মাঝেমধ্যে এমন কিছু ম্যাচ হয়, যা আমাদের মনে করিয়ে দেয়, ফুটবল হলো ‘দ্য বিউটিফুল গেম’। প্যারিসে গতকাল রাতটাও ছিল তেমনই এক রাত। ‘সিটি অব লাইট’ কিংবা চিত্রকরদের এই শহরে পিএসজি-বায়ার্ন মিউনিখ ফুটবলের এমনই এক ছবি এঁকেছে, যা সমর্থকদের মনে থাকবে অনেক দিন।
সেই ‘ছবি’র ক্যানভাসটা হলো চ্যাম্পিয়নস লিগ সেমিফাইনাল প্রথম লেগ। যেখানে বায়ার্নকে ৫-৪ গোলে হারিয়েছে পিএসজি। ফুটবল খেলায় হার-জিত থাকায় পরাজিত হিসেবে বায়ার্নের নামটা লিখতে হলো। আসলে এ ম্যাচে হারতে পারত পিএসজিও। দলটির কোচ লুইস এনরিকে যেমন ম্যাচ শেষে বলেছেন, ‘জয়টা আমাদের প্রাপ্য ছিল, ড্র–ও প্রাপ্য ছিল এবং হারও। অসাধারণ এক ম্যাচ। সন্দেহাতীতভাবে, কোচ হিসেবে আমার ক্যারিয়ারে এটাই সেরা ম্যাচ।’
১৯৬০ সালের ৫ মে ইউরোপিয়ান কাপ সেমিফাইনালের ফিরতি লেগে রেঞ্জার্সকে ৬-৩ গোলে হারিয়েছিল আইনট্রাখট ফ্রাঙ্কফুর্ট। তারপর ইউরোপের শীর্ষ এ ক্লাব প্রতিযোগিতার সেমিফাইনালে গতকাল পার্ক দে প্রিন্সেসের ম্যাচেই সবচেয়ে বেশি গোল দেখা গেল। ব্যাপারটা আরেকটু ভেঙে বলা যায়। চ্যাম্পিয়নস লিগে সেমিফাইনালের মঞ্চে এক ম্যাচে এত গোল এর আগে দেখা যায়নি।
তবে চ্যাম্পিয়নস লিগের পূর্ববর্তী সংস্করণ ইউরোপিয়ান কাপও বিবেচনায় নিলে রেঞ্জার্স ও ফ্রাঙ্কফুর্টের মধ্যে ৬৬ বছর আগের সেই ম্যাচটি আসবে। শুধু তা–ই নয়, ইউরোপ–সেরার এই প্রতিযোগিতায় নকআউট পর্বে যেকোনো ম্যাচে সব মিলিয়ে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ গোলের রেকর্ডেও ভাগ বসিয়েছে পিএসজি-বায়ার্নের এই ম্যাচ।
তবে এ ম্যাচের রোমাঞ্চ অথবা মজা শুধু গোলে নয়। ৫-২ গোলে পিছিয়ে থাকা অবস্থায়ও ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টায় আরও ২ গোল করেছে বায়ার্ন। পাশাপাশি খেলায় দুই দলের আক্রমণের তীব্রতা, একের পর এক আক্রমণ আর প্রতি–আক্রমণ ও দৌড়— এসব মিলিয়ে ম্যাচটি নিঃসন্দেহে ‘ইউরোপিয়ান ক্ল্যাসিক।’
আগামী বুধবার মিউনিখে ফিরতি লেগের আগে সেই ক্ল্যাসিকে এনরিকের দল ১ গোল ব্যবধানে এগিয়ে। কিন্তু এমন ম্যাচ শেষে আসলে একক কৃতিত্ব বলে কিছু থাকে না। ডিফেন্ডিং চ্যাম্পিয়ন পিএসজির কোচ এনরিকে ব্যাপারটা বোঝেন বলেই ম্যাচ শেষে বলেছেন, ‘এমন তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক ম্যাচ আর দেখিনি। এখন আসলে (ফুটবলারদের) ভুলত্রুটি খুঁজে বের করার সময় নয়; বরং আমাদের সবাইকে অভিনন্দন জানানো উচিত।’
এনরিকে মজা করে বলেন, ‘খুব ক্লান্ত লাগছে। আমি তো এক কিলোমিটারও দৌড়াইনি। তাই খেলোয়াড়দের কেমন লাগছে, বলতে পারব না।’
এনরিকে মজা পেলেও গতকাল রাতে পার্ক দে প্রিন্সেসে এমন একজন দর্শক ছিলেন, যিনি এমন ম্যাচেও বেজার মুখে বসে ছিলেন গ্যালারিতে। বায়ার্ন কোচ ভিনসেন্ট কোম্পানি!
এক ম্যাচ নিষেধাজ্ঞার কারণে কোম্পানি বায়ার্নের ডাগআউটে দাঁড়াতে পারেননি। কানে ইয়ারপিস লাগিয়ে মিডিয়া বক্সে স্টাফদের সঙ্গে বসে খেলা দেখতে হয় তাঁকে। শেষ বাঁশি বাজার পর প্রাইম ভিডিওকে কোম্পানি বলেন, ‘কোনো মজা নেই। ভবিষ্যতে এমন কিছু না ঘটলে ভালো লাগবে।’
ম্যাচের পরতে পরতে ছড়িয়ে পড়া রোমাঞ্চের ছাপ ফুটেছে কোম্পানির মুখেও। টাচলাইনে দলের দায়িত্ব সামলেছেন সহকারী কোচ অ্যারন ড্যাঙ্কস। প্রথমার্ধে বেশ স্বাভাবিকই ছিলেন কোম্পানি। কিন্তু বিরতির পর অমানিশা নেমেছে তাঁর মুখে। তবে শিষ্যদের খেলায় তৃপ্ত বায়ার্ন কোচ, ‘৮০ মিটার দূরে বসে কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া আমার পক্ষে সম্ভব নয়। তবে খেলোয়াড়দের লড়াইয়ে ফেরার ধরনটা ভালো লেগেছে।’
তিন হলুদ কার্ডের দায়ে এক ম্যাচের নিষেধাজ্ঞা কাটিয়ে আগামী বুধবার ফিরতি লেগে বায়ার্নের ঘরের মাঠে ডাগআউটে ফিরবেন কোম্পানি। সে ম্যাচে ঘুরে দাঁড়াতে বায়ার্ন সমর্থকদের সাহায্য চেয়ে রাখলেন এই বেলজিয়ান কোচ, ‘রিয়ালের বিপক্ষে ম্যাচে সমর্থকদের মধ্যে একধরনের আগুন ছিল। আমাদের সেটি তো লাগবেই; বরং তার চেয়েও বেশি কিছু দরকার। সমর্থকদের কাছে আমার চাওয়া এটুকুই। এমন ম্যাচ দেখার জন্য আমিও স্টেডিয়ামে যেতাম, তবে চুপচাপ বসে থাকার জন্য নয়।’
পিএসজি কোচ এনরিকেও জানেন, বায়ার্নের মাঠে ফিরতি লেগটা কেমন হতে যাচ্ছে। ফিরতি লেগ নিয়ে এনরিকের ভাষ্য, ‘আমি আমার স্টাফদের কাছে জানতে চেয়েছিলাম, এই ম্যাচ জিততে আমাদের কয়টি গোল করতে হবে? তারা জানাল, অন্তত ৩টি। বায়ার্ন মিউনিখ তাদের নিজেদের মাঠে আরও শক্তিশালী। তবে আমরা একই মানসিকতা নিয়ে লড়াই করব।’