দাঁড়িয়ে থাকা এক মানুষ, জেগে ওঠা দেশপ্রেম: কঙ্গোর ‘লুমুম্বা’ মিশেলের কাহিনি

কঙ্গোর ম্যাচে গ্যালারিতে দাঁড়িয়ে মিশেল কুকা এমবোলাডিঙ্গা। আফ্রিকা কাপ অব নেশনসে তিনি এখন আলোচিত এক চরিত্রএএফপি

গ্যালারিতে তাঁর আশপাশে থাকা সব দর্শক বসে আছেন। কিন্তু লোকটি স্থির ভাস্কর্যের মতো দাঁড়িয়ে। পায়ের তলায় বেদির মতো কিছু একটা। স্টেডিয়ামের যেকোনো জায়গা থেকেই তাই তাঁকে চোখে পড়ে আলাদা করে। যেন অবিকল মানুষের একটা উঁচু ভাস্কর্য।

রাজনৈতিক নেতারা যেভাবে জনতাকে ভরসা দেওয়ার ভঙ্গিতে হাতটা একটু উঁচু করে সামনে বাড়িয়ে দেন—লোকটিও তাই। সামনে বাড়িয়ে দেওয়া তাঁর হাতটা নিশ্চল। একদম পাথরের মতো স্থির শরীরে মুখখানি যেন আরও বেশি ভাবলেশহীন। চশমার ভেতরে আত্মগোপন করা চোখের দৃষ্টি মাঠ, মাঠের খেলা কিংবা মাঠ পেরিয়ে ওপারের গ্যালারি ছাড়িয়ে কত দূরে গিয়ে ঠেকেছে, তা বোঝা কালিদাসের ধাঁধার মতোই জটিল।

লোকটি স্যুট পরে মাঠে আসেন। ধোপদুরস্ত পোশাকের সঙ্গে মানানসই কালো জুতা। বর্ণিল ও বাহারি রঙের পোশাক আফ্রিকানদের খুব পছন্দ। লোকটির স্যুটের রং তাই কোনো দিন একদম কাঁঠালপাকা হলুদ, কোনো দিন আবার আকাশের মতো নীল। প্যান্টের রঙের সঙ্গে মিল রেখে বুকপকেট থেকে উঁকি দেওয়া রুমাল। মাঠে খেলার উত্তেজনায় ‘কেয়ামত’ ঘটে গেলেও লোকটি পলকা বাতাসে ঘাসের নড়ে ওঠার মতোও এতটুকু নড়াচড়া নেই! ম্যাচের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত একই ভঙ্গিতে একদম নিশ্চল, নিথর ভাস্কর্যের মতো দাঁড়িয়ে।

আফ্রিকা কাপ নেশনসে নজর থাকলে এই মানুষটাকে আপনার চোখে পড়ার কথা। কিংবা যদি কখনো গণপ্রজাতন্ত্রী কঙ্গোয় যাওয়া হয়ে থাকে, তাহলে এ মানুষটার ওভাবে দাঁড়ানো দেখে দেশটির রাজধানী কিনশাসায় একটি ভাস্কর্যও আপনার মনে পড়তে পারে।

ইন্টারনেটের এই যুগে অবশ্য কোথাও না গেলেও চলে। গুগল করে অনেকেই এতক্ষণে হয়তো মিলটা ধরে ফেলেছেন। মহাদেশীয় এই প্রতিযোগিতায় কঙ্গোর ম্যাচে গ্যালারিতে যে মানুষটি ওভাবে নিথর, নিশ্চল ভাস্কর্য হয়ে ম্যাচের পুরো সময় দাঁড়িয়ে থাকেন—সেটা আসলে কঙ্গোর স্বাধীনতার নায়ক প্যাট্রিস লুমুম্বার ভাস্কর্যের প্রতিরূপ। কিনশাসায় সোনালি রঙের বেদির ওপর লুমুম্বার ভাস্কর্য আজও ঠিক ওভাবেই দাঁড়িয়ে। তাহলে এই মানুষটি কে—যিনি কঙ্গোর প্রতি ম্যাচেই লুমুম্বাকে মনে করিয়ে দিচ্ছেন নীরব অভিব্যক্তিতে?

আরও পড়ুন

জন্ম কঙ্গোতেই। পিতৃপ্রদত্ত নাম মিশেল কুকা এমবোলাডিঙ্গা। কিন্তু পরিচিতি অন্য নামে ‘প্যাট্রিস লুমুম্বার নাতি’—যদিও কঙ্গোর স্বাধীনতার নায়ক এবং দেশটির প্রথম প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে তাঁর বংশীয় সম্পর্ক নেই। কিন্তু আফ্রিকান শ্রেষ্ঠত্বের প্রতিযোগিতায় শেষ ষোলোয় ওঠা কঙ্গোর গ্রুপ পর্বে প্রতিটি ম্যাচে মিশেল ওভাবে ভাস্কর্যের মতো দাঁড়িয়ে থেকে স্মরণ করিয়ে দেন এক মর্মান্তিক ঘটনাকে।

কিনশাসায় প্যাট্রিস লুমুম্বার ভাস্কর্য
এএফপি

বেলজিয়ামের ঔপনিবেশিক শাসনের অধীনে ছিল কঙ্গো। লুমুম্বা এই ঔপনিবেশকতার বিরোধিতা করে খনিজসমৃদ্ধ দেশটির স্বাধীনতাপ্রাপ্তির পুরোধা ছিলেন এবং প্রধানমন্ত্রী হন। কিন্তু ১৯৬০ সালের সেপ্টেম্বরে সেনা অভ্যুত্থানের মাধ্যমে লুমুম্বাকে পদচ্যুত করার পরের বছর ১৭ জানুয়ারি তাঁকে বন্দী অবস্থায় হত্যা করা হয়। তাঁর নিজের দেশেরই মানুষ তাঁকে মেরে ফেলেছিল। আবার সেই একই দেশের আরেকজন মানুষ মরক্কোর স্টেডিয়ামগুলোয় ওভাবে পাথরমুখে দাঁড়িয়ে বারবার মনে করিয়ে দিচ্ছেন, স্বাধীনতা এনে দেওয়াই হয়তো শেষ কথা নয়!

বর্তমান দুনিয়াই ভাইরাল হওয়ার। ভালো-মন্দ, বৈচিত্র্যপূর্ণ যেকোনো কিছুই এখন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মানুষ লুফে নেয়, ভাইরাল হয়। কাপ অব নেশনস শুরু হওয়ার পর থেকে মিশেলের দিনও ভাইরাল হয়েই কাটছে। সম্প্রচারমাধ্যমগুলো তাঁকে লুফে নিয়েছে। কঙ্গোর ম্যাচে এই স্থির চিত্রার্পিত মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে থাকা মানুষটির ওপর একাধিকবার ক্যামেরা ধরা হবেই। মিশেল সে লোভেই তাঁর দেশের ম্যাচে ওভাবে দাঁড়িয়ে থাকেন ভাবলে কিন্তু ভুল হবে।

আরও পড়ুন

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল-যুগ শুরুর আগে থেকে লুমুম্বাকে এভাবে শ্রদ্ধা জানিয়ে আসছেন মিশেল। সেটা ২০১৩ সাল থেকে। মিশেলের নিজের চোখে তিনি আসলে এক শিল্পী, মানুষকে বিনোদন দেওয়াই যাঁর কাজ। কিন্তু সব শিল্পকর্মই যেমন আনন্দের হয় না, তেমনি রক্তমাংসের মিশেল যে বিনোদন দেওয়ার চেষ্টা করছেন, সেটা সম্ভবত কঙ্গোর সমর্থকদের মনের ভেতরে দুঃখবোধ জাগ্রত করার মধ্য দিয়ে দেশপ্রেমও বের করে আনছে। নইলে গ্যালারিতে কঙ্গোর সমর্থকদের মধ্যে তাঁর এতটা জনপ্রিয় হওয়ার কথা নয়। রূপক অর্থে ব্যাপার অনেকটাই এমন, মিশেল ভাস্কর্য-মানব হয়ে দাঁড়িয়ে গ্যালারিতে। চারপাশের ভক্তরা যেন তাঁর মধ্যে লুমুম্বাকে আবিষ্কার করে আরও বেশি করে গর্জে উঠছেন দেশপ্রেমের নেশায়।

কঙ্গোর ম্যাচে গ্যালারিতে এভাবে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যায় মিশেলকে
এএফপি

শিল্পীরা ভক্ত কিংবা অনুগামীদের মধ্যে নিজের কাজ দিয়ে কী কী প্রোথিত করেন, সেটা তাঁরা নিজেরা হয়তো সব সময় জানেন না। মিশেলও তেমন। নিজের কাজের মাধ্যমে দেশকে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তুলে ধরতে পেরেই খুশি। ফ্রান্সের ভিডিওভিত্তিক সংবাদমাধ্যম ‘ব্রুট’কে এবারের নেশনস কাপের মধ্যেই বলেছেন, ‘আমি এটা করতে পেরেই খুশি।’ কঙ্গোর প্রতিটি ম্যাচ শেষে তাঁর দেশের সমর্থকেরাই তাঁকে বুকে টেনে নেন। প্রতিপক্ষ দলের সমর্থকেরাও বসে থাকেন না। ব্যাপারটায় যে তিনি শিশুসুলভ আনন্দ পান, সেটাও বুঝে নিতে পারেন মিশেলের কথায়, ‘খুব বিস্ময় লাগে। প্রত্যাশার বাইরে। আমি একজন শিল্পী। বিনোদনের ফেরিওয়ালা। সে জন্য এটা করি। এটা আমার দায়িত্ব।’

আশ্চর্যের বিষয়, গুগল করে লুমুম্বার ছবি দেখার পর মিশেলকে দেখলে ভ্রম জাগতে পারে। দুজনকে দেখতে প্রায় একই রকম। সম্ভবত এ কারণেই তাঁকে কেউ কেউ ‘লুমুম্বা’ নামেও ডাকেন।

প্যাট্রিস লুমুম্বার চেহারার সঙ্গেও মিল আছে মিশেলের
এক্স

রাবাতে আগামী ৬ জানুয়ারি শেষ ষোলোয় আলজেরিয়ার মুখোমুখি হবে কঙ্গো। সেদিনও এই লুমুম্বা থাকবেন গ্যালারিতে। নিথর, নিশ্চল মূর্তির মতো হাতটা উঁচু করে ঠায় দাঁড়িয়ে থাকবেন গ্যালারিতে। এতটুকু কষ্ট নেই, ক্লান্তি নেই শুধু ভালোবাসাটুকু ছাড়া। প্যাট্রিক লুমুম্বা যেভাবে ভালোবেসেছিলেন তাঁর দেশের মানুষকে, ফুটবলের এই লুমুম্বাও তেমনি হাতটা যখন উঁচু করে দাঁড়াবেন, সেটা যেন ভরসার ছায়া হয়ে ধরা দেবে মাঠে কঙ্গোর ফুটবলারদের মধ্যে।

ফুটবল আসলে এমনই এক খেলা—যেখানে দেশ, রাজনীতি, মানুষ ও ভালোবাসা মিলেমিশে একাকার হয়ে যায়। আর এভাবেই যুগের পর যুগ পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে লুমুম্বাদের জন্ম হয়, হয়তো ভিন্ন নামে, ভিন্ন আঙিনায়!