মায়ের ভয়ে লুকিয়ে ফুটবল খেলা মোরসালিনই আজ বাংলাদেশের নায়ক

বাংলাদেশের অনুশীলনে মোরসালিন আহমেদবাফুফে

সাফ চ্যাম্পিয়নশিপের জন্য ৩৫ জনের প্রাথমিক তালিকায় ছিলেন না। কয়েকজন খেলোয়াড়ের চোটের কারণে নাটকীয়ভাবে জায়গা পেয়েছেন ৩০ জনের দলে। টিকে যান ২৩ জনের চূড়ান্ত স্কোয়াডেও। মোরসালিন আহমেদকে সাফ চ্যাম্পিয়নশিপের দলে নিয়ে কোচ হাভিয়ের কাবরেরা যে ভুল করেননি, তা আজ প্রমাণ করেছেন ১৮ বছরের এই তরুণ।

মালদ্বীপের বিপক্ষে বাংলাদেশ যখন ২-১ ব্যবধানে জয়ের দিকে এগোচ্ছিল, এমন সময় ৯০তম মিনিটে মোরসালিন তৃতীয় গোল করে জয় হাতের মুঠোয় নিয়ে আসেন। বক্সে ঢুকে মালদ্বীপের এক ডিফেন্ডারকে কাটিয়ে মোরসালিনের প্লেসিংয়েই বোঝা গেছে, লম্বা সময় বাংলাদেশ দলে খেলার সামর্থ্য আছে তাঁর।

আরও পড়ুন

মোরসালিনের বাড়ি ফরিদপুরে। বাবা সৌদি আরব থাকেন ১৫-১৬ বছর ধরে, বর্তমানে দেশে। মা দেখাশোনা করতেন মোরসালিনকে। কিন্তু খেলাপাগল ছেলেটি শুরুর দিকে মায়ের সমর্থন পাননি। ছেলের এক জোড়া বুট দরকার ছিল, সেটি দেননি মা। ভালো ছাত্র হওয়ায় পঞ্চম শ্রেণিতে ট্যালেন্টপুলে পাওয়া বৃত্তির টাকায় বুট কিনেছিলেন মোরসালিন।

মালদ্বীপের বিপক্ষে গোলের পর মোরসালিনের উচ্ছ্বাস
বাফুফে

ছেলের খেলা টিভিতে দেখে মা শেফালি বেগম ফরিদপুরের বাড়ি থেকে আজ ফোনে প্রথম আলোকে বলছিলেন সেই গল্পই, ‘বুট ছাড়াই সে খেলত এলাকায়। ফরিদপুর গিয়ে খেলেছে মামার বুট নিয়ে। তারপরও আমি তাকে বুট কিনে দিইনি। বুট কিনেছে নিজের বৃত্তির টাকা দিয়ে। বুট কিনে বাসায় আনেনি। মা যদি রাগ করে! আমাকে ভয় পেত সে। পরে আমি জানতে পারি বিষয়টা। আজ ওর জন্য আমি গর্বিত। মোরসালিনকে এখন আর টাকা দিতে হয় না আমার। বরং সে আমাদের কিছু টাকা দিয়েছে। যা দিয়েছে হাজার শুকুর।’

আরও পড়ুন

শেফালি বেগমের দুই ছেলের মধ্যে মোরসালিন বড়। মায়ের আশা ছিল ছেলে ভালোভাবে লেখাপড়া করবে। কিন্তু ছেলে খেলাধুলায় মগ্ন থাকত বেশি। মাকে অনুরোধ করত খেলতে দিতে। মা দিতে চাইতেন না। ‘পরে প্রাইভেট স্যারের কাছে সে অনুরোধ করে, আমি যাতে খেলতে দিই। প্রাইভেট স্যার আমাকে অনুরোধ করে। শেষে আমি অনুমিত দিই খেলতে। বিকেএসপিতে ভর্তি হয় মোরসালিন। তারপর সে সামনের দিকে এগিয়ে যায়। এ বছরই সে বিকেএসপি থেকে বেরিয়েছে। শুধু খেলায় ভালো নয়, ছেলের ভদ্রতা, নম্রতা দেখে স্যাররা ওকে দোয়া করে। আজ যখন গোল করল, আমার খুব ভালো লেগেছে। আমি চাই, সে আরও গোল করুক’—প্রথম আলোকে বলেন আবেগাপ্লুত শেফালি বেগম।

অনেক দিন পর দেখলাম এমন কাউকে, ও পরিপূর্ণ মিডফিল্ডার। ওর খেলার ধরন খুব ভালো লেগেছে। গোলটা যখন করেছে, ওখানে ওর থাকার কথা নয়। কিন্তু মোরসালিন ছিল। একজন অ্যাটাকিং মিডফিল্ডারের এটাই বড় গুণ হওয়া উচিত যে জায়গামতো চলে যাওয়া
জাহিদ হাসান এমিলি


মোরসালিনকে অনূর্ধ্ব-১৮ ক্লাব ফুটবলের জন্য এনেছিল কিংস। কিছুদিনের মধ্যে এই তরুণ নিজেকে চেনান। কিন্তু কিংসের মূল দলে তারকার ভিড়ে জায়গা পাচ্ছিলেন না। গত প্রিমিয়ার লিগের প্রথম পর্বে বেঞ্চে কাটানো মোরসালিনকে দ্বিতীয় পর্বে ধারে মোহামেডানে খেলতে দেয় কিংস। খেলার সুযোগ পেয়ে গত লিগের দ্বিতীয় পর্বে কিংসের বিপক্ষেই দূরপাল্লার এক শটে গোল করে বসেন মোরসালিন। সেই গোলেই কিংসকে ১-১ গোলে রুখে দেয় মোহামেডান। এই গোলের পরই মোরসালিন আলোচনায় চলে আসেন।

মোরসালিনকে নিয়ে সতীর্থদের উদযাপন
বাফুফে


মোরসালিনে মুগ্ধ মোহামেডানের পরিচালক আবু হাসান চৌধুরী আজ প্রথম আলোকে বলেছেন, ‘মোহামেডানে ওকে কাছ থেকে দেখেছি, খুবই প্রতিভাবান খেলোয়াড়। মাঝমাঠ থেকে দুদিকেই সমানভাবে বল দিতে পারে। মোরসালিন একদিন বাংলাদেশের ফুটবলে বড় তারকা হবে। তার মধ্যে প্রতিভা আছে।’


একই কথা বলেছেন কিংসের টেকনিক্যাল ডাইরেক্টর বায়েজিদ আলমও। এবারের মৌসুমে কিংসে জার্সিতে খেলছেন মোরসালিন। তাঁর দল হয়েছে প্রিমিয়ার লিগে হ্যাটট্রিক চ্যাম্পিয়ন। কিংসের সর্বশেষ দুটি ম্যাচে একাদশে খেলেন মোরসালিন, তাতেই চোখ কাড়েন কোচ কাবরেরার। ১৫ জুন কম্বোডিয়ার বিপক্ষে ফিফা প্রীতি ম্যাচে তাঁর অভিষেক হয়েছে জাতীয় দলে। বেঙ্গালুরুতে সাফ চ্যাম্পিয়নশিপের প্রথম ম্যাচে লেবাননের সঙ্গেও ছিলেন একাদশে। সেদিন ফয়সাল আহমেদ যে গোলটি নষ্ট করেছেন, বল দিয়েছিলেন মোরসালিনই।

মোরসালিনের গোলের আনন্দ
বাফুফে


আজ ৬৩ মিনিটে নেমে শেষ বাঁশির আগে গোল করে জাতীয় দলে নিজের গুরুত্ব আরেকটু প্রতিষ্ঠা করেছেন এই তরুণ। তাঁকে নিয়ে জাতীয় দলের সাবেক স্ট্রাইকার জাহিদ হাসান এমিলি খুবই আশাবাদী, ‘ও দারুণ এক খেলোয়াড়। আক্রমণাত্মক মিডফিল্ডার হিসেবে ওর সবচেয়ে ভালো গুণ, ও বল নিয়ে সামনে যায়। যেটা অন্যরা করে না। ও গোল করতে পারে, করাতেও পারে। অনেক মিডফিল্ডারের সঙ্গে খেলেছি আমি। অনেক দিন পর দেখলাম এমন কাউকে, ও পরিপূর্ণ মিডফিল্ডার। ওর খেলার ধরন খুব ভালো লেগেছে। গোলটা যখন করেছে, ওখানে ওর থাকার কথা নয়। কিন্তু মোরসালিন ছিল। একজন অ্যাটাকিং মিডফিল্ডারের এটাই বড় গুণ হওয়া উচিত যে জায়গামতো চলে যাওয়া।’

আরও পড়ুন


মোরসালিনের মধ্যে বড় সম্ভাবনা দেখছেন কোচ মারুফুল হকও, ‘সে প্রতিভাবান। ফুটবলীয় মেধা ভালো। চাইব, সে যাতে লম্বা সময় টিকে থাকে।’
এটাই চাওয়া দেশের গোটা ফুটবল অঙ্গনের।