আনচেলত্তির কথায় কবে চিড়ে ভিজবে, আর কবে ব্রাজিল ভালো খেলবে

ব্রাজিলের অনুশীলনে কোচ কার্লো আনচেলত্তিএএফপি

মানুষ তুলনা ভালোবাসে। ফুটবল হলে তো কথাই নেই।

ব্রাজিলেও এখন সেই তুলনার হাওয়া। একদিকে লুইস দে লা ফুয়েন্তে, অন্যদিকে আনচেলত্তি? তুলনাটা উসকে দিয়েছেন খোদ সেলেসাওদের সত্তরের বিশ্বকাপজয়ী মহাতারকা তোস্তাও। ‘ফোলহা ডি সাও পাওলো’তে লেখা তাঁর কলামে ফুটে উঠেছে চিরচেনা সেই হতাশা।

দে লা ফুয়েন্তে তো এর আগে কোনো জাতীয় দলের কোচিংই করাননি। ক্লাব ফুটবল বা স্পেনের বয়সভিত্তিক দল সামলেই স্প্যানিশ ফুটবলে এনেছেন আধুনিক চিন্তার হাওয়া; আর কার্লো আনচেলত্তি? ক্লাব ফুটবলে সর্বজয়ী, শিরোপার পর শিরোপা। অভিজ্ঞতা পাহাড়সম। ব্রাজিলের দায়িত্ব নিয়েছেন গত বছরের জুনে। ডাগআউটে সবচেয়ে দামি কোচদের একজন। বিশ্বকাপের আগে সময় কম ছিল, সেটি মানা যায়; কিন্তু বিশ্বকাপের পর?

প্রশ্নটা এখন সেখানেই।

কুইন্সল্যান্ডে গত শুক্রবার অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে প্রীতি ম্যাচে নতুন কিছু চোখে পড়েনি। কৌশলে নেই চমক। নেই নতুন কোনো চিন্তার ঝলক। যেন পুরোনো ছবির পুনঃপ্রদর্শনী। একই ফ্রেম, একই দৃশ্য। সমস্যাটাও পুরোনো।

মিডফিল্ডে ঘাটতি, কৌশলে ঘাটতি, দক্ষতায় ঘাটতি। সেই ঘাটতি ঢাকতে চার ফরোয়ার্ড নামানোর চেষ্টা; কিন্তু মূল সংকট রয়ে গেছে বোঝাপড়ার অভাবে। রক্ষণ, মাঝমাঠ আর আক্রমণের মধ্যে দূরত্ব যেন আলাদা তিনটা দ্বীপ।

একসময় ব্রাজিল এমন ছিল না। পাস মানেই ছিল কবিতার পঙ্‌ক্তি। কিংবা সাম্বার তালে তালে নাচ। এখন সেই সুর নেই; আর সেই হারানো সুরই ফিরিয়ে আনার দায়িত্ব আনচেলত্তির। কিন্তু তাঁর কণ্ঠে কেবল একটাই বুলি—ধৈর্য ধরুন!

অস্ট্রেলিয়ার মুখোমুখি হওয়ার আগে সর্বশেষ অনুশীলনে ব্রাজিল দল
সিবিএফ এক্স হ্যান্ডল

ব্রিসবেনের সানকর্প স্টেডিয়ামে আজ বাংলাদেশ সময় বিকেল ৪টায় দ্বিতীয় প্রীতি ম্যাচে অস্ট্রেলিয়ার মুখোমুখি হবে ব্রাজিল। এই ম্যাচের আগে সংবাদ সম্মেলনে উঠেছিল সমালোচনার প্রসঙ্গ। আনচেলত্তিও জানেন এই পটভূমি তৈরি হয়েছে তাঁর হাতেই।

গত জুলাইয়ে বিশ্বকাপের শেষ ষোলো থেকে বিদায় নেওয়ার পর গত শুক্রবারই প্রথম মাঠে নেমেছিল ব্রাজিল। নরওয়ে কিংবা ক্রোয়েশিয়ার মতো দলের কাছে হারের স্মৃতি পেছনে ফেলে অস্ট্রেলিয়ার সঙ্গে ১–১ ড্র, সে–ও আবার শেষ মুহূর্তের গোলে মান রক্ষা! দুই দশক আগেও এমন ফলাফলে কুরুক্ষেত্র বেজে যেত। আজ সেখানে অদ্ভুত এক শীতল নিরাসক্তি। ব্রাজিলের আভিজাত্য কমতে কমতে এমন জায়গায় এসে ঠেকেছে যে মাঝারি দলের সঙ্গে ড্র–ও এখন গা–সওয়া ব্যাপার।

আরও পড়ুন

ব্রাজিল নিয়ে মানুষের পাল্টে যাওয়া ভাবনাটা এখনো পাল্টাতে পারেননি আনচেলত্তি। ওদিকে সমালোচনা কম হচ্ছে না। ইতালিয়ান এই কোচ অবশ্য নিন্দায় পাত্তা দিচ্ছেন না। দ্বিতীয় ম্যাচের আগে তাঁর কণ্ঠে আবারও ঝরল ভবিষ্যতের কথা, ‘সমালোচনা হয় হোক, আমাদের ভবিষ্যৎ আছে। ব্রাজিল জাতীয় দলের কোচকে ঘিরে প্রত্যাশার পারদ সব সময় তুঙ্গে থাকে। এখানে আপনাকে বিশ্বকাপ জিততেই হবে। ক্যারিয়ারের কোনো বছরে আমার ওপর প্রত্যাশার চাপ কম ছিল, এমন কথাও মনে পড়ে না।’

আনচেলত্তি এরপর সরাসরি বলেছেন, ‘আমার কাজ নিয়ে সমালোচনা আগে যেমন ছিল, ভবিষ্যতেও থাকবে। এই সমালোচনা দল বা দলের খেলোয়াড়দের নিয়ে আমার ভবিষ্যৎ চিন্তাভাবনায় প্রভাব ফেলে না। আমার ভবিষ্যৎ পরিকল্পনায় সমালোচনা কতটা প্রভাব ফেলতে পারে? শূন্য!’

আনচেলত্তির নিকটতম ভবিষ্যৎ হলো আজ অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে ম্যাচটি। এই ম্যাচে কেমন হবে তাঁর রণকৌশল?

অভিজ্ঞ মারকিনিওস এখনো আনচেলত্তির ভরসার জায়গা
সিবিএফ এক্স হ্যান্ডল

ব্রাজিলের সংবাদমাধ্যম বলছে, একাদশে আসতে পারে অন্তত সাতটি বদল। সেটা ব্রিসবেনে খেলোয়াড়দের নিয়ে আনচেলত্তির অনুশীলন করানোর কৌশল দেখে। তাঁর সেই অনুশীলন দেখে ব্রাজিলের সংবাদমাধ্যমগুলো স্পষ্ট ইঙ্গিত পেয়েছে, অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে দ্বিতীয় ম্যাচে আনচেলত্তির একাদশে অন্তত ৭ পরিবর্তন আসতে পারে। শুধু তা–ই নয়, ব্রাজিলের অনুশীলনে রাফিনিয়া গা গরম করেছেন ৯ নম্বর স্ট্রাইকার হিসেবে।

বার্সেলোনায় এ মৌসুমে লেফট উইং থেকে সরে সেন্টার ফরোয়ার্ড পজিশনে খেলে তুমুল সাফল্য পাচ্ছেন রাফিনিয়া। এ মৌসুমে ৮ ম্যাচে করেছেন ১৪ গোল। বার্সা কোচ হান্সি ফ্লিকের রাফিনিয়ার পজিশন পাল্টানোর ‘ব্লু প্রিন্ট’ই আপাতত ধার করেছেন আনচেলত্তি। শুধু তা–ই নয়, অনুশীলনে খেলার ছক পাল্টে ৪–৩–৩ ফর্মেশনেও খেলোয়াড়দের তৈরি করেছেন ইতালিয়ান এ কোচ। অর্থাৎ ফর্মেশন পাল্টানোর সম্ভাবনাও আছে।

আরও পড়ুন

অনুশীলনে আনচেলত্তির একাদশটা দেখুন—গোলকিপার: ওতাভিও। ডিফেন্ডার: ভ্যান্ডারসন, জেয়ার, গ্যাব্রিয়েল মাগালাইস ও মাউরো জুনিয়র। মিডফিল্ড: দানিলো, ব্রুনো গিমারাইস ও গ্যাব্রিয়েল বোন্তেম্পো। ফরোয়ার্ড: রায়ান, রাফিনিয়া ও ভিনিসিয়ুস জুনিয়র। এই মূল দলের অনুশীলনে বেশির ভাগ সময় জোর দেওয়া হয়েছিল হাই-প্রেসিংয়ের ওপর।

সেন্টার ফরোয়ার্ড পজিশনে অনুশীলনে করেন রাফিনিয়া (সবার শেষে)
এক্স

আনচেলত্তির অধীনে পাশেই বিকল্প (রিজার্ভ) দলটি খেলেছে ৩-৫-২ ফর্মেশনে। এই দলে ছিলেন: উগো, ভিতর রেইস, মার্কিনিওস ও আর্থার দিয়াস, মাথিউজিনিও, এস্তেভাও, আন্দ্রে সান্তোস, দগলাস লুইস ও দগলাস সান্তোস। স্যামুয়েল লেনো ও এনদ্রিক; আর রোটেশন পলিসির অংশ হিসেবে স্কোয়াডের বাইরে রাখা হয়েছিল মার্তিনেল্লি, বাইডন ও পেদ্রোকে।

অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে প্রথম প্রীতি ম্যাচে ব্রাজিল শুরুর একাদশে ছিলেন উগো সুজা, মাথিউজিনিও, মার্কিনিওস, ভিতর রেইস, দগলাস সান্তোস, দানিলো, ব্রুনো গিমারাইস ও রাফিনিয়া, এস্তেভাও, ভিনিসিয়ুস জুনিয়র ও এনদ্রিক।

অনুশীলনে সেই একাদশে পরিবর্তন এনে রক্ষণে ভ্যান্ডারসন, জেয়ার, মাগালায়েস ও মাউরোকে পরীক্ষা–নিরীক্ষা করেছেন আনচেলত্তি। মাঝমাঠে জায়গা ধরে রাখেন ব্রুনো গিমারাইস ও দানিলো। তবে তাঁদের সঙ্গে নতুন যোগ দিয়েছেন সান্তোসের গ্যাব্রিয়েল বোন্তেম্পো। আক্রমণে দুই উইংয়ে অনুশীলন করেন রায়ান ও ভিনিসিয়ুস। সেন্টার ফরোয়ার্ড রাফিনিয়া। বাদ পড়েছেন এস্তেভাও ও এনদ্রিক।

আনচেলত্তি কি পারবেন ব্রাজিলকে ঘরে ফেরাতে
এএফপি

পরীক্ষা চলছে, নানা সমস্যার সমাধানের খোঁজ চলছে; কিন্তু উত্তর?

অস্ট্রেলিয়া পর্ব চুকিয়ে এই ব্রাজিল দলই আবার পা রাখবে ভারতভূমে। আগামী ৩ অক্টোবর যুবভারতীতে স্বাগতিক ভারতের বিপক্ষে ফিফা প্রীতি ম্যাচে খেলবে ব্রাজিল।
অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে আজ কিংবা সামনে ভারতের বিপক্ষে ম্যাচে ফল হয়তো আসবে; কিন্তু ব্রাজিল শুধু ফলের দল নয়, তারা অনুভূতির দল, সৌন্দর্যের দল।

সেই সৌন্দর্যের আভাস কবে মিলবে? নাকি আবারও শোনা যাবে একই কথা, ধৈর্য ধরুন।

শুকনো কথায় চিড়ে ভেজে কি?

আরও পড়ুন