রিয়ালে আরবেলোয়ার ৭৫ দিন: হঠাৎ কোচ হয়ে এসেই উন্নতি যে কারণে
গত জানুয়ারিতে আলভারো আরবেলোয়ার রিয়াল মাদ্রিদের প্রধান কোচের দায়িত্ব নেওয়াটা ছিল একেবারে অপ্রত্যাশিত ঘটনা। বিশেষ করে বিদায়ী কোচ জাবি আলোনসোর বিপরীতে কোচ হিসেবে তিনি ছিলেন অখ্যাত একজন। শুরুতে অবশ্য তাঁকে আপৎকালীন বিকল্প হিসেবেই দেখছিলেন রিয়াল সমর্থকেরা। তবে সেই আপৎকালীন কোচই এখন হয়ে উঠেছেন ভরসার নাম।
আরবেলোয়া যখন কোচ হিসেবে দায়িত্ব নেন, তখন নতুন করে অভ্যস্ত হওয়ার খুব কম সময় ছিল। টানা ম্যাচের কারণে তাঁর জন্য ধীরে ধীরে দলের সঙ্গে পরিচিত হওয়া সম্ভব ছিল না। শুরু থেকেই চোখ রাখতে হয়েছে ফলাফলের দিকে। সে সময় স্প্যানিশ সংবাদমাধ্যমগুলো সতর্ক করেছিল যে কাজটা একদমই সহজ হবে না। বিশেষ করে এমন একটি ড্রেসিংরুম সামলানো যেখানে একসঙ্গে একাধিক বড় তারকার উপস্থিতি রয়েছে। তবে সব আশঙ্কা ও অনিশ্চয়তা উড়িয়ে দলকে বেশ ভালোভাবেই এগিয়ে নিচ্ছেন আরবেলোয়া।
রিয়ালের মতো হাইপ্রোফাইল স্কোয়াড সামলানো নিয়ে প্রথম সংবাদ সম্মেলনে আরবেলোয়া বলেছিলেন, ‘এটা আমাকে খুব চিন্তিত করে না।’ দুই মাস পর আরবেলোয়া জানান খেলোয়াড়দের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক আরও শক্তিশালী হচ্ছে, আর মাঠের ফলও ধীরে ধীরে ভালো হচ্ছে। এমনকি আলোনসোর সময় ঝিমিয়ে পড়া কিছু তারকাকেও নতুন করে উজ্জীবিত করে তুলেছেন আরবেলোয়া। রিয়ালে তাঁর প্রাথমিক সাফল্যের পেছনে যে বিষয়গুলো ভূমিকা রেখেছে, তেমন কিছু বিষয় নিয়ে এই প্রতিবেদন।
সম্পর্ক গড়ে তোলা
গত মার্চে আরবেলোয়া রিয়ালকে এমন প্রতিপক্ষের বিপক্ষে জিতিয়েছেন, যারা পরিচালিত হচ্ছে ফুটবলের শীর্ষ কোচদের দ্বারা। যেমন জোসে মরিনিওর বেনফিকা, পেপ গার্দিওলার ম্যানচেস্টার সিটি এবং ডিয়েগো সিমিওনের আতলেতিকো মাদ্রিদ।
লা লিগায় শীর্ষে থাকা বার্সেলোনার চেয়ে চার পয়েন্টে পিছিয়ে থাকলেও এখনো শিরোপা জয়ের দারুণ সম্ভাবনা আছে রিয়ালের। চ্যাম্পিয়নস লিগেও সঠিক পথে আছে দলটি। এখন কোয়ার্টার ফাইনালে বায়ার্ন মিউনিখের মুখোমুখি হওয়ার অপেক্ষায় তারা। মূলত আলোনসোর বিদায়ের পর থেকেই ইতিবাচক ফল পাচ্ছে রিয়াল। যেখানে বড় ভূমিকা রেখেছে কোচ ও খেলোয়াড়দের সম্পর্কের উন্নতি।
গত সপ্তাহে নগরপ্রতিদ্বন্দ্বী আতলেতিকোর বিপক্ষে ৩-২ গোলে জয়ের পর আরবেলোয়া বলেন, ‘আমি খেলোয়াড়দের আরও ভালোভাবে চিনছি।’
দায়িত্ব নেওয়ার সময়ে নতুন চ্যালেঞ্জ কেমন ছিল, তা জানিয়ে আরবেলোয়া আরও বলেছেন, ‘আমি এমন সময় দায়িত্ব নিয়েছিলাম, যখন প্রায় কোনো সময়ই পাইনি খেলোয়াড়দের সঙ্গে কাজ করার। এমনকি তারা কোথায় স্বস্তি বোধ করে এবং কীভাবে একে অপরের সংযোগ তৈরি করে, তাও বোঝার বিষয় ছিল।
আরবেলোয়া স্বীকার করেন, মৌসুমের মাঝপথে দায়িত্ব নেওয়া সহজ ছিল না, ‘মাঝ-মৌসুমে এসে দল কীভাবে কাজ করে, তা পর্যবেক্ষণ করা সহজ নয়, আর এ দুই মাসে সেটাই পরিবর্তিত হয়েছে। এখন আমি আমার খেলোয়াড়দের ব্যক্তিগত এবং পেশাদার দিক থেকে ভালোভাবে জানি, কোথা থেকে তাদের সর্বোচ্চ পারফরম্যান্স পাওয়া যাবে, আর কোথায় সমন্বয় করা দরকার, সেটাও বুঝি।’
চেনা ছন্দে ভিনিসিয়ুস
আরবেলোয়ার অধীনে দারুণভাবে ছন্দে ফিরেছেন ভিনিসিয়ুস জুনিয়র। এই কোচ দায়িত্ব নেওয়ার পর ১৭ ম্যাচের মধ্যে ১৬টিতেই একাদশে ছিলেন তিনি। গোলসংখ্যাও বেড়েছে উল্লেখযোগ্যভাবে। আরবেলোয়ার অধীনে ভিনি করেছেন ১১ গোল। যেখানে আলোনসোর সময়ের ২৭ ম্যাচে করেছিলেন মাত্র ৬ গোল।
দায়িত্ব নেওয়ার পর এ ব্রাজিলিয়ান ফরোয়ার্ডের আত্মবিশ্বাস ফিরিয়ে আনায় বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন আরবেলোয়া। কৌশলগত বাঁধনে আটকে না রেখে তাঁকে স্বাধীনভাবে খেলতে ও নিজের স্বাভাবিক খেলাটা উপভোগ করতে উৎসাহ দিয়েছেন রিয়ালের সাবেক এ খেলোয়াড়।
রিয়ালের দায়িত্ব নিয়ে প্রথম সংবাদ সম্মেলনেই আরবেলোয়া বলেছিলেন, ‘ভিনিকে পেয়ে আমি ভাগ্যবান। সমর্থকদের কাছেও সে খুব প্রিয়। আমরা এমন ভিনিকেই দেখতে চাই, যে খেলা উপভোগ করে, হাসে, নাচে।’
আলোনসোর সময় পরিস্থিতি এমন ছিল না। সে সময় দুজনের মধ্যে টানাপোড়েনের খবরও উঠে আসে। অক্টোবরের ক্লাসিকোতে বদলি হওয়ার পর ভিনিসিয়ুসকে বলতে শোনা যায়, ‘আমি এই দল ছেড়ে চলে যাব।’ তবে সেই মনোভাব এখন একেবারেই বদলে গেছে।
ভালভের্দের ছন্দে ফেরা
আরবেলোয়া দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে ভিনির মতো দারুণ ছন্দে আছেন ফেদে ভালভের্দেও। আলোনসোর অধীনে ৩১ ম্যাচে ৩ গোলের পাশাপাশি ৭টি গোল করান উরুগুয়ে তারকা। কিন্তু আরবেলোয়ার সময়ে ভালভের্দের পারফরম্যান্সে এসেছে বড় পরিবর্তন। আরবেলোয়া দায়িত্ব নেওয়ার পর রিয়ালের খেলা ১৭ ম্যাচের সব কটিতেই একাদশে ছিলেন ভালভের্দে, ৭ গোলের পাশাপাশি গোল করিয়েছেন ৫টি।
ভালভের্দের উন্নতির পেছনে বড় কারণ ছিল তাঁর পজিশনে পরিবর্তন। তাঁকে আবার মিডফিল্ডে ফিরিয়ে আনা হয়েছে। আলোনসোর সময় ভালভের্দেকে অনেক সময় নিজের স্বাভাবিক পজিশনের বাইরে খেলতে হয়েছে, এমনকি রাইট-ব্যাক হিসেবেও নামানো হয়। এটা করা হয়েছিল মূলত চোটের কারণে দানি কারভাহাল ও ট্রেন্ট আলেকজান্ডার আরনল্ড ছিটকে যাওয়ায়। তবে এতে ভালভের্দের অসন্তোষও স্পষ্ট ছিল। তিনি বলেছিলেন, ‘আমি রাইট-ব্যাক হওয়ার জন্য জন্মাইনি।’
এখন নিজের পছন্দের পজিশনে ফিরে আবারও সেরা ছন্দে ফিরেছেন ভালভের্দে। মাত্র এক মাসেই করেছেন ৬ গোল। এর মধ্যে আছে চ্যাম্পিয়নস লিগে ম্যানচেস্টার সিটির বিপক্ষে দুর্দান্ত হ্যাটট্রিক এবং আতলেতিকোর বিপক্ষে জয়সূচক গোল।
তরুণদের উত্থান
রিয়ালের মূল দলের দায়িত্ব নেওয়ার আগে আরবেলোয়া ছিলেন ক্লাবটির ‘কাস্তিয়া’ (বি) দলের কোচ। তরুণদের মূল দলে তুলে আনা তাঁর জন্য ছিল স্বাভাবিক ব্যাপার। আরবেলোয়া কোচ হওয়ার পর সেটারই প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে।
চলতি মাসের শুরুতে এলচের বিপক্ষে আরবেলোয়া ‘কাস্তিয়া’র ছয় খেলোয়াড়কে সুযোগ দেন। গনসালো গার্সিয়া, দানিয়েল ইয়ানেজ, দিয়েগো আগুয়াদো, মানুয়েল অ্যাঞ্জেল ও সেজার পালাসিওসকে নামান বদলি হিসেবে, আর একাদশে রাখেন থিয়াগো পিতার্চকে।
পিতার্চ খুব দ্রুতই নিজেকে আরবেলোয়ার দলে অন্যতম সম্ভাবনাময় খেলোয়াড় হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। মাত্র ১৮ বছর ২২৬ দিন বয়সে ক্লাবের ইতিহাসে সবচেয়ে কম বয়সী খেলোয়াড় হিসেবে চ্যাম্পিয়নস লিগের নকআউট পর্বে দুবার শুরুর একাদশে নামার কীর্তি গড়েন পিতার্চ।
এক ম্যাচে একসঙ্গে পাঁচজন একাডেমির খেলোয়াড়কে মাঠে দেখে নিজের আবেগ লুকাতে পারেননি আরবেলোয়া, ‘আজকের মতো একটি রাতের পর আমি নিশ্চিন্তে মরতেও পারি।’
তবে রিয়ালে এটা কেবলই আরবেলোয়া যুগের শুরু। সামনে দলকে নিয়ে আরবেলোয়া আরও কি চমক উপহার দেন, সেটাই এখন দেখার অপেক্ষা।