‘থেকে যান কোচ’: কাগজের টুকরায় ভালোবাসা লিখে স্কালোনিকে বাঁধল ৯ বছরের ওত্তাভিয়ানি
কোচ আসে কোচ যায়। ফুটবলের এ অলিখিত নিয়ম। কিন্তু সব কোচের কপালই কি এমন? কোনো কোনো কোচকে তো ঠেকিয়ে রাখার চেষ্টাও করা হয়। তাতে কখনো ফল মেলে, কখনো মেলে না। ফ্রাঙ্কো ওত্তাভিয়ানির কপালে কী আছে কে জানে!
ছেলেটি আর্জেন্টাইন। এটুকু পড়েই নিশ্চয়ই বুঝে ফেলেছেন, কোচটি কে! লিওনেল স্কালোনি। আর্জেন্টিনা দলের কোচ। বিশ্বকাপের ফাইনালে স্পেনের বিপক্ষে আর্জেন্টিনার হারের পর থেকেই গুঞ্জন চলছে স্কালোনি আর মেসিদের কোচ পদে থাকবেন না। চলতি বছর ডিসেম্বর পর্যন্ত তাঁর বর্তমান চুক্তির মেয়াদ। কিন্তু ফাইনালের পর স্কালোনি বলেছিলেন, ‘আমি ডিসেম্বর পর্যন্ত আর্জেন্টিনার কোচ হিসেবে আছি...তারপর হয়তো থামব।’
ফ্রাঙ্কোর প্রসঙ্গে ফেরার আগে একটি বিষয় জানিয়ে রাখতে হয়। ২০১৮ সালে আর্জেন্টিনার দায়িত্ব নেন স্কালোনি। তাঁর হাত ধরে ৩৬ বছর পর বিশ্বকাপে ট্রফিখরা কাটায় আর্জেন্টিনা। পাশাপাশি দুটি কোপা আমেরিকা ও ফিনালিসিমা ট্রফিও জেতান স্কালোনি। সব মিলিয়ে আর্জেন্টাইন ফুটবলকে সাফল্যের পথে ফেরানো এবং আবারও শীর্ষে তোলায় তাঁর ভূমিকা অপরিসীম। এবারসহ যেমন টানা দুবার আর্জেন্টিনাকে তুললেন বিশ্বকাপের ফাইনালে।
এমন একজন কোচ চলে যাওয়ার ইঙ্গিত দিলে স্বাভাবিকভাবেই দেশটির ফুটবলের হর্তাকর্তাদের টনক নড়বে। ভক্তদের তো বটেই। ঘটছেও ঠিক তা–ই। স্কালোনিকে পরবর্তী বিশ্বকাপ পর্যন্ত ধরে রাখার দাবিটা সব আর্জেন্টাইনেরই। বিশেষ করে বয়সে পরিণতদের যখন এ দাবিতে একটু বেশিই সোচ্চার হওয়ার কথা, সেখানে মাত্র ৯ বছর বয়সী ফ্রাঙ্কো ওত্তাভিয়ানির যা করেছে, সেটা কোচসহ অনেককেই আবেগপ্রবণ করে তুলেছে।
বিশ্বকাপ ফাইনালে আর্জেন্টিনার হারের পর স্কালোনির জন্মশহর সান্তা ফের পুজাতোয় বেশ উন্মাদনা তৈরি হয়। স্কালোনি যে বাড়িতে বড় হয়েছেন, সেখানে প্রচুর মানুষের সমাগম হয়। স্কালোনিকে একনজর দেখতে এবং স্মারক সংগ্রহ করতে কয়েক দিন মানুষের ভিড় লেগে ছিল। ফ্রাঙ্কোও ছিল সেই ভিড়ের মধ্যে। সান্তা ফে প্রদেশেরই কারকারানায় বসবাস তার। পুজাতো শহর থেকে মাত্র ২০ কিলোমিটার পথের দূরত্ব।
তবে ফ্রাঙ্কোর লক্ষ্য ছিল একটু অন্য রকম। সে শুধু স্কালোনিকে দেখতে যায়নি। ফাইনালের পর স্কালোনির প্রস্থানের গুঞ্জন শুনে তার খুব খারাপ লেগেছিল। আর্জেন্টিনার সংবাদমাধ্যম তোদো নোটিসিয়াস (টিএন) জানিয়েছে, স্কালোনির প্রস্থানের গুঞ্জন শুনে ফ্রাঙ্কো মনে মনে নিজেকে বলেছে, ‘এমনটা যেন না ঘটে, সে জন্য আমাকে কিছু একটা করতেই হবে।’
ফ্রাঙ্কো ওত্তাভিয়ানি পরিবারের সবাইকে নিয়েই গিয়েছিল স্কালোনির সঙ্গে দেখা করতে। কোচের সঙ্গে দেখা করে তাঁর কাছ থেকে ২০৩০ সাল পর্যন্ত একটি ‘চুক্তিপত্রে’ সই নেয় সে। এরপর ছেলেটি ইন্টারনেটে ভাইরাল হয়ে যায়। তবে সেটি আর্জেন্টিনা ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনের (এএফএ) আসল চুক্তিপত্র ছিল না। ফ্রাঙ্কো একটি কাগজের টুকরায় মনগড়া চুক্তি লিখে নিয়ে গিয়েছিল।
টিএনকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে ফ্রাঙ্কো ওত্তাভিয়ানি বলেছে, ‘আমার কাছে জাতীয় দল হলো সবকিছু এবং আমি চাই না স্কালোনি চলে যান। আমিও ফুটবল খেলি এবং একদিন জাতীয় দলে খেলতে চাই।’
ফ্রাঙ্কো স্কালোনির বাড়িতে এই প্রথম যায়নি। ২০২২ কাতার বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনা চ্যাম্পিয়ন হওয়ার পরও কোচের সঙ্গে দেখা করতে তাঁর বাড়িতে গিয়েছিল সে। তার বাবা সিজার ওত্তাভিয়ানির মুখেই শুনুন সেই গল্প, ‘২০২২ সালে যখন স্কালোনি চ্যাম্পিয়ন হন, তখন আমরা পরিবারসহ তাঁকে শুভেচ্ছা জানাতে গিয়েছিলাম। সে সময়ই ফ্রাঙ্কো প্রথমবারের মতো কোচের কাছাকাছি যাওয়ার সুযোগ পায় এবং একটি ছবি তোলে।’
এবার ফাইনালে হারের পর স্কালোনিকে আবারও সম্মান জানানোর সিদ্ধান্ত নেয় ওত্তাভিয়ানি পরিবার। সিজারের ভাষায়, ‘আমরা বৃহস্পতিবার (স্থানীয় সময়) বিকেলে যাই, বিকেল সাড়ে ৪টায় পৌঁছাই এবং বিকেল ৫টা ১৫ মিনিটে লিওনেল সবাইকে শুভেচ্ছা জানাতে বাইরে বেরিয়ে আসেন। তিনি প্রায় দুই ঘণ্টা সবার অটোগ্রাফে সই করেন।’
সিজার জানান, স্কালোনিকে একনজর দেখতে সেখানে ‘মানুষের সমুদ্র’ তৈরি হয় এবং কোচ ও আর্জেন্টিনা দলের খেলোয়াড়দের ছবি মোড়ানো গাড়িও ছিল। সিজারের ভাষায়, ‘মানুষের ভিড় বেড়েই চলেছিল। তিনি দিনে দুই বা তিনবার বাইরে আসার চেষ্টা করতেন, কিন্তু ফুটপাতে সব সময়ই মানুষের উপচে পড়া ভিড় থাকত।’
‘চুক্তিপত্র’ যেভাবে বানানো হলো
সিজার ওত্তাভিয়ানি জানান, স্কালোনিকে ২০৩০ সাল পর্যন্ত আর্জেন্টিনা দলের কোচের দায়িত্বে রাখতে তাঁকে চুক্তিপত্রে স্বাক্ষর করানোর বুদ্ধিটি তাঁর ছোট ছেলে ফ্রাঙ্কোর মাথা থেকে এসেছিল। সিজার বলেন, ‘সে স্কালোনিকে জাতীয় দলেই থেকে যাওয়ার কথা বলতে চেয়েছে। সে তাঁকে ভীষণ পছন্দ ও শ্রদ্ধা করে। বিগত বছরগুলোতে তাঁর অর্জন, সে কারণে স্কালোনিই তার আদর্শ।’
ফ্রাঙ্কো ভেবেছিল, ‘স্কালোনির স্বাক্ষর পেতে (চুক্তিপত্রে) আমি তাঁকে কী লিখে দিতে পারি?’ শেষ পর্যন্ত তার বাবাই তাকে ‘চুক্তিপত্র’ কীভাবে লিখতে হবে সেই পরামর্শ দেন। ফ্রাঙ্কো সেই পরামর্শ মেনেই কাগজে চুক্তিপত্র লিখেছে।
স্কালোনি যখন ‘চুক্তিপত্রে’ সই করলেন
সেদিনের স্মৃতিচারণা করে সিজার বলেন, ‘আমরা পুজাতোয় পৌঁছালাম। স্কালোনি আমাদের কাছে এসে জার্সিতে সই করলেন এবং ফ্রাঙ্কো তখন তাঁর হাতে কাগজটি তুলে দেয়। আমি বললাম, “লিও (স্কালোনি), আপনি কীসে সই করছেন তা কি খেয়াল করেছেন?” তখন তিনি বিষয়টি লক্ষ করে হেসে বললেন, “তোমরা দারুণ তো!” তারপর কাগজে সই করলেন।’
কারকারানিয়ায় নিজেদের বাসায় ফেরার পর ওত্তাভিয়ানি পরিবার পুজাতোয় ঘটে যাওয়া ঘটনাটি এএফএর নজরে আনার সিদ্ধান্ত নেয়। সিজার বলেন, ‘বাড়ি ফেরার পর ফ্রাঙ্কো বলল, “আমার কাছে তো চুক্তিপত্রটি আছেই, এখন জাতীয় দলকে এটি জানানোর জন্য আমরা কী করতে পারি?” ঠিক তখনই আমরা একটি ভিডিও তৈরি করি, যেখানে (এএফএ সভাপতি) তাপিয়াকে অনুরোধ করা হয়, যাতে তিনি স্কালোনির চুক্তি নবায়নের বিষয়টি নিশ্চিত করতে নিজের ভূমিকা পালন করেন।’
সিজার যোগ করেন, ‘আমরা ভাবতেও পারিনি বিষয়টি এভাবে ভাইরাল হয়ে যাবে। এ নিয়ে আমি খুবই গর্বিত, আর এত অল্প বয়সে ফ্রাঙ্কোর জন্য এটি একটি চমৎকার অভিজ্ঞতা ছিল।’