বিশ্বকাপে কালই হয়তো মদরিচকে শেষবার দেখব

ফুটবল মাঠে দুই কিংবদন্তি মুখোমুখি হলে আবেগ আর রোমাঞ্চ দুটিই যেন সমান্তরালে চলে। পর্তুগাল আর ক্রোয়েশিয়ার বিশ্বকাপের শেষ ৩২-এর ম্যাচটিও তেমনই এক উপলক্ষ। তবে বাংলাদেশ সময় আগামীকাল ভোর ৫টায় শুরু হতে যাওয়া এই ম্যাচ আমার কাছে একটু অন্য রকম মনে হচ্ছে।

কারণ, এটি শুধুই দুই দলের বিশ্বকাপের শেষ ষোলোয় ওঠার ম্যাচ নয়, ফুটবলের দুই উজ্জ্বল নক্ষত্রের একজনের বিদায় মঞ্চও হতে যাচ্ছে। একদিকে ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো, অন্যদিকে লুকা মদরিচ। একজনের বয়স ৪১, অন্যজনের ৪০। ম্যাচ শেষে বিশ্বকাপ থেকে একজনকে দুঃখজনকভাবে আমাদের বিদায় জানাতেই হবে।

কিন্তু কে বিদায় নেবে? এই প্রশ্নের নিশ্চিত কোনো উত্তর আমার কাছে নেই। তবে যদি দল হিসেবে বিবেচনা করি, তাহলে আমি পর্তুগালকেই এগিয়ে রাখব। বর্তমানে পর্তুগাল বিশ্বের অন্যতম সেরা ও ভারসাম্যপূর্ণ একটি দল, যাদের আক্রমণভাগ থেকে মাঝমাঠ, সব জায়গাতেই দুর্দান্ত সব খেলোয়াড় আছে। অন্যদিকে ২০১৮ বিশ্বকাপের রানার্সআপ ক্রোয়েশিয়া তাদের সেই সেরা সময়টা পার করে এসেছে। আগের সেই বিধ্বংসী রূপটা আর তেমন দেখা যাচ্ছে না।

এর অনেক কারণ। ক্রোয়েশিয়ায় দলগত শক্তিই আসলে কমে গেছে। তবে মিডফিল্ডার মদরিচকে আমি এখনো বিশ্বের অন্যতম সেরাদের কাতারে রাখি। কিন্তু পর্তুগালের বর্তমান শক্তির কথা চিন্তা করলে মনে হচ্ছে, হয়তো এই ম্যাচটিই মদরিচের বিশ্বকাপের মঞ্চে শেষ ম্যাচ হতে পারে। আমার মনে হচ্ছে, রোনালদো এই ম্যাচটা পার হয়ে যাবেন। তবে শেষ পর্যন্ত যিনিই বিদায় নিন না কেন, বিশ্বকাপ একজন অসাধারণ খেলোয়াড়কে হারাতে যাচ্ছে নিশ্চিত।

মদরিচ ও রোনালদো
এক্স

রিয়াল মাদ্রিদে একটা সময় রোনালদো ও মদরিচ ছিলেন একে অন্যের পরিপূরক। ২০১২ থেকে ২০১৮ পর্যন্ত তাঁরা একসঙ্গে দাপটের সঙ্গে খেলেছেন এই দলে। মদরিচের নিখুঁত সব পাস থেকে রোনালদো অনেক গোল করেছেন। গুগল করে দেখলাম মদরিচের অ্যাসিস্টে রোনালদো গোল করেছেন ১৪টি। এ–ও জানলাম, তাঁরা রিয়ালে একসঙ্গে ম্যাচ খেলেছেন ২২২টি।

যেহেতু তাঁরা দীর্ঘ সময় একই ড্রেসিংরুম শেয়ার করেছেন, একে অন্যকে খুব কাছ থেকে দেখেছেন, তাই দুজন দুজনের শক্তি এবং দুর্বলতা সম্পর্কে খুব ভালোভাবেই জানেন। রোনালদোকে কীভাবে পাহারায় রাখতে হবে, তা যেমন মদরিচের জানা, তেমনি মদরিচকে আটকানোর কৌশলও রোনালদোর অজানা নয়।

আরও পড়ুন

একজন মিডফিল্ডার হিসেবে আমি যখন মদরিচকে দেখি, মুগ্ধ না হয়ে পারি না। ২০১৮ সালের বিশ্বকাপে তিনি গোল্ডেন বল জিতেছিলেন। একজন মিডফিল্ডারের পক্ষে গোল্ডেন বল জেতা মানে মাঠে তিনি কতটা প্রভাব রেখেছিলেন, তা বোধ হয় না বললেও চলছে। তবে বাস্তবতাকে আমাদের মেনে নিতেই হবে। ২০১৮ সালের সেই মদরিচ ২০২২ সালেও ছিলেন উজ্জ্বল। কিন্তু এখন আর পুরোনো সেই মদরিচকে খুঁজে পাওয়া যাবে না স্বাভাবিক। এই বয়সে তিনি ক্রোয়েশিয়াকে যা দিচ্ছেন সেটাই বোনাস।

ঘানার বিপক্ষে গ্রুপের শেষ ম্যাচে পুরো ৯০ মিনিট ছিলেন মাঠে এবং একটি অসাধারণ অ্যাসিস্ট করেছেন। ইংল্যান্ডের বিপক্ষে প্রথম ম্যাচে ৫৮ মিনিটে তাঁকে তুলে নেওয়া হয়। দ্বিতীয় ম্যাচে পানামার বিপক্ষে ৮১ মিনিট খেলেছেন। যদিও মাঠে এখন আর আগের মতো দাপট নিয়ে পুরো সময় খেলা তাঁর পক্ষে সম্ভব হচ্ছে না, কিন্তু মদরিচের মান নিয়ে কোনো প্রশ্ন নেই। এখনো তিনি ক্রোয়েশিয়া দলের প্রধান চালিকা শক্তি।

সেরা ছন্দে নেই লুকা মদরিচ
ইনস্টাগ্রাম/ক্রোয়েশিয়া ফুটবল টিম

এখনো তাঁর বল নিয়ন্ত্রণ, কখন গতি কমাতে হবে বা বাড়াতে হবে, তা বুঝতে পারেন। মাঝমাঠে একজন সত্যিকারের নেতা হয়ে খেলাটা নিখুঁতভাবে পরিচালনা করার ক্ষমতা মদরিচের বিশেষ গুণ।

সেরা সময়ের মদরিচকে প্রতিপক্ষের খেলোয়াড়েরা ঘিরে ধরলেও বল হারাতেন না, দারুণ ড্রিবলিংয়ে ঠিকই বেরিয়ে যেতেন। আক্রমণ এবং রক্ষণ দুই জায়গাতেই সমান অবদান রাখতে পারতেন। তাঁর খেলার মূল কৌশল, খালি জায়গা তৈরি করতে পারা। শারীরিক শক্তির চেয়ে বুদ্ধি আর পজিশনিংয়ের জ্ঞান তাঁকে অন্যদের চেয়ে আলাদা করেছে। তবে এখন এসবে কিছুটা ভাটার টান দেখছি বয়সের কারণেই।

লেখক: জাতীয় ফুটবল দলের সাবেক অধিনায়ক