৩ গোল খেয়ে ভারতের কাছে বিধ্বস্ত বাংলাদেশ

অনেক সুযোগ নষ্ট করেছে বাংলাদেশবাফুফে

গোয়ার আকাশে মেঘের আনাগোনা ছিল না। তবে মারগাঁওয়ের জওহরলাল নেহরু স্টেডিয়ামের সবুজ গালিচায় বাংলাদেশের মেয়েদের চেনা ছন্দটা যেন মেঘের আড়ালেই হারিয়ে গিয়েছিল গতকাল! সাফ নারী চ্যাম্পিয়নশিপের গ্রুপ পর্বের অলিখিত ‘ফাইনালে’ তাদের খেলায় সেই চেনা ধার, মাঠের চিরচেনা বোঝাপড়া—ছিল না কিছুই।

চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী ভারতের বিপক্ষে লড়াই–ই হলো না সেভাবে, শেষ বাঁশির পর মাঠ ছাড়তে হলো হারের বিষাদ নিয়ে। ম্যাচের ৩৬, ৭৭ ও ৮৯ মিনিটের তিনটি গোলই লিখে দিল ম্যাচের ভাগ্য। এই বড় হারের ধাক্কায় গ্রুপ ‘বি’র রানার্সআপ হয়ে সেমিফাইনালে পা রাখল বাংলাদেশ, যেখানে ৩ জুনের অগ্নিপরীক্ষায় মারিয়া-মনিকাদের জন্য অপেক্ষা করছে ‘এ’ গ্রুপের চ্যাম্পিয়ন নেপাল।

ম্যাচের প্রথম ১০ মিনিট বাংলাদেশের মেয়েরা কিছুটা আক্রমণাত্মক ফুটবল খেললেও ধীরে ধীরে ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নেয় ভারত। বিশেষ করে রাইট উইংয়ে এদিন অনেকটাই নিষ্প্রভ ছিলেন শামসুন্নাহার জুনিয়র। শুধু শামসুন্নাহার কেন, গোটা দলই থাকল নিজেদের ছায়া হয়ে।

শুরুর দিকে প্রতিপক্ষ ডিফেন্ডারের ভুলে বল পেয়ে আনিকা সুযোগ তৈরি করলেও তাঁর শট সরাসরি চলে যায় ভারতীয় গোলকিপারের হাতে। এরপর মারিয়ার ক্রস থেকে শামসুন্নাহার জুনিয়র লাফিয়ে উঠেও মাথায় বলের নাগাল পাননি।

প্রথমার্ধে আনিকার ওই শট ছাড়া বাংলাদেশের আর কোনো শট অন-টার্গেট ছিল না। অন্যদিকে পুরো প্রথমার্ধেই ছিল ভারতের চড়া আক্রমণ। বাংলাদেশের ডিফেন্ডার আফরিন কিছু আক্রমণ রুখে না দিলে ব্যবধান আরও বাড়তে পারত।

প্রথম গোলটি আসে পিয়ারির কাছ থেকে
এক্স

ম্যাচের ৩৬ মিনিটে রক্ষণের একমুহূর্তের অসতর্কতায় গোল হজম করে বাংলাদেশ নারী ফুটবল দল। নিজেদের সীমানা থেকে ভারতের ডিফেন্ডার নির্মলা দেবী লম্বা বল বাড়ান বাংলাদেশের লেফট ব্যাক পজিশন লক্ষ্য করে। আফঈদার জায়গায় দলে সুযোগ পাওয়া সুরমা জান্নাত বল ক্লিয়ার করতে হেড করলেও বল সামনে না গিয়ে উল্টো পেছনে ভারতীয় স্ট্রাইকার পিয়ারি জাজার পায়ে চলে যায়।

এমন সুবর্ণ সুযোগ হাতছাড়া করেননি পিয়ারি। নিখুঁত কোনাকুনি শটে বাংলাদেশের গোলকিপার মিলিকে পরাস্ত করেন তিনি। ভারতের নারী লিগে ওডিশার ক্লাব নিতা স্পোর্টস একাডেমিতে খেলা পিয়ারির এটি ছিল জাতীয় দলের হয়ে ৪৫তম ম্যাচে ২০তম গোল।

দ্বিতীয়ার্ধে বাংলাদেশ দল খোলস ছেড়ে বেরিয়ে আসার চেষ্টা করে। বেশ কটি আক্রমণে ভারতীয় রক্ষণভাগকে ব্যস্ত করে তোলে। তবে স্ট্রাইকারদের ফিনিশিং দুর্বলতার কারণে বারবার ভেস্তে যায় সমতায় ফেরার সুযোগ। ম্যাচে গতি ফেরাতে ৬৫ মিনিটে একসঙ্গে তিনটি বড় পরিবর্তন আনেন কোচ পিটার বাটলার। স্ট্রাইকার আনিকার জায়গায় নামেন সাগরিকা, মনিকার পরিবর্তে শিউলি আজিম ও শামসুন্নাহার জুনিয়রের জায়গায় উমেলাহ মারমা।

সেমিফাইনালে বাংলাদেশ খেলবে নেপালের বিপক্ষে
বাফুফে

কিন্তু সমতাসূচক গোল পাওয়ার পরিবর্তে ৭৭ মিনিটে সুরমা জান্নাত ভারতের বদলি ফরোয়ার্ড মালাভিককে ডি–বক্সে ফেলে দেন। ভুটানের রেফারির ওম চোকির দেওয়া পেনাল্টিতে আরেক বদলি লিয়েন্ডা সহজেই মিলিকে নড়ার সুযোগ না দিয়ে বাঁ দিক দিয়ে বল জালে পাঠান। শেষ ক্ষণে মালবিকা তৃতীয় গোল করলে বাংলাদেশের রক্ষণ হয়ে পড়ে ছত্রখান।

এর আগে মালদ্বীপ ম্যাচের একাদশ থেকে দুটি বড় পরিবর্তন এনেছিলেন বাটলার। এই প্রথমবারের মতো তিনি দল থেকে বাদ দেন সেন্ট্রাল ডিফেন্ডার আফঈদা খন্দকারকে। আর মনিকাকে একাদশে জায়গা দিতে বেঞ্চে বসতে হয়েছে উমেলাহ মারমাকে।

তবে শেষ পর্যন্ত কোচের এসব কৌশলগত পরিবর্তনও বড় হার এড়াতে পারেনি। ভারতের আক্রমণভাগ দ্বিতীয়ার্ধে বেশ কিছু বিপজ্জনক থ্রু বাড়িয়েছিল, কিন্তু বাংলাদেশের গোলকিপার মিলির সতর্কতা এবং ভারতীয় ফরোয়ার্ডদের এলোমেলো ফিনিশিংয়ের কারণে ব্যবধান বাড়তে ৭৭ মিনিট পর্যন্ত সময় লেগেছে।

সাফ নারী চ্যাম্পিয়নশিপে এ পর্যন্ত দুই দল ৮ বার মুখোমুখি হয়েছে। যার মধ্যে ভারতের জয় ৫টি, বাংলাদেশের ২টি এবং ড্র হয়েছে ১টি ম্যাচ। দুই দলের লড়াইয়ে ভারত করেছে ২২ গোল, বাংলাদেশের গোল ৭টি।

আরও পড়ুন

গোয়ার মারগাঁওয়ের জওহরলাল নেহরু স্টেডিয়ামে এদিন দর্শকদের উপস্থিতি ছিল না বললেই চলে। এদিকে ম্যাচ শুরু হতেই আগের দিন গোয়ায় আসা জনাছয়েক নেপালি সাংবাদিক প্রেসবক্স ছেড়ে যান। শ্রীলঙ্কাকে ২-০ গোলে হারিয়ে ‘এ’ গ্রুপের সেরা হয়ে সেমিফাইনাল নিশ্চিত করেছে নেপাল। ফলে নিয়ম অনুযায়ী সেমিফাইনালে তাদের খেলতে হবে ‘বি’ গ্রুপের রানার্সআপ বাংলাদেশের সঙ্গে।

গ্রুপ চ্যাম্পিয়ন হওয়ার পর সংবাদ সম্মেলনে নেপালের কোচ জানিয়েছিলেন, বাংলাদেশ ও ভারত দুই দলই শক্তিশালী। তবে তাঁর কথার রেশ ধরে স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছিল, ফাইনালে ওঠার লড়াইয়ে ভারতের চেয়ে বাংলাদেশকেই প্রতিপক্ষ হিসেবে বেশি পছন্দ নেপালের। নেপালি কোচের সেই পরোক্ষ ইচ্ছাই যেন সত্যি হলো ভারতের কাছে বাংলাদেশের হারে। ৩ জুন টুর্নামেন্টের দুটি সেমিফাইনাল হবে। সেদিন বাংলাদেশের মেয়েদের সামনে নেপাল যে বড় বাধা হয়ে দাঁড়াবে, তাতে কোনো সংশয় নেই।

আরও পড়ুন