বিশ্বকাপের আগে ‘বিশ্বকাপ’ জিতল ব্রাজিল
ব্রাজিলের ছেলেদের বাসের ভেতর উদ্দাম নাচ, ঘরের মাঠে মেক্সিকোর মেয়েদের ট্রফি উঁচিয়ে ধরা আর বিশ্বখ্যাত ব্যান্ড দল ‘ইউটু’র সুরের মূর্ছনায় মেক্সিকোয় উৎসবের রং ছড়িয়েই শেষ হলো ‘স্ট্রিট চাইল্ড ওয়ার্ল্ড কাপ’। ফুটবল ও সংগীতের এই মেলবন্ধনে মেক্সিকো সিটি যেন মেতে উঠেছিল দারুণ উৎসবে।
৬ মে শুরু হওয়া এ টুর্নামেন্টের পঞ্চম আসরে বিশ্বের ২০টির বেশি দেশের ২৮টি দলের সুবিধাবঞ্চিত ও পথশিশুরা অংশ নেয়। গত বৃহস্পতিবার মেক্সিকো সিটির উপকণ্ঠ টেক্সকোকোয় টুর্নামেন্টের সেমিফাইনাল ও ফাইনাল অনুষ্ঠিত হয়।
ফাইনালে বাড়তি দ্যুতি ছড়ায় আয়ারল্যান্ডের বিখ্যাত রক ব্যান্ড ‘ইউটু’। ছেলেদের ‘শিল্ড’ ফাইনালের আগে টস করতে মাঠে নেমেছিলেন ব্যান্ডের ড্রামার ল্যারি মুলেন জুনিয়র। আর সাইডলাইনে দাঁড়িয়ে তরুণদের এই লড়াইয়ে তালি দিয়ে উৎসাহ জোগান বোনো, দ্য এজ ও অ্যাডাম ক্লেটনের মতো তারকারা। খেলা চলাকালে ইউটু ব্যান্ডের গায়ক বোনো দর্শকদের তরুণ ফুটবলারদের দিকে মনোযোগ দিতে ইশারাও করেন।
আয়োজনটি নিয়ে বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে ‘স্ট্রিট চাইল্ড ইউনাইটেড’–এর প্রধান নির্বাহী ও সহপ্রতিষ্ঠাতা জন রো বলেন, ‘এটি স্ট্রিট চাইল্ড ওয়ার্ল্ড কাপের পঞ্চম আসর। এর মূল উদ্দেশ্য হলো বিশ্বমঞ্চে এই সুবিধাবঞ্চিত তরুণদের কণ্ঠস্বর তুলে ধরা। নিজেদের পরিচয় নিশ্চিত করা, শিক্ষার অধিকার, সহিংসতা থেকে সুরক্ষা ও লিঙ্গ সমতার মতো দাবিগুলো নিয়ে তারা কথা বলছে।’
জন রো যোগ করেন, ‘বিশ্বকাপের আবহেই আমরা তাদের এই ফুটবল বিশ্বকাপের আমন্ত্রণ জানাই। এর একমাত্র লক্ষ্য বিশ্ব গণমাধ্যমের নজর কাড়া, যাতে এই শিশুরা নিজেদের দাবি আরও জোরালোভাবে তুলে ধরতে পারে এবং বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে থাকা সুবিধাবঞ্চিত পথশিশুদের জীবনে একটি স্থায়ী পরিবর্তন আনা সম্ভব হয়।’
জমকালো ফাইনালে ভারতকে হারিয়ে চ্যাম্পিয়ন হয় ব্রাজিলের ছেলেরা। মেয়েদের বিভাগে কেনিয়াকে হারিয়ে শিরোপা জিতেছে স্বাগতিক মেক্সিকোর মেয়েরা। ‘শিল্ড’ বিভাগে ছেলেদের ট্রফি জিতেছে ইন্দোনেশিয়া ও মেয়েদের ট্রফি জিতেছে ব্রাজিল।
রিও ডি জেনিরো থেকে আসা ব্রাজিলের ১৮ বছর বয়সী অধিনায়ক জোয়াও জেভি এই জয়কে একটি দীর্ঘ যাত্রার সফল সমাপ্তি হিসেবে দেখছেন, ‘প্রথমে আমি সৃষ্টিকর্তাকে ধন্যবাদ জানাতে চাই। মেক্সিকোর মাটিতে এমন অভিজ্ঞতার সাক্ষী হওয়া, বিশেষ করে সতীর্থদের পাশে পাওয়া, সত্যিই জীবনে একবারই আসে। আমরা দীর্ঘ দুই বছর কঠোর অনুশীলন করেছি। স্বপ্নের এই মঞ্চে আসতে পারাটা ভীষণ তৃপ্তির।’
জোয়াও জেভি আরও বলেন, ‘দেশের বাইরে ব্রাজিলের প্রতিনিধিত্ব করার অনুভূতি ভাষায় প্রকাশ করার মতো নয়। আমরা সবাই ভীষণ খুশি। এই শিরোপা জয়ের জন্য আমি সৃষ্টিকর্তার প্রতি কৃতজ্ঞ।’
খেলার মাঠের বাইরেও টুর্নামেন্টের অভিজ্ঞতা নিয়ে কথা বলেছেন খেলোয়াড়েরা। অন্য দেশের খেলোয়াড়দের সঙ্গে পরিচিত হওয়া থেকে শুরু করে পথশিশুদের বিভিন্ন সমস্যা ও সংকট নিয়ে আয়োজিত কর্মশালায় অংশ নেওয়ার অভিজ্ঞতাও নেয় তারা। চেন্নাই থেকে যাওয়া ভারতের মেয়েদের দলের ১৭ বছর বয়সী অধিনায়ক পবিত্র ভেল্লাইয়াঙ্গিরি বলেন, ‘এই বিশ্বকাপে আমার সবচেয়ে ভালো লেগেছে অন্য দেশের খেলোয়াড়দের সঙ্গে মেশার সুযোগ পাওয়া। এ ছাড়া এখানকার আলোকসজ্জার প্রদর্শনীও আমার দারুণ লেগেছে।’
খেলোয়াড়দের উদ্যাপন ও জমকালো এক কনসার্টের মাধ্যমে পর্দা নামে এই টুর্নামেন্টের। যেখানে পারফর্ম করেন মার্কিন র্যাপার ও গায়ক পল রাসেল। এই আয়োজন নিয়ে রাসেল বলেন, ‘ভাবতেই অবাক লাগে যে এই শিশুদের অনেকের জন্যই এটি ছিল প্রথম উড়োজাহাজে চড়ার অভিজ্ঞতা; অনেকের জন্য অন্য কোনো দেশের মানুষের সঙ্গে প্রথম দেখা হওয়া। এটি যেভাবে বিশ্ব সম্পর্কে এবং এই বিশ্বে তাদের নিজেদের অবস্থান সম্পর্কে তাদের দৃষ্টিভঙ্গি বদলে দিচ্ছে, তা সত্যিই দারুণ এক দৃশ্য।’