রোনালদো ‘নিখোঁজ’, সেই সুযোগে কঙ্গোর ইতিহাস

পয়েন্ট ভাগাভাগির হতাশাটা রোনালদোদের চোখেমুখে স্পষ্টএএফপি

পর্তুগাল ১–১ ডিআর কঙ্গো

‘গোল করে পর্তুগাল ঘুমিয়ে পড়েছিল।’

কথাটা ফ্রান্সের সাবেক স্ট্রাইকার অলিভিয়ের জিরুর। হিউস্টনে প্রথমার্ধ শেষে বলেন বিবিসি ওয়ানকে। পর্তুগালের সেই ‘ঘুম’ বিরতির পর ভেঙেছে বটে, কিন্তু জয়টা আর পাওয়া হয়নি। প্রথমার্ধের যোগ করা সময়েই সমতাসূচক গোল পেয়ে যায় ৫২ বছর পর বিশ্বকাপে ফেরা ডিআর কঙ্গো—যখন পর্তুগালের আক্রমণভাগ প্রায় ‘ঘুমিয়ে’ ছিল আর বিরক্তিকর হয়ে উঠেছিল মাঝমাঠ।

আফ্রিকার দলটি সেই সুযোগেই করেছে বিশ্বকাপে নিজেদের প্রথম গোল। সেই গোলেই পর্তুগালকে গতকাল ১-১ গোলে আটকে দিয়ে চলতি বিশ্বকাপে ছোট দলগুলোর পক্ষ থেকে আরেকটি চমক উপহার দিল ডিআর কঙ্গো। শুধু তা–ই নয়, স্মরণীয় এ ড্রয়ে বিশ্বকাপে প্রথম পয়েন্টও পেল তারা।

অথচ এই ম্যাচ হতে পারত ক্রিস্টিয়ানো রোনালদোর। ইতিহাসের প্রথম খেলোয়াড় হিসেবে কানসাসে লিওনেল মেসি ৬ নম্বর বিশ্বকাপে খেলার ২৪ ঘণ্টারও কম সময়ের মধ্যে হিউস্টন স্টেডিয়ামে সেই রেকর্ডে ভাগ বসান রোনালদো। মাঠে অবশ্য চিরপ্রতিদ্বন্দ্বীর পারফরম্যান্সের ধারেকাছেও ছিলেন না; বরং বিশ্বকাপের ইতিহাসে দলীয় একাদশে সবচেয়ে বেশি বয়সী আউটফিল্ড খেলোয়াড়ের রেকর্ড গড়া রোনালদো অনেক সময়ই ছিলেন ‘দর্শক’ হয়ে।

ড্রয়ের পর ডিআর কঙ্গোর খেলোয়াড় ও কোচিং স্টাফরা আনন্দ ভাগ করে নেন
এএফপি

প্রথমার্ধে মাত্র ১৬ টাচ। এর মধ্যে প্রতিপক্ষের বক্সে একবার—অন্য ভাষায় রোনালদো যেন বোতলবন্দী দর্শক! বিরতির পরও নিজের ছায়া থেকে বেরোতে পারেননি তিনি।

আরও পড়ুন

কিন্তু ফিফা র‌্যাঙ্কিংয়ে ৩৬ ধাপ এগিয়ে থাকা ইউরোপিয়ান পরাশক্তির বিপক্ষে ‘মিনোজ’ ডিআর কঙ্গো ঠিকই পেরেছে। ছোট দলের ছায়া থেকে বেরিয়ে পর্তুগালের চোখে চোখ রেখে পয়েন্ট কেড়ে রীতিমতো ‘শক’ উপহার দিয়েছে বিশ্বকাপকে!

অথচ শুরুতে ম্যাচের হাল ছিল পর্তুগালের নিয়ন্ত্রণে। ৫ মিনিট ৩২ সেকেন্ডে মিডফিল্ডার জোয়াও নেভেস হেডে গোল করে এগিয়ে দেন সাবেক ইউরোপিয়ান চ্যাম্পিয়নদের। বাঁ প্রান্ত থেকে ফরোয়ার্ড পেদ্রো নেতোর ক্রসে নেভেস গোলটি করার পর অনেকে ভেবেছিলেন, র‌্যাঙ্কিংয়ে ৪৩তম কঙ্গোকে হয়তো গোলের বোঝা নিয়ে ফিরতে হবে। ভুল।

নেভেসের গোলের পর পর্তুগালের উদ্‌যাপন
এএফপি

তেমন কিছু দূরের ব্যাপার, নিউক্যাসল ফরোয়ার্ড ইওয়ান উইসা, ওয়েস্ট হাম ডিফেন্ডার অ্যারন ওয়ান-বিসাকাদের নিয়ে ডিআর কঙ্গো উল্টো চড়াও হয়ে খেলতে শুরু করে। যোগ করা সময়ে ৫ মিনিটে বাঁ প্রান্ত থেকে আসা ক্রসে মাথা ছুঁইয়ে উইসার সমতাসূচক গোলটি তারই ফল। ধারাভাষ্যকারের কণ্ঠে তখন আবেগ, ‘উই হ্যাভ হিস্টরি ইন হিউস্টন!’ ১৯৭৪ বিশ্বকাপে ৩ ম্যাচে ১৭ গোল খাওয়া ডিআর কঙ্গোর যে বিশ্বকাপে এটা প্রথম গোল! সেটাও পর্তুগালকে মাটিতে নামিয়ে এনে!

আরও পড়ুন

জিরুর কথাও অমূলক নয়। ভিতিনিয়া, ব্রুনো ফার্নান্দেজ, মেন্দেজ, নেভেসদের গড়া সময়ের অন্যতম সেরা পর্তুগিজ আক্রমণভাগের ‘ফলা’ রোনালদো। সেই আক্রমণভাগ প্রথমার্ধে শট নিতে পেরেছে মাত্র ২টি, পোস্টে ছিল ১টি! অবিশ্বাস্য ব্যাপার হলো, ডিআর কঙ্গো ৬টি শট নিয়ে পোস্টে রেখেছে ২টি।

সমতাসূচক গোলের পর ডিআর কঙ্গোর খেলোয়াড়দের উদ্‌যাপন
রয়টার্স

বিরতির পর গোল পেতে মরিয়া পর্তুগাল আক্রমণের ধার একটু বাড়াতে পেরেছে। কিন্তু এ সময় পাঁচটি শটের একটিও লক্ষ্যে ছিল না। পরের অর্ধে রক্ষণ জমাট করতে গিয়ে ডিআর কঙ্গোও সেভাবে আর পর্তুগালের বক্সে ঢুকতে পারেনি। পর্তুগালের ঘুম এ সময় ভাঙার আরেকটি কারণ সম্ভবত রোনালদো। বিরতির পর সতীর্থ ভিতিনিয়াকে সময় নিয়ে কিছু বলতে দেখা যায় রোনালদোকে। আগে পাঁচটি বিশ্বকাপ খেলে আসার অভিজ্ঞতা থেকে রোনালদো সম্ভবত এ অর্ধে ঘুরে দাঁড়ানোর প্রেরণা দিয়েছেন সতীর্থদের।

কিন্তু আক্রমণভাগের নেতা হয়ে রোনালদো নিজেই তো কিছু করতে পারেননি। গোটা ম্যাচে মাত্র ২৫ বার বল টাচ করতে পেরেছেন—যেটা তাঁর বিশ্বকাপ ক্যারিয়ারে অন্তত ৮০ মিনিট খেলা ম্যাচগুলোর মধ্যে সর্বনিম্ন। এতটা ‘ফ্লপ’ রোনালদোকে কোচ রবার্তো মার্তিনেজ কেন আগেভাগে তুলে নিলেন না, সেটাও একটা প্রশ্ন।