কিলিয়ান এমবাপ্পের ভাই হওয়া কত কঠিন
ভাইয়ে ভাইয়ে মিল থাকাই স্বাভাবিক। সেটা শুধু চেহারা কিংবা শারীরিক গড়নে নয়; হয়তো কাজে-কর্মেও। ফুটবলার ভাইদের মধ্যে কেউ কেউ সে প্রত্যাশা পূরণ করতে পারেন, কেউ পারেন না। আসলে ফুটবলার ভাইদের সব পরিবারেই জীবনটা একরকম নয়।
বুঝিয়ে বলা যাক। দুই ভাই পেশাদার ফুটবলার—এমন উদাহরণ প্রচুর আছে। সেসবের মধ্যে কোনো ভাইয়েরা বিখ্যাত হয়ে উঠেছেন, কেউ আবার পারেননি। দেখা যায় দুই ভাইয়ের মধ্যে একজন তুমুল বিখ্যাত। কিন্তু অন্যজনকে চিনতে হয় তাঁর সেই বিখ্যাত ভাইয়ের নামে। যেমন ধরুন, ফুটবল নিয়ে আড্ডায়-আলোচনায় অনেকেই বলেন, ‘আরে জোবেকে চিনলি না! জুড বেলিংহামের ভাই।’
বিখ্যাত ভাইদের উদাহরণ দেওয়া যাক। ইংল্যান্ডে যেমন চার্লটন ভাইয়েরা। জার্মানিতে ইতিহাসে প্রথম ভ্রাতৃদ্বয় হিসেবে বিশ্বকাপ জেতা ফ্রিৎজ ওয়াল্টার ও ওটমার ওয়াল্টার। নেদারল্যান্ডসে রোনাল্ড ডি বোর ও ফ্রাঙ্ক ডি বোর। খুঁজলে এমন আরও পাওয়া যাবে। এমবাপ্পে ভাইয়েরা এখনো এই তালিকায় উঠে আসতে পারেননি। আপাতত তাঁদের একজন ‘ভিন গ্রহে’র, অন্যজন এই পৃথিবীরই রক্তমাংসের মানুষ।
কথাটা একটু মজা করে বলা। কারণ কিলিয়ান এমবাপ্পে অনেকের চোখেই ‘এক্সট্রাটেরেস্ট্রিয়াল।’ মানে অন্য কোনো গ্রহের হয়তো! সেটা তাঁর পারফরম্যান্স দেখে লোকে বলে। ২৭ বছর বয়সেই বিশ্বকাপ জিতেছেন, বিশ্বকাপে সর্বোচ্চ গোল ও ফ্রান্সের জার্সিতেও সেই রেকর্ডটাও তাঁরই। দলবদলের বাজারেও সবচেয়ে দামি খেলোয়াড়দের একজন।
ইথান এমবাপ্পের জ্বালাটা ঠিক এখানেই। বড় ভাই তাঁর বিশ্বসেরা না হলেও বিশ্বের সেরাদের একজন। কিন্তু তাঁকে পরিচিত হতে হয় সেই বড় ভাইয়ের নামে। ইথান নামে হয়তো তাঁর ঘনিষ্ঠজনের মধ্যে পরিচিতি আছে। কিন্তু বাংলাদেশের কোনো গলির চায়ের দোকানে ‘এমবাপ্পে’ নামটা বললে সবাই কিলিয়ানকেই ভেবে নেন। ‘ইথান’ নামটা বললে সঙ্গে জুড়তে হয় সংযুক্তি-‘এমবাপ্পের ছোট ভাই।’
চ্যাম্পিয়নস লিগে গতকাল রাতেও এই পার্থক্যটা টের পাওয়া গেল। সেটা অবশ্য টের পেলেন দর্শক। রিয়ালের হয়ে কিলিয়ান এমবাপ্পের গোল করার রাতে অনেকেই হয়তো ভুলে গিয়েছিলেন আরেক এমবাপ্পেও মাঠে নেমেছিলেন। আর ভাগ্যও কেমন রসিক—মাঠের পারফরম্যান্সে দুই ভাইয়ের পার্থক্যটা দর্শককে আর আলাদা করে ভেবে বের করতে হয়নি।
ইন্টার মিলানের বিপক্ষে এমবাপ্পে গোল করেছেন। যেমনটা তিনি করেন আরকি, নতুন কিছু না। ওদিকে লিঁল-রিয়াল বেতিস ম্যাচে ইথান গোল করানোর পর প্রতিপক্ষকে কনুই মেরে দেখেছেন লাল কার্ড। না, ইথানকে গড়পড়তা ফুটবলার ভাবলেও ভুল হবে। ১৯ বছর বয়সী লিঁলের এই মিডফিল্ডারের প্রতিভা এবং সম্ভাবনা দুটিই আছে। কিন্তু বর্তমান সময়ে তাঁর আট বছরের বড় ভাই ফুটবলের যে সিংহাসনে বসে, ইথান সেখান থেকে যোজন যোজন পিছিয়ে।
একটা উদাহরণ দেওয়া যায়। চ্যাম্পিয়নস লিগে ৯৭ গোলে অবদান এমবাপ্পে ভাইদের। এর মধ্যে কিলিয়ানের অবদান ৯৬ গোলে, ইথানের ১ গোলে। লাল কার্ড একটি। সেটা কার ‘অর্জন’, এখন না বললেও চলে।
পাল্টা বলতে পারেন, ইথানের এখনো বয়স বেশ কম। আগে কিলিয়ানের পর্যায়ে যাক, আরেকটু অভিজ্ঞ হোক, তখন না হয় তুলনাটা হোক। সে তো বটেই। তবে ইথানের বর্তমান বয়সে (১৯ বছর ২৫৪ দিন) এমবাপ্পে কেমন ছিলেন, সেটা জানা থাকলে ফারাকটা বোঝা যায়। এ বয়সে চ্যাম্পিয়নস লিগে ১০ গোল ও ৩টি অ্যাসিস্ট ছিল এমবাপ্পের। ফ্রান্সের হয়ে বিশ্বকাপও জেতা শেষ। তবে এ পরিসংখ্যানের ভেতরেও শুভংকরের একটি ফাঁকি আছে!
এমবাপ্পে ফরোয়ার্ড। গোল করাই তাঁর কাজ। ইথান মিডফিল্ডার। গোল করা তাঁর প্রধান কাজ নয়। ইথান কি মনে মনে এ যুক্তি দিয়ে নিজেকে প্রবোধ দেন? হতে পারে। তবে লোকে কি আর তা মানে বলুন। বেশির ভাগ দর্শকের কাছে গোলই শেষ কথা। গোলটা কে করছেন, আর গোল কে ঠেকাচ্ছেন—এর বাইরে সাধারণ দর্শক মাঝমাঠে কে কত ভালো খেলেন, সে বিষয়ে চুলচেরা বিশ্লেষণ কম করেন। হ্যাঁ, জিনেদিন জিদান কিংবা আন্দ্রেস ইনিয়েস্তাদের মতো মিডফিল্ডার হলে অন্য কথা। কিন্তু ইথান এখনো তেমন কেউ নন। বৈশ্বিক ফুটবল পাড়ায় ইথানকে এখনো এমবাপ্পের ভাই হিসেবেই পরিচয় করিয়ে দেওয়া হয়।
মাঠের বাইরে কিন্তু দুই ভাইয়ের দারুণ মিল। একেবারে হরিহর আত্মা। একটা উদাহরণ দেওয়া যায়। পিএসজির বয়সভিত্তিক প্রকল্প থেকে ইথানের উঠে আসা। ক্লাবটির মূল দলেও খেলেছেন। কিলিয়ানও তখন পিএসজিতে ছিলেন। ২০২৪ সালে কিলিয়ান পিএসজি ছাড়ার সিদ্ধান্ত নিলে ফরাসি ক্লাবটি তাঁর ভাইয়ের সঙ্গেও চুক্তির মেয়াদ বাড়ায়নি। এ নিয়ে ইথানের দুঃখের শেষ ছিল না। কারণ, কিলিয়ানের কাছে রিয়ালের আবেদন যতটা, ইথানের কাছে পিএসজিও ঠিক তা–ই।
পিএসজি ইথানের সঙ্গে চুক্তির মেয়াদ না বাড়ানোয় তখন কিলিয়ান একটি বৈপ্লবিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার দ্বারপ্রান্তে ছিলেন। বিবিসিকে গত বছর বলেছিলেন এ নিয়ে, ‘বিষয়টা আমাকে সবচেয়ে বেশি কষ্ট দিয়েছে। সে (ইথান) তো কিছুই চায়নি। আমার কাছে রিয়াল মাদ্রিদ যা, ইথানের জন্য পিএসজি ছিল ঠিক তা–ই—তাঁর শৈশবের স্বপ্ন। একপর্যায়ে আমি তো তাঁকে বলেই ফেলেছিলাম, তুমি চাইলে আমি (পিএসজির সঙ্গে) চুক্তি বাড়াব এবং তুমিও থাকতে পারবে, আমরা দুজন এখানেই থেকে যাব।’
তাতে ভাইয়ের রিয়ালে যাওয়ার স্বপ্নটা যে ঠেকে যাবে, ইথান তা বুঝতে পেরে আর রাজি হননি। কিলিয়ানের ভাষায়, ‘ইথান আমাকে বলল...আমি আর এখানে থাকতে চাই না। ওরা তোমার সঙ্গে আর আমার সঙ্গে যা করেছে, তা কোনোভাবেই স্বাভাবিক নয়। ও যদি আমাকে বলত, কিলিয়ান, আমি এখানেই থাকতে চাই, তবে আমি আমার রিয়ালের স্বপ্ন ত্যাগ করে ওর জন্যই থেকে যেতাম।’
কিন্তু তার কিছুই হয়নি। ২০২৪ সালে ঠিকানা পাল্টে গেল দুই ভাইয়ের। কিন্তু ইথানের জন্য পরিস্থিতিটা এখনো পাল্টায়নি। সম্ভবত ইথানকে এখনো কোথাও গিয়ে নিজের পরিচয়ে বলতে হয়, ‘আমি কিলিয়ান এমবাপ্পের ভাই।’
এভাবে বলার জ্বালাটা কেমন, সেটা ছোট ভাই মাত্রই জানেন!