ফাইনালে কে জিতবে? আমার ফেবারিট আর্জেন্টিনা। মাঠের কৌশল, খেলোয়াড়দের ব্যক্তিগত নৈপুণ্য আর সবকিছুর ঊর্ধ্বে তাদের ইস্পাতকঠিন মানসিকতা এককথায় অসাধারণ।
আর্জেন্টিনার সবচেয়ে বড় শক্তি তাদের মানসিক দৃঢ়তা। দলটি এখন জানে, কীভাবে ম্যাচ বের করে আনতে হয়। নকআউটে দুটি ম্যাচে ৮৫ মিনিটের পর গোল করে জিতেছে আর্জেন্টিনা। এই যে শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত লড়াই করে জয় ছিনিয়ে আনার ক্ষমতা, এটা তখনই সম্ভব হয়, যখন একটা দলের আত্মবিশ্বাস তুঙ্গে থাকে।
স্পেন হয়তো বল পজেশন ধরে রেখে ভালো খেলে, ফ্রান্সের বিপক্ষে দারুণ খেলেছে। কিন্তু আর্জেন্টিনা এই টুর্নামেন্টে এমন এক কঠিন পথ পাড়ি দিয়ে এসেছে, যা তাদের মানসিকতার বড় পরীক্ষা নিয়েছে। যে পরীক্ষা স্পেনকে দিতে হয়নি।
আর্জেন্টিনার ‘উইং প্লে’ প্রতিপক্ষের জন্য রীতিমতো আতঙ্ক। সেমিফাইনালে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে দেখেছি, লিওনেল মেসি একদম টাচলাইনের কাছ থেকে খেলা ছড়িয়ে দিয়েছে, যা ইংল্যান্ড ডিফেন্ডারদের দ্বিধায় ফেলেছে। মেসি বাঁ পায়ে বেশি খেলে, কিন্তু সেদিন ডান পায়ের ঝলকও দেখায়।
মেসিদের বিপক্ষে ডিফেন্ডাররা যখন বল জিততে চ্যালেঞ্জ করতে যায়, তখন মাঝমাঠে ফাঁকা জায়গা তৈরি হয়। আবার না গেলে উইং দিয়ে বল নিয়ে বক্সে ঢুকে পড়ার সুযোগ থাকে। এই উইং প্লের কারণে অনেক সময় গোলকিপাররা বিভ্রান্ত হয়।
আর্জেন্টিনা যেভাবে ইংল্যান্ডকে তাদের ডি-বক্সে চেপে ধরেছিল, তাতেই ফুটে ওঠে দলটির শক্তি। সেদিন গোল খেয়ে যে নিজেদের যেভাবে মেলে ধরেছে আর্জেন্টিনা, প্রতিপক্ষের চেয়ে তিন গুণ বেশি তারা বক্সের আশপাশে পাস খেলেছে।
স্পেনের মাঝমাঠ বেশ শক্তিশালী। কিন্তু আর্জেন্টিনার মাঝমাঠও বেশ কার্যকর। ম্যাক আলিস্টাররা আচমকা রক্ষণচেরা পাস দিয়ে গোলের সুযোগ তৈরি করছে। আবার কখনো নিচ থেকে লম্বা বল সরাসরি উইঙ্গারদের পায়ে পাঠিয়ে মুহূর্তের মধ্যে প্রতিপক্ষের রক্ষণ ভেঙে দিচ্ছে। প্রতিপক্ষকে রক্ষণের একদম গভীরে ঠেলে দেওয়ার সামর্থ্যও এই আর্জেন্টিনার বড় শক্তি।
আর্জেন্টিনা দলে একজন ‘ম্যাজিশিয়ান’ তো আছেই, যেকোনো মুহূর্তে যে ম্যাচের মোড় ঘুরিয়ে দিতে পারে। এ ছাড়া লাওতারো মার্তিনেজের মতো ফিনিশাররা এখন দারুণ ফর্মে। ইংল্যান্ডের মতো দলের লম্বা ডিফেন্ডারদের মাঝখান থেকেও মার্তিনেজ যেভাবে হেডে জয়সূচক গোল করে দলকে ফাইনালে তুলেছে, তা দলের আক্রমণভাগের ধারই প্রমাণ করে।
আর্জেন্টিনার রক্ষণে ক্রিস্টিয়ান রোমেরো গত ম্যাচে হয়তো কিছুটা অমনোযোগী ছিল, যে কারণে গর্ডন গোল করেছিল। কিন্তু সামগ্রিকভাবে তাদের রক্ষণে বড় কোনো ফাঁক নেই।
প্রতিপক্ষ আর্জেন্টিনার বিপক্ষে যে গোলগুলো পেয়েছে, সেগুলো মূলত ব্যক্তিগত পর্যায়ের অসাধারণ সব গোল ছিল। রক্ষণের বড় কোনো ভুলে গোল খাওয়ার রেকর্ড আর্জেন্টিনার কম; বরং আর্জেন্টিনার হাই প্রেসিং ফুটবল প্রতিপক্ষের ডিফেন্ডার ও গোলকিপারদের ভুল করতে বাধ্য করে বেশি।
যেখানে স্পেন গ্রুপে প্রথম ম্যাচে কেপ ভার্দের সঙ্গে ড্র করেছে, সেখানে আর্জেন্টিনা গ্রুপ পর্বের সব কটি ম্যাচ জিতে নকআউটে এসেছে। এই ধারাবাহিক জয় খেলোয়াড়দের মনে জয়ের মানসিকতা তৈরি করে দেয়, যা ফাইনালে বড় ভূমিকা রাখবে আমার বিশ্বাস। তা ছাড়া আর্জেন্টিনা বর্তমান কোপা আমেরিকা চ্যাম্পিয়ন এবং বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন হিসেবে নিজেদের শ্রেষ্ঠত্ব বারবার প্রমাণ করেছে।
সব মিলিয়ে স্পেনের বল ধরে খেলা বা টেকনিক্যালি অনেক দিক ভালো হলেও মানসিক শক্তি এবং পিছিয়ে পড়েও জয় ছিনিয়ে নেওয়ার যে ক্ষমতা আর্জেন্টিনা দেখিয়ে এসেছে নকআউট পর্বে, তাতে ফাইনালে তারাই এগিয়ে থাকবে। শেষ পর্যন্ত কী হবে, তা তো শেষ বাঁশির আগে বলা কঠিন। কিন্তু আমার মনে হয়, মেসি আবারও বিশ্বকাপ হাতে তুলতে যাচ্ছে।
লেখক: সাবেক ফুটবলার ও কোচ