‘আমি ডাগআউটে থাকি বা না থাকি...’ : বিদায়ের সুর নাকি নতুন শুরুর বার্তা—কোন পথে স্কালোনি

চীনের সংবাদমাধ্যম ‘মিগু’কে দেওয়া সাক্ষাৎকারে স্কালোনি বললেন নিজের মনের অনেক কথা।রয়টার্স

সাফল্যের চূড়ায় ওঠাই কি ফুটবলের শেষ কথা, নাকি হেরে গিয়েও মানুষের হৃদয় জয় করে বৃত্ত সম্পন্ন করার মাঝেও লুকিয়ে থাকে পরম প্রাপ্তি?

স্পেনের কাছে বিশ্বকাপ ফাইনাল হারের পর প্রায় দুই মাস কেটে গেছে। হতাশার মেঘ কাটিয়ে আর্জেন্টিনা দল যখন নতুন করে হিসাব মেলাচ্ছে, সেই সময়ে আবার মুখ খুললেন কোচ লিওনেল স্কালোনি। চীনের সংবাদমাধ্যম ‘মিগু’কে দেওয়া সাক্ষাৎকারে বললেন নিজের মনের অনেক কথা। আবার কিছু বাকি রেখে দিলেন ভবিষ্যতের জন্য।

এ বছরের ডিসেম্বরেই মেয়াদ ফুরাচ্ছে বিশ্বকাপজয়ী এই কোচের। মেসিদের বিদায় আর একঝাঁক সিনিয়র ফুটবলারের যাওয়ার মিছিলে স্কালোনি থাকবেন কি না, তা নিয়ে আর্জেন্টাইন সংবাদমাধ্যমে জল্পনার শেষ নেই। ফুটবল ফেডারেশনের সভাপতি তাপিয়া চান স্কালোনি যেন থেকে যান। স্কালোনির এই সাক্ষাৎকার কিছুটা হলেও আর্জেন্টাইনদের আশার আলো দেখাচ্ছে। তাঁর কথাতে থেকে যাওয়ার সুর আছে ভালোভাবেই।

আরও পড়ুন

তবে সেই কথা বলার আগে বিশ্বকাপে নিজের দলের পারফরম্যান্স একবার মূল্যায়ন করলেন স্কালোনি, ‘২০২৪ কোপা আমেরিকা জয়ের পর, যখন সবকিছু জেতা শেষ, তখনো যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বকাপের দুটি বছর বাকি। তখন মনে হয়েছিল আগামী দিনগুলো হয়তো কঠিন হবে। একটা অনিশ্চয়তা জমা হয়েছিল বুকের ভেতর। কিন্তু পরক্ষণেই বুঝলাম, আমরা লড়াইটা চালিয়ে যেতে পারি। সত্যিই আমরা তা পেরেছি।’

বিশ্বকাপের স্বর্ণালি ট্রফিটা হাতছাড়া হলেও স্কালোনির দৃষ্টিতে কাতার থেকে উত্তর আমেরিকার এই যাত্রা কোনো ব্যর্থতা নয়। বরং মানুষের সঙ্গে সম্পর্কের সেতুবন্ধটা জিইয়ে রাখাটাই আসল জয়, ‘আমরা বিশ্বকাপ ফাইনাল হেরেছি, কিন্তু বিষয়টা জেতা না-জেতার ছিল না। আসল কথা ছিল নিজেদের নতুন করে প্রমাণ করা।’

আর্জেন্টিনার কোচ লিওনেল স্কালোনি
এএফপি

তারপরই আর্জেন্টাইন কোচ কথা বলেছেন দলের ও নিজের ভবিষ্যৎ নিয়ে, ‘এখন আমার সামনে নতুন এক অধ্যায়ের সূচনা। শুধু পুরোনো ট্রফি ধরে রাখার প্রতিযোগিতা নয়, মূল কথা হলো এই দলটার সঙ্গে মানুষের যে আত্মিক টান, মানুষ যেভাবে এই জার্সির সঙ্গে নিজেদের মেলাতে পারে, তা যেন বজায় থাকে। এত উঁচুতে ওঠার পর সেটা ধরে রাখা সহজ কাজ নয়। আমাদের দলটা প্রতিপক্ষের মনে শ্রদ্ধা আর একধরনের ভীতি জাগায়—অবশ্যই ইতিবাচক অর্থে। দলনেতা হিসেবে জানি চ্যালেঞ্জটা কতটা কঠিন। আমরা সেই পথেই এগিয়ে যাব, আমি ডাগআউটে থাকি বা না থাকি। সেটা বড় কথা নয়।’

আরও পড়ুন

কাতার বিশ্বকাপের সঙ্গে সাম্প্রতিক অভিজ্ঞতার তুলনা করতে গিয়ে স্কালোনি শোনালেন ভেতরের কঠিন সত্যটা। তাঁর দাবি, যে দলটা আগেরবার ৯৫ শতাংশ ফিটনেস নিয়ে মাঠে নেমেছিল, এবার তাদের লড়তে হয়েছে একদম শেষ সীমা স্পর্শ করে। বললেন, ‘এবার আমাদের সামর্থ্যের শেষ বিন্দু ছুঁয়ে নামতে হয়েছিল। ফুটবলারদের শতভাগ ফিটনেস ছিল না, তবু আমরা ওদের ওপর আস্থা রেখেছিলাম। আগেরবারের চেয়ে এবার অনেক বেশি কঠিন কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে হয়েছে। তবে মাঠের ফুটবলারের চেয়ে মানুষটা আমাদের কাছে বেশি গুরুত্বপূর্ণ। গত আট বছর ধরে যারা সব উজাড় করে দিয়েছে, তাদের ওপর বিশ্বাস রাখাটাই ছিল সঠিক কাজ।’

আর্জেন্টিনার কোচ লিওনেল স্কালোনি
ছবি: এক্স

নীল-সাদা জার্সির মাহাত্ম্য স্কালোনির কাছে এক পরম অনুভূতির নাম। স্কালোনির চোখে এটি শুধু একটি জার্সি নয়, দেশের মানুষের আশা-আকাঙ্ক্ষার ধারক, ‘এই জার্সি সবার জন্য নয়। আমার দলের সবাই অসাধারণ প্রতিভা, যারা একে অপরের ভেতরের সেরাটা বের করে আনে। জাতীয় দলের জার্সিতে তারা স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করে, এক ইতিবাচক শক্তি ওদের পরিচালিত করে।’

সামনের প্রীতি ম্যাচগুলোতে আর্জেন্টিনা ডাগআউটে দাঁড়াবেন স্কালোনিই। যেখানে শেষবার নীল-সাদা গায়ে নামবেন লিওনেল মেসি। মহাতারকার বিদায়লগ্নে স্কালোনির কণ্ঠে ঝরে পড়ল মুগ্ধতা ও কিছুটা দীর্ঘশ্বাস, ‘২২ বা ২৩ বছরের মেসি ছিল অনন্য। আমার কোচিংয়েও সে অসাধারণ খেলেছে, তবে বয়স যখন আরও কম ছিল, তখন যদি তাকে পেতাম! সে আগে যেমন অনন্য ছিলেন, এখনো তেমনই আছে।’

আরও পড়ুন

কিন্তু সময়ের চাকা তো আর থমে থাকে না। মেসির বিদায়ের পর কেমন হবে আর্জেন্টিনার রূপরেখা? স্কালোনি সোজা জানিয়ে দিলেন, কোনো নির্দিষ্ট কৌশলে বন্দী না থেকে তারা পথ চলবেন আর্জেন্টিনার ঐতিহ্যবাহী দর্শনেই, ‘কখনো ফুটবল হয় আক্রমণাত্মক, কখনো বল দখলে রাখার লড়াই। আমরা সব সময় আর্জেন্টিনার নিজস্ব ঘরানাকেই প্রাধান্য দিয়েছি। এখন নতুন একটা অধ্যায় শুরু হচ্ছে। যারা দরজায় কড়া নাড়ছে, সেই তরুণদের ওপর চোখ রাখার সময় এসেছে। আমি বারবার বলি, বয়স কোনো বাধা নয়। ক্লাব ফুটবলে কেমন খেলছে, তার ওপর নির্ভর করবে পুরোনোরা থাকবে নাকি নতুনরা আসবে। আমাদের ইচ্ছা সবাইকে এই পবিত্র জার্সি গায়ে চাপানোর সুযোগ দেওয়া।’

আর্জেন্টিনার কোচ লিওনেল স্কালোনি

বিশ্বকাপের সেই অগ্নিপরীক্ষার দিনগুলোর কথা বলতে গিয়ে মিসর আর ইংল্যান্ডের বিপক্ষে শ্বাসরুদ্ধকর ম্যাচগুলোর স্মৃতি ফেরালেন স্কালোনি, ‘মিসর ও ইংল্যান্ডের বিপক্ষে ম্যাচগুলো আমাদের অনেকের জন্যই ছিল দুর্দান্ত; সবাই সেগুলো উপভোগ করেছে। আমরা কখনোই হাল ছাড়িনি, আর এটাই ছিল আমাদের দেওয়া সেরা বার্তা।’

আরও পড়ুন

ফাইনালে স্পেনের বিপক্ষে পুরোটা সময় নিষ্প্রভ ছিল আর্জেন্টিনা দল। তাদের ১-০ গোলে হারের পর ফাইনাল নিয়ে নানা ষড়যন্ত্র তত্ত্বের কথা বলা হয় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে। তবে সেসবকে পাত্তা দিচ্ছেন না স্কালোনি, ‘স্পেন আর আর্জেন্টিনা তো দুই ভাইয়ের মতো। তিন-চারজনের বিচ্ছিন্ন মন্তব্যে এই ভালোবাসার বন্ধন মলিন হতে পারে না। আমি ওখানেই থাকি, এমনকি অনেক স্প্যানিশও চেয়েছিল আমরাই জিতি। ফাইনালে হেরে যাওয়ার পরও যখন দেখলাম মানুষ রানার্সআপ ট্রফি উদ্‌যাপনে রাস্তায় নেমে এসেছে, আমার কাছে সেটাই আসল জয় মনে হয়েছে। এর মানে আমরা সবাই জয়ী। আগামী প্রজন্ম যেন লড়াইয়ের এই বার্তাটা নিয়ে এগিয়ে যায়।’