আর মাত্র কয়েক ঘণ্টার অপেক্ষা। গোয়ার ফাতোর্দার জওহরলাল নেহরু স্টেডিয়ামের বাতাসে এখন ফুটবল–গন্ধ। আরব সাগরের তীরে আজ মুখোমুখি দুই প্রতিবেশী বাংলাদেশ ও ভারত। আজ রাত আটটায় অষ্টম সাফ নারী চ্যাম্পিয়নশিপে যখন দুই পরাশক্তি মাঠের লড়াইয়ে নামবে, তখন গোয়ার গ্যালারি সাক্ষী হতে যাচ্ছে এক নতুন ইতিহাসের।
একসময় সাফের মাঠে ভারতের একচেটিয়া আধিপত্য থাকলেও গত কয়েক বছরে বাংলাদেশ নিজেদের প্রমাণ করেছে দক্ষিণ এশিয়ার নতুন ফুটবল রানী হিসেবে। আসুন, আজ মাঠের যুদ্ধ শুরু হওয়ার আগে দেখে নেওয়া যাক দুই দলের লড়াইয়ের খতিয়ান আর ফেলে আসা ম্যাচগুলোর রোমাঞ্চকর গল্প।
সাফ নারী চ্যাম্পিয়নশিপে এ পর্যন্ত দুই দল ৭ বার মুখোমুখি হয়েছে। সাফের সামগ্রিক পরিসংখ্যানে ভারত এগিয়ে থাকলেও সাম্প্রতিক ইতিহাস বলছে ভিন্ন কথা।
মোট ম্যাচ: ৭টি
ভারতের জয়: ৪টি
বাংলাদেশের জয়: ২টি
ড্র: ১টি
ভারতের করা মোট গোল: ১৯টি
বাংলাদেশের করা মোট গোল: ৭টি
স্মৃতির পাতা থেকে সেই ৭ ম্যাচের মহাকাব্য
২০১০: কক্সবাজারের সেই দুঃসহ বিকেল
২০১০ সালের ১৭ ডিসেম্বরের বিকেলটার কথা সাবিনা খাতুনেরা কখনো ভুলতে পারবেন না। কক্সবাজার স্টেডিয়ামে ঘরের মাঠের দর্শকদের সামনে ভারতের কাছে ০–৬ গোলে হেরে মাঠ ছাড়তে হয়েছিল। সেই ম্যাচে হ্যাটট্রিক করেন ভারতের ইয়ামনাম কমলা দেবী। ভারতের ফুটবলারদের গতি, নিখুঁত পাস আর পেশাদারত্বের সামনে তখন বাংলাদেশের মেয়েরা ছিলেন একেবারেই অনভিজ্ঞ। সেটিই ছিল বাংলাদেশের মেয়েদের প্রথম আন্তর্জাতিক ম্যাচ। ম্যাচ শেষে ড্রেসিংরুমে বসে সতীর্থদের চোখের জল দেখে তরুণ সাবিনা মনে মনে প্রতিজ্ঞা করেছিলেন, ‘একদিন এই ছবিটা আমি বদলে দেব।’
২০১২: প্রথমার্ধের লড়াই, দ্বিতীয়ার্ধে বিপর্যয়
কলম্বোর মাটিতে সেবার লড়াইটা হয়েছিল দারুণ। শক্তিশালী ভারতকে প্রথমার্ধে আটকে রেখেছিলেন বাংলাদেশের মেয়েরা। কিন্তু দ্বিতীয়ার্ধে আর পেরে ওঠেননি। ৬৪ থেকে ৮৯ মিনিটের মধ্যে তিন গোল করে ম্যাচ ছিনিয়ে নেয় ভারত। কমলা দেবী (৬৪ মিনিট), বেমবেম দেবী (৭৬) আর আলোচনা সেনাপতির (৮৯ মিনিট) গোলে ৩–০ ব্যবধানে হারে বাংলাদেশ।
২০১৪: ইসলামাবাদে বড় হার
ইসলামাবাদের মাটিতে ১৫ নভেম্বর ৫–১ ব্যবধানে হারতে হয় বাংলাদেশকে। ভারতের ‘বালা দেবী’ বা ‘ইন্দুমাথি’দের নাম শুনলেই তখন একধরনের মনস্তাত্ত্বিক চাপ তৈরি হতো দলে। কিন্তু পর্দার আড়ালে বাফুফে ভবনের ক্যাম্পে চলছিল অন্য এক বিপ্লব। ম্যাচের গোল টাইমলাইন ছিল এমন: ৪৬ মিনিটে উমাপতি দেবীর গোলে ভারত ১–০ তে এগিয়ে যায়। ৪৮ মিনিটে মন্দাকিনী দেবীর গোলে ২–০। ৫০ মিনিটে সাবিনা খাতুনের গোলে ব্যবধান কমে ২–১। ৫৭ মিনিটে পেনাল্টি থেকে গোল করে ভারতকে ৩–১ এ এগিয়ে নেন বালা দেবী। ৭৬ মিনিটে ইন্দুমাথি কাথিরেসানের গোলে স্কোরলাইন ৪–১। ৮৬ মিনিটে বালা দেবী নিজের দ্বিতীয় গোল করলে ভারত ৫–১ ব্যবধানে জয়ী।
২০১৬: শিলিগুড়ির সেই ঐতিহাসিক দেয়াল
ভারতের একচেটিয়া জয়ের রথ প্রথমবার থমকে গিয়েছিল ২০১৬ সালের ৩১ ডিসেম্বরের বিকেলে। শিলিগুড়ির কাঞ্চনজঙ্ঘা স্টেডিয়ামে গ্যালারি ভরা ১০ হাজারের বেশি ভারতীয় সমর্থকের সামনে মাঠে নেমেছিল বাংলাদেশ। সবাই ভেবেছিলেন, ভারত বরাবরের মতোই সহজে জিতবে। কিন্তু সেদিন সাবিনাদের লড়াকু মানসিকতা আর রক্ষণভাগের ইস্পাতকঠিন দেয়াল ভারতের সব আক্রমণকে ব্যর্থ করে দেয়। পুরো ৯০ মিনিট আক্রমণ, প্রতি–আক্রমণে ম্যাচ জমলেও কোনো দলই গোল করতে পারেনি। ০–০ গোলে ম্যাচটি ড্র হয়। ভারতের মাটিতে ভারতকে রুখে দেওয়ার এই ম্যাচই ছিল বাংলাদেশের মেয়েদের মনে প্রথম এই বিশ্বাস এনে দেওয়া যে, ‘আমরাও ভারতকে থামাতে পারি!’
২০১৯: সেমিফাইনালের ধাক্কা
নেপালের মাটিতে সেমিফাইনালে ৪–০ গোলে হেরে আবার একটু ধাক্কা খেতে হয়েছিল বাংলাদেশকে, কিন্তু মেয়েদের জেদ তাতে কমেনি। ম্যাচের টাইমলাইন: ১৮ মিনিটে ডালিমা গোল করে ভারতকে ১–০ তে এগিয়ে নেন। ২২ মিনিটে ইন্দুমাথি করেন ২–০। ৩৭ মিনিটে ইন্দুমাথি নিজের দ্বিতীয় গোলে স্কোর করেন ৩–০। ৯০+৩ মিনিটে মনীষা গোল করলে ৪–০ ব্যবধানে জয় পায় ভারত।
২০২২: কাঠমান্ডুর দশরথ রঙ্গশালায় ইতিহাস
গ্রুপ পর্বের ম্যাচ। গ্যালারিতে নেপালি দর্শকের শোরগোল। মাঠে নামার আগে কোচ গোলাম রব্বানি ছোটন মেয়েদের দিকে তাকিয়ে শুধু একটা কথাই বলেছিলেন, ‘ওরা মানুষ, কোনো ভিনগ্রহের প্রাণী নয়। তোমরা নিজেদের সেরাটা খেলো।’
ম্যাচ শুরু হতেই দেখা গেল এক অন্য বাংলাদেশকে। ভারতের রক্ষণভাগকে নাচিয়ে মাত্র ১২ মিনিটে গোল করে বসলেন সিরাত জাহান স্বপ্না। ভারত ধাক্কা সামলে ওঠার আগেই ২২ মিনিটে কৃষ্ণা রানী সরকার বল জড়িয়ে দিলেন জালে (২–০)। দ্বিতীয়ার্ধে ভারত মরিয়া হয়ে আক্রমণ করলেও বাংলাদেশের ডিফেন্ডাররা প্রাচীর হয়ে দাঁড়িয়ে ছিলেন। ৫২ মিনিটে স্বপ্না যখন নিজের দ্বিতীয় গোলটি করলেন, তখন ভারতের ডাগআউটে নীরবতা। ৩–০ গোলের ঐতিহাসিক জয়! দীর্ঘ ১২ বছরের ক্ষত আর ভারতের বিপক্ষে প্রথম জয়ের স্বাদে কেঁদে ফেলেছিলেন সাবিনারা।
২০২৪: শ্রেষ্ঠত্ব ধরে রাখার ‘তহুরা ম্যাজিক’
প্রথম জয়কে অনেকেই ‘ভাগ্য’ বলে উড়িয়ে দিতে চেয়েছিলেন। তাই ২০২৪ সালের ২৩ অক্টোবর মাঠকান্ডুর দশরথ স্টেডিয়ামে ম্যাচটি ছিল বাংলাদেশের মেয়েদের জন্য নিজেদের প্রমাণ করার সবচেয়ে বড় পরীক্ষা। ভারত চেয়েছিল প্রতিশোধ নিতে, আর বাংলাদেশের লক্ষ্য ছিল আধিপত্য ধরে রাখা।
ম্যাচের ১৯ মিনিটে ডিফেন্ডার আফঈদা খন্দকার (১–০) করলেন। এরপর শুরু হলো ‘তহুরা ম্যাজিক’। ২৯ মিনিটে বল জালে জড়ালেন তহুরা খাতুন (২–০)। ৪২ মিনিটে বক্সের বাইরে থেকে এক চোখধাঁধানো দূরপাল্লার শটে তহুরা ভারতের গোলরক্ষককে পরাস্ত করে নিজের দ্বিতীয় গোলটি করলেন (৩–০)। যদিও ৪৩ মিনিটে ভারতের কিংবদন্তি স্ট্রাইকার বালা দেবী একটি গোল শোধ করেছিলেন, কিন্তু দ্বিতীয়ার্ধে বাংলাদেশের নিখুঁত রক্ষণের সামনে ভারতের সব আক্রমণ ভেস্তে যায়। ৩–১ গোলের এই জয় প্রমাণ করে দিল, ২০২২ সালের জয় কোনো দুর্ঘটনা ছিল না।
আজ গোয়ার মঞ্চে নতুন দিন, নতুন স্বপ্ন
২০১০ সালের সেই শূন্য হাতে ফেরা মেয়েরা আজ ২০২৪ পার হয়ে ২০২৬ সালে এসেও দেশের নারী ফুটবলকে এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছেন। আজ গোয়ার জওহরলাল নেহরু স্টেডিয়ামের ফ্লাডলাইটের নিচে রাত আটটায় যখন লাল-সবুজের মেয়েরা মাঠে নামবেন, তখন তাঁদের চোখে আর কোনো ভয় বা মনস্তাত্ত্বিক চাপ থাকবে না। আজ তাঁদের চোখে সমানে সমানে লড়াই করে দক্ষিণ এশিয়ার শ্রেষ্ঠত্ব ধরে রাখার আত্মবিশ্বাস। আরব সাগরের তীরে আজ বাংলাদেশের মেয়েরা আরেকটি রূপকথা লিখবেন। এমনটাই প্রত্যাশা কোটি ফুটবল–ভক্তের।