ‘এল রবো দেল সিগ্লো’ বা ‘শতাব্দীর শ্রেষ্ঠ ডাকাতি’।

এভাবে দুই লাতিন দল বিদায় নিল কোয়ার্টার ফাইনাল থেকে। প্রথম রাউন্ডেই অবশ্য আগের দুবারের চ্যাম্পিয়ন ব্রাজিলকে রীতিমতো মারতে মারতেই বের করে দেওয়া হয়। পেলেকে বুলগেরিয়া আর পর্তুগালের খেলোয়াড়েরা মারাত্মক ফাউল করে মাঠের বাইরে পাঠিয়ে দেন। আর ইউরোপিয়ান রেফারিদের আচরণও ছিল আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দুর্নীতিবাজ সদস্যদের মতো। আহত পেলে মাঠ ছাড়েন, ব্রাজিল প্রথম রাউন্ডে বিদায় নেয়। বিদায় নেন ‘ছোট পাখি’ গারিঞ্চাও।

মনে রাখতে হবে, নব্বই মিনিটের খেলায় তখন পর্যন্ত একমাত্র চোটপ্রাপ্ত গোলকিপার বাদে অন্য কোন খেলোয়াড় বদলি করা যেত না। ফলে মারধর খেয়ে বেরিয়ে যাওয়া খেলোয়াড়দের জায়গায় বদলি ছিল না। কম খেলোয়াড় নিয়ে খেলেই হার মেনে নিতে হতো দলগুলোকে। এভাবে ইউরোপিয়ান রেফারিরা বিতর্কিত সব সিদ্ধান্ত দিয়ে অল-ইউরোপিয়ান সেমিফাইনাল নিশ্চিত করে।

ব্রিটিশদের এই বিশ্বকাপের গ্রুপ পর্বে ইংল্যান্ড একটিও গোল না খেয়ে দুই খেলায় জেতে আর এক খেলায় ড্র করে ‘এ’ গ্রুপ থেকে উরুগুয়ের সঙ্গে দ্বিতীয় রাউন্ডে ওঠে। বাদ পড়ে মেক্সিকো আর ফ্রান্স। ‘বি’ গ্রুপে পশ্চিম জার্মানি প্রথম ম্যাচে সুইজারল্যান্ডকে ৫-০ গোলে উড়িয়ে দেয় যার মধ্যে দুটি গোল করেন তরুণ ফ্রাঞ্জ বেকেনবাওয়ার। তিনি পরে হয়ে ওঠেন জার্মান ফুটবলের ‘কাইজার’ বা ‘সম্রাট’।

সেবার মাত্র ২০ বছর বয়সেই দারুণ পারফর্ম করলেও জার্মানির সে যুগের সবচেয়ে বড় তারকা ছিলেন স্পেনের বিরুদ্ধে জয়সূচক গোল করা উয়ে সিলার। হামবুর্গে জন্ম নেওয়া গাট্টাগোট্টা আর মগের পর মগ বিয়ার শেষ করা উয়ে সিলার ছিলেন যেন জার্মান জীবনদর্শনের প্রতিচ্ছবি।

বল পেলে দৌড়াতেন চঞ্চল খরগোশের মতো, গোলমুখে আক্রমণে ক্ষ্যাপা ষাঁড়, আর শত প্রলোভনেও কখনো ইউরোপের অন্য দেশের লিগ খেলতে যাননি। তাই চারটি বিশ্বকাপ খেলা উয়ে সিলার যখন বল পেতেন, দর্শকেরা চিৎকার করে বলতেন উয়ে, উয়ে! তবে সেই চিৎকার আসলে ছিল জার্মানি, জার্মানি বলে।

‘সি’ গ্রুপে পেলে আর গারিঞ্চা মার খেয়েও দুটো গোল দিয়ে হারিয়ে ছাড়েন বুলগেরিয়াকে, কিন্তু হেরে যায় হাঙ্গেরির কাছে। শেষ ম্যাচে মুখোমুখি হয় ব্রাজিল-পর্তুগাল। কালো চিতা ইউসেবিওর জোড়া গোলে পর্তুগাল চলে যায় দ্বিতীয় রাউন্ডে, চ্যাম্পিয়নরা বাদ পড়ে প্রথম রাউন্ড থেকেই।

ডি গ্রুপে সোভিয়েত ইউনিয়ন ছিল অপ্রতিরোধ্য। জিয়ান্নি রিভেরা আর সান্দ্রো মাজোলার মতো খেলোয়াড়দের নিয়ে গড়া দুর্দান্ত ইতালিকে তারা হারায় ১-০ গোলে। আর হারাবে নাই-বা কেন! দলে ছিলেন একজন লেভ ইয়াশিন। তর্কযোগ্যভাবে সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ গোলকিপার। এখন পর্যন্ত ‘ব্যালন ডি অর’ জেতা একমাত্র গোলকিপার। গোলকিপিং ব্যাপারটাকেই বদলে দিয়েছিলেন ‘ব্ল্যাক স্পাইডার’খ্যাত ইয়াশিন।

সোভিয়েত ইউনিয়নের এক কারখানা শ্রমিকের পুত্র ইয়াশিন ১৮ বছর বয়সে নার্ভাস ব্রেকডাউনের জন্য কাজ ছাড়তে বাধ্য হলেও খেলার মাঠে ছিলেন ইস্পাত-কঠিন নার্ভের প্রতিশব্দ।

কেবল বল ঠেকানো নয়, তিনি ছিলেন ডিফেন্সের সেনাপতি। নিখুঁত পজিশন সেন্স, ভোকাল আর সাহস দিয়ে তিনি ডিফেন্সের নেতৃত্ব দিতেন রুশ সীমান্তের যোদ্ধাদের মতো। একটা পিন যাওয়ার মতো ফাঁকা জায়গা রাখতেন না। কালো পোশাকে যখন তিনি দেহ প্রসারিত করে বল ধরতেন, মনে হতো একটা বিশাল মাকড়সা জাল পেতে আছে। আবার গোলার মতো শট ঠেকিয়ে দিতেন অবলীলায়, বিকারহীনভাবে, আর জিমন্যাস্টের মতো ঠেকাতেন শয়ে শয়ে পেনাল্টি শট।

তবে ইতালীয়রা কেবল ইয়াশিনের সোভিয়েতের কাছেই নয়, ধাক্কা খায় পুঁচকে উত্তর কোরিয়ানদের কাছেও। মিডলসবারোতে ১৯ জুলাইয়ের গ্রুপ ম্যাচে ৪২ মিনিটে পাক ইক-দু নামের সেনাবাহিনীর হাবিলদারের দেওয়া গোলের কোনো জবাবই তারা দিয়ে উঠতে পারেনি।

ইতালিকে টুর্নামেন্ট থেকে ছিটকে দেওয়া সেই গোল নিয়ে কত লেখা, কত কিংবদন্তির জন্ম হয়েছে। তবে সবচেয়ে বেশি প্রচার পেয়েছিল, পাক ছিলেন একজন দাঁতের ডাক্তার। কে জানে, ইতালিয়ানরা হয়তো অবচেতনে ভাবত যে দাঁতের ডাক্তার ছাড়া আর কেইবা পারে এত অমায়িকভাবে চুপ করিয়ে দিতে! তবে উত্তর কোরিয়ার চমক সেখানেই শেষ হয়নি!

২৩ জুলাই গুডিসন পার্কের কোয়ার্টার ফাইনাল ম্যাচে ২৫ মিনিটের মধ্যে পর্তুগালকে তিন গোল দিয়ে এগিয়েও যায় পাকের দল। বিধি বাম! অতিমানব হয়ে উঠলেন কালো চিতা ইউসেবিও। ইসরায়েলি রেফারির বদান্যতায় দুটি পেনাল্টি গোলসহ মোট চারটি গোল করেন নিজে আর দল জেতে ৫-৩ গোলে।

ইউসোবিও যেখানে জন্মেছিলেন, সে এলাকার ছেলেরা বড় হয়ে জুতা পলিশ, বাদাম বিক্রি কিংবা পকেটমার হয়। বাচ্চা বয়সে তাঁকে বলা হতো ‘নিনগুয়েম’—মানে ‘কেউ না’। তবে আরও অগণিত ‘কেউ না’দের সঙ্গে সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত ফুটবল খেলত ইউসেবিও। ফুটবল খেলতে নামলে মনে হতো যেন পুলিশের ধাওয়া কিংবা দারিদ্র্যের ছোবল এড়াতে সে দৌড়াচ্ছে। আর এই দৌড়ের জন্যই নাম হয় কালো চিতা।

অসম্ভব সব কোণ থেকে গোল করতে পারলে কী হবে, কালো মানুষ বলে শাসকের বুটের নিচে থেকেই এক দুঃখী, অতৃপ্ত জীবন তাঁকে পার করতে হয়। সে টুর্নামেন্টে অবিশ্বাস্যভাবে নয়টি গোল দিয়েও তাঁর ফাইনালও খেলা হয়নি, সেমি ফাইনালে ইংল্যান্ডের সঙ্গে এক গোল দিলেও ববি চার্লটন নামে ম্যানচেস্টারে জন্ম নেওয়া আরেক মজুরের ছেলের জোড়া গোলে হারে ইউসেবিওর পর্তুগাল।

সেমিফাইনালের অন্য খেলায় বেকেনবাওয়ার আর হেলমুট হেলার, শেষ পর্যন্ত ইয়াশিনকে পরাস্ত করার কৃতিত্ব দেখিয়ে জার্মানিকে ফাইনালে তোলেন। তবে ফুটবলের দুই ইউরোপীয় ‘মুরব্বি’ কোয়ার্টার ফাইনালে রেফারিদের সহায়তা পেলেও ফাইনালে গিয়ে দর্শক দেখে আসল ‘ব্রিটিশগিরি’।

ওয়েম্বলির ফাইনালে হেলমুট হেলার ১২ মিনিটের মাথায় পশ্চিম জার্মানিকে এগিয়ে নিলেও ছয় মিনিট পর শোধ দেন জিওফ হার্স্ট। মার্টিন পিটারস ৭৮ মিনিটে স্বাগতিকদের ফের এগিয়ে নিলেও এক মিনিট বাকি থাকতে ফ্রি কিকে উলফগ্যাং উয়েবার সমতা আনেন। খেলা গড়ায় অতিরিক্ত সময়ে। আসে সেই মাহেন্দ্রক্ষণ।

৯৮ মিনিটের মাথায় হার্স্টের শট ক্রসপিসে লেগে গোললাইনে পড়ে কিন্তু আজারবাইজানের (যদিও এ ঘটনার পর সারা জীবন ‘রুশ লাইন্সম্যন’ বলেই কুখ্যাত) লাইন্সম্যান তৌফিক বাখরামভ সেটিকে গোল হিসেবে ঘোষণা করেন আর সুইস রেফারি দিয়েন্সত গটফ্রিড সেই সিদ্ধান্তই বহাল রাখেন। জার্মানদের চিৎকার-চেঁচামেচিতে তো কাজ হয়ই-নি উল্টো শেষ মুহূর্তে গোল দিয়ে হার্স্ট হ্যাটট্রিক তুলে নেন।

সেটি বিশ্বকাপের ইতিহাসে ফাইনালে করা একমাত্র হ্যাটট্রিক! উচ্ছ্বসিত রানির হাত থেকে বিশ্বকাপ নিয়েছেন ববি মুর-ববি চার্লটনরা।