মধ্যপ্রাচ্যে বিশ্বকাপ আয়োজনের সিদ্ধান্তের পর থেকেই যেসব প্রশ্ন বড় হয়ে সামনে এসেছিল, তার একটি ছিল সময়। নভেম্বর মাসের বিশ্বকাপ নিয়ে আপত্তি ছিল অনেকের। সাধারণত জুন–জুলাই মাসেই সবাই বিশ্বকাপ দেখে অভ্যস্ত। কাতারের তীব্র গরমের কারণে বিশ্বকাপকে ঠেলে দেওয়া হয় নভেম্বর মাসে। সময়ের এই পরিবর্তনের মাঝেই লুকিয়ে ছিল চোটে পড়ার মূল বীজটা।

সাধারণত ইউরোপীয় ক্লাব ফুটবলের মৌসুম শেষ হওয়ার পর নতুন মৌসুম শুরুর মাঝামাঝি সময়ে মাঠে গড়াত বিশ্বকাপ। খেলোয়াড়েরা একরকম সতেজ থেকেই বিশ্বকাপে চোখ রেখে প্রস্তুত হতে পারতেন।

তবে এবার পরিস্থিতি বদলে গেছে। নতুন মৌসুম ইতিমধ্যে শুরু হয়ে গেছে। চলমান মৌসুমে বিরতি দিয়েই খেলোয়াড়েরা বিশ্বকাপের লড়াইয়ে নামবেন। উপর্যুপরি খেলার মধ্যে থাকার চাপ অনেকেই নিতে পারছেন না। যা চোটকেও জেঁকে বসার সুযোগ করে দিয়েছে।

চোট–সমস্যা অবশ্য খুব নতুন কিছু নয়। চোট এর আগেও বিভিন্ন সময় একাধিক ফুটবলারকে বিশ্বকাপ থেকে ছিটকে দিয়েছিল। ১৯৬২ সালে চোটে পড়ে বিশ্বকাপ থেকে ছিটকে গিয়েছিলেন আলফ্রেডো ডি স্টেফানো। ১৯৯৮ বিশ্বকাপে পেশির চোটে বিশ্বকাপ থেকে ছিটকে পড়েন ব্রাজিলের

১৯৯৪ বিশ্বকাপ জয়ের নায়ক রোমারিও। ম্যানচেস্টার সিটির কোচ পেপ গার্দিওলা ২০০২ বিশ্বকাপে দর্শক হয়েছিলেন ডান পায়ের লিগামেন্টের চোটে পড়ে। ২০১০ সালে ইংল্যান্ডের হয়ে একই কারণে বিশ্বকাপ খেলার সুযোগ পাননি রিও ফার্ডিনান্দ। একই বিশ্বকাপে জার্মান তারকা মাইকেল বালাকেরও হয়েছিল অভিন্ন  পরিণতি।

এ ছাড়া ডেভিড বেকহাম, মাইকেল ওয়েন, রাদামেল ফালকাও এবং মার্কো রয়েসসহ অনেককে বিভিন্ন বিশ্বকাপে চোটের কারণে দর্শকের ভূমিকা থাকতে হয়েছিল। তবে এবারের পরিস্থিতি একেবারেই ভিন্ন। দলগুলোতে চোটের যেন মড়ক লেগেছে।

এবার বিশ্বকাপের আগে থেকেই চোটের কারণে বড় ধাক্কা খেতে শুরু করেছে দলগুলো। এনগালো কান্তে, পল পগবা, রাফায়েল ভারানেসহ একাধিক তারকাকে হারিয়ে বিপর্যয়ের মুখে পড়েছে বর্তমান চ্যাম্পিয়ন ফ্রান্স। দলের সেরা তারকারা এভাবে ছিটকে যাওয়ায় কৌশল নির্ধারণেও হিমশিম খেতে হবে দলটির কোচ দিদিয়ের দেশমকে।

চোটের ধাক্কা লেগেছে আর্জেন্টিনা দলেও। পাওলো দিবালাকে বিশ্বকাপের আগে পাওয়ার সম্ভাবনা একরকম শেষ, চোটে ভুগছেন আনহেল দি মারিয়া এবং জিওভান্নি লো সেলসোও। সব মিলিয়ে লিওনেল মেসির বিশ্বকাপ অভিযানে বড় বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে এই চোট–সমস্যা।

নাম ধরে ধরে লিখতে হলে এই প্রতিবেদন অনেক বড় হয়ে যাবে। তবে দল ঘোষণার আগে সুসংবাদ না পেলে বেশ চাপেই পড়তে হতে পারে কোচদের।

বর্তমান সময়ে খেলোয়াড়দের টানা ম্যাচ খেলার চাপও চোট–সমস্যার বড় কারণ। আধুনিক ফুটবল শিল্প থেকে এখন যন্ত্রের দিকে চালিত হয়েছে। খেলোয়াড়েরাও যেন পরীক্ষাগারের ‘গিনিপিগ’।

ফুটবল–বাণিজ্য খেলোয়াড়দের ওপর নানামুখী চাপে ফেলছে। প্রতি দুই–তিন দিনের ব্যবধানে একটি করে ম্যাচ খেলতে হচ্ছে। এই নিয়ে অনেকেই মুখ খুলেছেন। লিভারপুল কোচ ইয়ুর্গেন ক্লপসহ অনেকেই খেলোয়াড়দের টানা খেলা নিয়ে সমালোচনা করেছেন।

ক্লপ তো খেলোয়াড়দের এই সমস্যাকে জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে তুলনা করেছিলেন। তিনি বলেছিলেন, ‘এটা অনেকটা পরিবেশের মতো ব্যাপার। আমরা সবাই জানি পরিবেশ বদলাবে। তবে কেউ বলে না যে, কী করতে হবে। কেন আমরা এটা নিয়ে কথা বলি না এবং এটা বলি না যে ভদ্রলোক এবং ভদ্রমহিলারা, ফিফা, প্রিমিয়ার লিগ, এফএ, সবাই—একে–অপরের সঙ্গে কথা বলুন। এমন একটা বৈঠক হওয়া উচিত, যেখানে সবাই একে–অপরের সঙ্গে কথা বলবে। আর এই খেলাটিতে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হওয়া উচিত একটি, তা হলো খেলোয়াড়েরা।’

বিশ্বকাপের আগে টানা পাঁচ মাস ক্লাবের হয়ে খেলায় থাকার পর মাঠে নামবেন খেলোয়াড়েরা। এর মধ্যে ক্লাবগুলো নিজেদের অবস্থান সুদৃঢ় করতে বড় তারকাদের থেকে সর্বোচ্চ পেতে যে মরিয়া থাকবে, তা বলাই বাহুল্য। এই চাপ সামলাতে গিয়ে খেলোয়াড়েরা এখন হিমশিম খাচ্ছেন।

এর অর্থনৈতিক ক্ষতিও প্রচুর। গত মাসে ব্লুমবার্গে প্রকাশিত একটি প্রতিবেদন বলছে, ফুটবলে চোটের কারণে প্রতিবছর ক্ষতি হয় ৫০০ মিলিয়ন পাউন্ড এবং চোটের পরিমাণ আগের মৌসুমের চেয়ে গত মৌসুমে বেড়েছিল ২০ শতাংশ।

আর বিশ্বকাপকেও তারকাদের চোটের মূল্য দিতে হবে। অর্থনৈতিক ক্ষতি বাদ দিলেও এর ফলে মাঠের খেলায় আকর্ষণ কমবে। আর শিরোপাপ্রত্যাশী দেশগুলোর স্বপ্নকেও বড় ধাক্কা দিতে পারে এই চোট।