‘অবাস্তব গোলের কল্পনা করবেন না, ফুটবল এভাবে চলে না’—চেনা মেজাজেই বাটলার

বাংলাদেশ দলের অনুশীলনে কোচ পিটার বাটলারবাফুফে

গোয়ার আরব সাগরের শান্ত নীল জলরাশি আর দিগন্তজোড়া নারকেলগাছের সারি বাইরে যতই ছুটির আমেজ ছড়িয়ে দিক না কেন, বাংলাদেশ নারী ফুটবল দলের শিবিরে এখন শুধুই রণপ্রস্তুতি। সাফ নারী চ্যাম্পিয়নশিপে লাল-সবুজের প্রতিনিধিদের সামনে এবার হ্যাটট্রিক শিরোপা জয়ের সুযোগ। তবে ‘নতুন যুগ, নতুন টুর্নামেন্ট’—এই মন্ত্রে বিশ্বাসী বাংলাদেশ দলের ইংলিশ কোচ পিটার বাটলার অতীত নিয়ে পড়ে থাকতে রাজি নন মোটেও।

আগামীকাল এই পর্তুগিজ সংস্কৃতির চাদরে জড়ানো সৈকত-শহরে মালদ্বীপের বিপক্ষে ম্যাচ দিয়ে মিশন শুরু করছে বাংলাদেশ। কাগজে-কলমে এই ম্যাচে জয় নিয়ে সংশয় না থাকলেও ফুটবলপ্রেমীদের মনে ঘুরপাক খাচ্ছে গোয়ার বিখ্যাত ‘ফেনি’ পানীয়র মতোই এক ঝাঁঝালো সমীকরণ।

টুর্নামেন্টের উদ্বোধনী ম্যাচে এই মালদ্বীপকে ১১-০ গোলের বিশাল ব্যবধানে ভাসিয়ে শুভসূচনা করেছে চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী ভারত। ফলে গ্রুপ সেরা হয়ে সেমিফাইনালে তুলনামূলক সহজ প্রতিপক্ষ পেতে হলে বাংলাদেশের ওপরও গোলের পাহাড় গড়ার একটা অলিখিত চাপ তৈরি হয়েছে। তবে ম্যাচের আগের দিন আজ গোয়ার ডন বস্কো কলেজ মাঠে দলবল নিয়ে অনুশীলন শেষে সংবাদমাধ্যমের মুখোমুখি হয়ে এই ‘গোল-বন্যা’র তত্ত্বকে সাগরের জোয়ারের মতোই স্রেফ উড়িয়ে দিলেন বাংলাদেশ কোচ। বাটলার স্পষ্ট ভাষায় বলে দিলেন, ‘১০, ১১ বা ১২ গোল করার মতো অবাস্তব কোনো কল্পনা করবেন না, ফুটবল এভাবে চলে না।’

ভারত ১১ গোল দিয়েছে বলেই বাংলাদেশকে ১২ গোল দিতে হবে! গোয়ার মারগাওয়ে আগামীকাল রাত আটটায় শুরু মাঠের লড়াইয়ের আগে এমন সমীকরণে বিশ্বাসী নন অভিজ্ঞ এই কোচ। মালদ্বীপের বড় পরাজয়ের পেছনে সাগরের ঢেউয়ের মতো তাদের ওপর দিয়ে যাওয়া দীর্ঘ ভ্রমণক্লান্তি ও প্রস্তুতির অভাবকে কারণ হিসেবে দেখছেন বাংলাদেশ কোচ। বাটলার বলেন, ‘আপনি যদি শুধু গোলের পেছনে বা সুযোগের পেছনে ছোটেন, তবে শেষ পর্যন্ত লক্ষ্য পূরণ না-ও হতে পারে।’

বাটলার মালদ্বীপের ওই ফল নিয়ে ভাবছেন না; কারণ, তারা দীর্ঘ সময় ট্রানজিটে আটকে ছিল। আর মালদ্বীপের বিপক্ষে যাঁরা নির্দিষ্টসংখ্যক গোল করার কথা বলেন, তাঁরা ফুটবল বোঝেন না, ‘এটি একটি ম্যারাথন, কোনো স্প্রিন্ট (স্বল্পদূরত্বের দৌড়) নয়।’

টুর্নামেন্টের প্রথম ম্যাচ খেলতে নামার আগে প্রস্তুতিতে বাটলারের দল
বাফুফে

বাংলাদেশ দল গত দুটি সাফ টানা জিতেছে, যার দ্বিতীয়টি এসেছে এই বাটলারের অধীনেই। তবে গোয়ার সমুদ্রসৈকতে দাঁড়িয়ে পুরোনো বালুর ঘর নিয়ে না ভেবে বর্তমানের জোয়ারে ভাসতে চান কোচ। মেয়েদের কাছ থেকে তিনি পেশাদার এবং সুশৃঙ্খল পারফরম্যান্স আশা করছেন। বাটলারের ভাষ্য, বাংলাদেশ দল সামনের ম্যাচ নিয়েই শুধু ভাবছে। অতীতে যা হয়েছে তা শেষ। বাংলাদেশকে সামনের দিকে তাকাতে হবে, ইতিবাচক থাকতে হবে এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো সাগরের মতোই বিনয়ী থাকা। বাটলার বলেন, ‘সবাই ৩১ তারিখের ভারত ম্যাচ বা বিভিন্ন সমীকরণ নিয়ে কথা বললেও দলের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো পরবর্তী ম্যাচটি (মালদ্বীপ ম্যাচ)।’

তিন বছর ধরে দলটির সঙ্গে কাজ করা বাটলার মেয়েদের শারীরিক শক্তির ঘাটতি পুষিয়ে নেওয়ার ওপর জোর দিয়েছেন। গোয়ার সুস্বাদু সামুদ্রিক খাবারের পুষ্টি আর শক্তির উপমা যেন ফুটে উঠল তাঁর কথায়, ‘বাংলাদেশ যে ম্যাচগুলো হেরেছে, তার ৯৫ শতাংশ ক্ষেত্রেই প্রতিপক্ষের শারীরিক গঠন বাংলাদেশের মেয়েদের চেয়ে ভালো ছিল। তাই মাঠে আরও শক্তিশালী এবং আক্রমণাত্মক হওয়া দরকার।’

গোয়ার ডন বস্কো কলেজ মাঠে অনুশীলন করে বাংলাদেশ
প্রথম আলো

আগামীকালের ম্যাচের একাদশ ও চোট নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ তথ্যও দিয়েছেন কোচ। চোটের কারণে মালদ্বীপের বিপক্ষে দেখা যাবে না মাঝমাঠের অন্যতম ভরসা মনিকা চাকমাকে। তাঁকে ভারত ম্যাচের জন্য রাখা হচ্ছে। তবে সুখবর হলো সুস্থ হয়ে উঠেছেন গোলকিপার মিলি। যদিও গোলপোস্টের নিচে দেখা যেতে পারে গত দুটি সাফজয়ী অতন্দ্র প্রহরী রুপনা চাকমাকেই। আজ অনুশীলনে রুপনাকেই অনেকটা সময় পোস্ট আগলাতে দেখা গেছে ক্রস, ফ্রিকিকের সময়।

গোয়ার তপ্ত রোদ আর আর্দ্রতা নিয়ে ফুটবলারদের কিছুটা বেগ পেতে হলেও একে অজুহাত হিসেবে দাঁড় করাতে চান না পিটার বাটলার। এই ইংলিশ কোচ স্বভাবসুলভ রসিকতার ছলে বলে দিলেন, ‘আবহাওয়া গরম এবং আর্দ্র হলেও এটি সবার জন্যই সমান। ইংল্যান্ডের অবিরাম বৃষ্টির চেয়ে এই ঝলমলে রোদ অনেক ভালো।’ যোগ করেন, গোয়ায় অনুশীলনের সুবিধা যা আছে, তা নিয়েই চলতে হবে।

এখন দেখার বিষয়, পর্তুগিজ সংস্কৃতির আবহে গড়ে ওঠা এই গোয়ার মাঠে মারিয়া-রুপনারা তাঁদের ছন্দ ধরে রেখে হ্যাটট্রিক শিরোপার প্রথম ধাপটি কতটা মসৃণভাবে পার করতে পারেন। দিন শেষে গোলবন্যা হোক বা না হোক, আরব সাগরের তীরে লাল-সবুজের উৎসবের জোয়ার দেখতেই এখন উন্মুখ ফুটবলপ্রেমীরা।

আরও পড়ুন