দলকে ‘অক্সিজেন’ জুগিয়ে এই তো সেই ঋতুপর্ণা

গোলের পর এভাবেই সতীর্থদের নিয়ে উদযাপনে মাতেন ঋতুপর্ণা (জার্সি ১৭)বাফুফে

নেপালের আক্রমণের তোড়ে বাংলাদেশের তখন খড়কুটোর মতো উড়ে যাওয়ার উপক্রম। ১-০ গোলে পিছিয়ে থাকা দলটি যখন খাদের কিনারায় দাঁড়িয়ে ধুঁকছে, তখনই গোয়ার গ্যালারিতে নেপালিদের স্তব্ধ করে দিয়ে দেখা গেল তাঁর সেই চেনা রূপ। বাঁ পায়ের এক জাদুকরি বাঁকানো শটে কর্নার থেকে সরাসরি বল জড়াল জালে! অবিশ্বাস্য এক ‘অলিম্পিক গোল’। দল যখন ধ্বংসস্তূপে দাঁড়িয়ে, তখনই ত্রাতা হয়ে হাজির হলেন তিনি। হ্যাঁ, এই তো সেই ঋতুপর্ণা চাকমা!

মালদ্বীপ ও ভারতের বিপক্ষে আগের দুই ম্যাচে ঋতুপর্ণা ছিলেন নিজের ছায়া হয়ে। কিন্তু শিষ্যের অফফর্ম দেখেও এতটুকু আস্থা হারাননি কোচ পিটার বাটলার। বরং আগলে রেখে বলেছিলেন, তাঁর চোখে ঋতুপর্ণাই দক্ষিণ এশিয়ার সেরা উইঙ্গার। বাটলার যে এতটুকু বাড়িয়ে বলেননি, আজ নেপাল ম্যাচেই মিলল তার হাতেনাতে প্রমাণ। চরম সংকটে পড়া দলকে যেভাবে খাদের কিনারা থেকে টেনে তুললেন, তাতে এখন আর কারও মনে বিন্দুমাত্র সংশয় থাকার কথা নয় যে এই মুহূর্তে দক্ষিণ এশিয়ার সেরা লেফট উইঙ্গারটির নাম আসলেই ঋতুপর্ণা চাকমা।

ঋতুপর্ণা আদতে বড় মঞ্চের তারকা। বড় ম্যাচ এলেই যেন তাঁর সেরা খেলাটা বেরিয়ে আসে। আজ যে পুরো ম্যাচজুড়ে তিনি খুব ‘আমাকে দেখো’ ধরনের চোখধাঁধানো ফুটবল খেলেছেন, তা কিন্তু নয়। তবে ফুটবল তো আসলে মুহূর্তের খেলা, আর সেই মাহেন্দ্রক্ষণই লুফে নিয়েছেন তিনি। একটি জাদুকরি গোল কীভাবে পুরো দলের শরীরী ভাষা বদলে দিতে পারে, আজ তা আবারও প্রমাণিত হলো। ম্যাচের বেশির ভাগ সময় তীব্র চাপে থেকেও বাংলাদেশ যে শেষ পর্যন্ত জয় ছিনিয়ে মাঠ ছাড়ল, তার নেপথ্যের আসল অক্সিজেনটা তো ঋতুপর্ণাই জুগিয়েছেন।

গত সাফে বাংলাদেশ নারী দলের শ্রেষ্ঠত্ব ধরে রাখার মিশনের অন্যতম কান্ডারি ছিলেন ঋতুপর্ণা
বাফুফে

গত ৩১ মে ভারতের কাছে হেরে দল যখন মাঠ ছাড়ছিল, মিক্সড জোনে তখন ছিল সুনসান নীরবতা। অপেক্ষমাণ সাংবাদিকেরা বারবার ‘ঋতু’, ‘ঋতু’ বলে ডাকছিলেন, কিন্তু ঋতুপর্ণা চাকমা যেন তখন এক অন্য ভুবনে। একবারও সংবাদমাধ্যমের দিকে তাকালেন না, মাথা নিচু করে সোজা হেঁটে গেলেন টিম বাসের দিকে। মালদ্বীপ ও ভারতের বিপক্ষে টানা দুই ম্যাচে নিজের চেনা ছন্দ হারিয়ে ফেলা এক তারকার মনের ভেতরের ক্ষতটা সেদিন স্পষ্ট বুঝা যাচ্ছিল। তবে কে জানত, সেই নীরব অভিমানেই লুকিয়ে ছিল আজকের এই রাজকীয় প্রত্যাবর্তনের গল্প!

গত সাফে বাংলাদেশ নারী দলের শ্রেষ্ঠত্ব ধরে রাখার মিশনের অন্যতম কান্ডারি ছিলেন ঋতুপর্ণা। কাঠমান্ডুর ফাইনালে তাঁর বাঁ পায়ের সেই অবিশ্বাস্য, দূরপাল্লার শট স্তব্ধ করে দিয়েছিল স্বাগতিক নেপালিদের। এরপর গত বছরের জুলাইয়ে এশিয়ান কাপের বাছাইপর্বে মিয়ানমারের মাঠে স্বাগতিকদের বিপক্ষে ঋতুপর্ণার বাঁ পায়ের জোড়া গোলেই ইতিহাস গড়েছিল লাল-সবুজের মেয়েরা। বাংলাদেশ জায়গা করে নেয় এশিয়ান কাপের চূড়ান্ত পর্বে।

আরও পড়ুন

এমনকি মূল পর্বেও চীনের শক্তিশালী রক্ষণভেদের পেছনে দেখা গেছে তাঁর সেই চেনা বাঁ পায়ের জাদু। এবার গোয়া সাফে তাঁর জাদুর প্রভাব টের পেল নেপাল। খাদের কিনারায় দাঁড়িয়ে বাংলাদেশ দল আজ ঋতুপর্ণাকে পেল ঠিক যেমন করে পেতে চেয়েছিল। বলা যেতে পারে, এক অতন্দ্র ত্রাতা রূপে।

মালদ্বীপের বিপক্ষে ম্যাচে বাঁ প্রান্ত ধরে প্রতিপক্ষের ডি-বক্সে ২২-২৩টি ক্রস করেছিলেন ঋতুপর্ণা। কিন্তু টাইমিংয়ের গরমিল আর নিখুঁততার অভাবে সেই ক্রসগুলোর একটিও ফলপ্রসূ হয়নি। আজ নেপালের বিপক্ষে অবশ্য ক্রস করার সেই সুযোগ তেমন পাননি। বলা ভালো, নেপালি রাইট ব্যাক তাঁকে পুরোটা সময় কড়া পাহারায় রেখেছিলেন। কিন্তু ওপেন প্লেতে ঋতুকে আটকে রাখা গেলেও কর্নার কিকের মতো ডেড-বল পরিস্থিতিতে তাঁকে থামানোর সাধ্য কার!

সেখান থেকেই করলেন সেই দুরন্ত ‘অলিম্পিক গোল’। আর তাতেই যেন নেপালি ডিফেন্সের সব বাধা একনিমেষে গুঁড়িয়ে দিয়ে আবারও রাজকীয়ভাবে চেনালেন রাঙামাটির এই পাহাড়ি কন্যা!

আরও পড়ুন

ম্যাচের শেষ মুহূর্তে আত্মঘাতী গোলে বাংলাদেশের জয় নিশ্চিত হয়েছে ঠিকই, তবে ম্যাচের চিত্রনাট্য ও ভাগ্য বদলে দেওয়ার মূল কারিগর ছিলেন ওই একজনই। তাই তো ম্যাচ শেষে অফিশিয়াল ‘ম্যাচসেরা’র পুরস্কার উঠল ঋতুপর্ণা চাকমারই হাতে।

সাংবাদিকদের সামনে আসার পর তাঁকে যখন অলিম্পিক গোলটি নিয়ে জিজ্ঞেস করা হলো, ঋতুপর্ণা বললেন, ‘কর্নারটি নেওয়ার আগে আমি আত্মবিশ্বাসী ছিলাম। গোল হয়েছে। অনেক ভালো লাগছে।’

ঋতুপূর্ণা আরও একবার প্রমাণ করলেন, বাংলাদেশ নারী ফুটবলের আসল ‘ম্যাচ উইনার’ তিনিই।