সাফজয়ীদের সংবর্ধনায় কোচ কক্সের ডাক, ‘২০৩৪ বিশ্বকাপের স্বপ্ন দেখুক বাংলাদেশ’
সাফ অনূর্ধ্ব-২০ চ্যাম্পিয়নশিপে ট্রফি ধরে রাখা বাংলাদেশ অনূর্ধ্ব-২০ ফুটবল দলকে সংবর্ধনা দেওয়া হয়েছে। হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে ছাদখোলা বাসে শোভাযাত্রার মাধ্যমে খেলোয়াড়দের নিয়ে আসা হয় রাজধানীর হাতিরঝিলে। বিমানবন্দর থেকে শুরু হওয়া এই শোভাযাত্রা হাতিরঝিলের অ্যাম্ফিথিয়েটারে এসে শেষ হয়।
বিলম্বিত বরণ
পূর্বঘোষণা অনুযায়ী অনুষ্ঠানটি সন্ধ্যা ৭টা ৩০ মিনিটে শুরু হওয়ার কথা থাকলেও, চ্যাম্পিয়ন দলটি সেখানে পৌঁছায় রাত পৌনে ১০টায়। খেলোয়াড়েরা অনুষ্ঠানস্থলে পৌঁছালে বাফুফে সদস্যরা তাঁদের ফুল দিয়ে উষ্ণ অভ্যর্থনা জানান। চোটের কারণে ক্র্যাচে ভর দিয়ে মঞ্চে আসেন এক খেলোয়াড়, এরপর আসেন সাফের সেরা গোলকিপার ইসমাইল হোসেন মাহিন। একে একে সব খেলোয়াড়কে মঞ্চে ডেকে নেওয়া হয়। ডেকলান সুলিভানের নাম ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গে দর্শকদের উল্লাস কয়েক গুণ বেড়ে যায়। সবার শেষে মঞ্চে আসেন রোনান সুলিভান। উপস্থাপক ট্রফির কথা জিজ্ঞেস করতেই সেটি এনে মঞ্চের সামনে রাখা হয়। এ সময় ‘বাংলাদেশ বাংলাদেশ’ স্লোগান ওঠে।
সংবর্ধনা অনুষ্ঠান ও স্মৃতিচারণা
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন জাতীয় ফুটবল দলের সাবেক অধিনায়ক আমিনুল হক, যিনি বর্তমানে যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী। আমিনুল খেলোয়াড়দের সঙ্গে করমর্দন করেন এবং তাঁদের অভিনন্দন জানান। সাফের ফাইনালে গোলকিপার ইসমাইল হোসেন মাহিনের টাইব্রেকারে একটা শট সেভের কথা বলতে গিয়ে তিনি ফিরে যান ২০০৩ সালে। যখন ঢাকায় সাফ চ্যাম্পিয়নশিপের ফাইনালে মালদ্বীপের বিপক্ষে টাইব্রেকারে তিনিও একটি শট আটকান।
অনুষ্ঠানের শুরুতে জাতীয় সংগীত পরিবেশন করা হয়। এরপর বিশাল পর্দায় বাংলাদেশের সাফ জয়ের রোমাঞ্চকর মুহূর্তগুলো প্রদর্শিত হয়। পরপর দুবার সাফ অনূর্ধ্ব-২০ ফুটবলে চ্যাম্পিয়ন হওয়ার গৌরব অর্জনের পর অধিনায়ক মিঠুকে ফুল দিয়ে বরণ করে নেওয়া হয়। মঞ্চে উপস্থিত ছিলেন বাফুফে সভাপতি তাবিথ আউয়াল। স্পনসর প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিরা তাঁদের বক্তব্যে আশাবাদ ব্যক্ত করেন যে এই দলই বাংলাদেশকে এশিয়ান কাপে নিয়ে যেতে সক্ষম হবে।
১৯৭১ সালে বাংলাদেশ ইতিহাস গড়েছে, এই ছেলেরাও ইতিহাস গড়েছে। আমাদের এখন ২০৩৪ সৌদি আরবের বিশ্বকাপে খেলার স্বপ্ন দেখতে হবে।
কোচের লক্ষ্য ও বিশ্বকাপের স্বপ্ন
আইরিশ কোচ মার্ক কক্স সালাম দিয়ে বক্তব্য শুরু করেন। তিনি বলেন, ‘আসসালামু আলাইকুম। আমার হৃদয়ে বাংলাদেশ। ছেলেরা চেষ্টা না করলে এই ট্রফি আসত না। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশ ইতিহাস গড়েছে, এই ছেলেরাও ইতিহাস গড়েছে। আমাদের এখন ২০৩৪ সৌদি আরবের বিশ্বকাপে খেলার স্বপ্ন দেখতে হবে।’ মালদ্বীপে প্রবাসী বাংলাদেশিদের অবদানের প্রশংসা করে তিনি এই ট্রফি সমর্থকদের উৎসর্গ করেন।
আর্থিক পুরস্কারের ঘোষণা
শামসুল হুদা ফুটবল একাডেমির প্রধান ও বাফুফের সহসভাপতি নাসের শাহরিয়ার জাহেদিকে খেলোয়াড়েরা সম্মান জানান। বাফুফের ডেভেলপমেন্ট কমিটির প্রধান হিসেবে তিনি বলেন, ‘কোচ যেভাবে ২০৩৪ বিশ্বকাপের স্বপ্নের কথা বলেছেন, আমাদের সেভাবেই এগোতে হবে এবং পাইপলাইন তৈরির কাজ করতে হবে।’
নাসের শাহরিয়ার জাহেদি রেডিয়েন্ট ফার্মাসিউটিক্যালসের পক্ষ থেকে ২৩ জন খেলোয়াড়ের প্রত্যেককে ১ লাখ টাকা এবং দলের অন্য সদস্যদের ৫০ হাজার টাকা করে দেওয়ার ঘোষণা দেন, যা আজ রাতেই সবার হাতে পৌঁছানোর কথা। এ ছাড়া সমর্থকদের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে ঢাকা উত্তর সিটির প্রশাসক শফিকুল ইসলাম খান প্রত্যেক খেলোয়াড়কে ৫০ হাজার টাকা করে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেন। যদিও বাফুফে সভাপতি তাবিথ আউয়াল আলাদা কোনো পুরস্কারের ঘোষণা দেননি। এর আগেও হাতিরঝিলে হওয়া মেয়েদের দুটি সংবর্ধনায় কোনো পুরস্কার ঘোষণা করেনি বাফুফে।
সরকারের পক্ষ থেকে বার্তা
যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী আমিনুল হক প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের শুভেচ্ছা পৌঁছে দেন। তিনি বলেন, অর্জিত সাফল্য ধরে রাখা অত্যন্ত কঠিন। ৬ এপ্রিল সরকারের পক্ষ থেকে সাফজয়ী দলকে আনুষ্ঠানিকভাবে পুরস্কৃত করা হবে বলে প্রতিমন্ত্রী ঘোষণা দেন।
অনুষ্ঠানের পরিবেশ ও জনসমাগম
এই সাফল্য উদ্যাপনে জনসাধারণের ব্যাপক অংশগ্রহণের আমন্ত্রণ থাকলেও আমজনতার উপস্থিতি ছিল প্রত্যাশার তুলনায় কম; গ্যালারির তিন ভাগের এক ভাগও পূর্ণ হয়নি। তবে আয়োজন ছিল বেশ জাঁকজমকপূর্ণ। প্রবেশপথে ট্রফি জয়ের বড় বিলবোর্ড ও খেলোয়াড়দের ছবিসংবলিত বোর্ড ছিল। মঞ্চের পেছনে পর্দায় ছেলেদের সাফ জয়ের পাশাপাশি গত জানুয়ারিতে নারী ফুটসাল জয়ের ছবিও দেখানো হয়, যা অনেকের কাছে কিছুটা অসংলগ্ন মনে হয়েছে। মঞ্চের সামনে বড় অক্ষরে লেখা ছিল ‘CHAMPIONS’। অত্যাধুনিক সাউন্ড সিস্টেম এবং ৩৪টি চেয়ারে সজ্জিত আলোকোজ্জ্বল মঞ্চ থেকে ছড়িয়ে পড়া আলোর বিচ্ছুরণ পুরো পরিবেশকে বর্ণিল করে তুলেছিল।
বাফুফে সভাপতি তাবিথ আউয়াল তাঁর বক্তব্যে বলেন, ‘চেষ্টা, দেশপ্রেম আর ঐক্য থাকলে কোনো শক্তিই বাংলাদেশকে পরাজিত করতে পারবে না। আমরা এখন বলতে পারি—উই আর দ্য চ্যাম্পিয়ন। তবে এটাই শেষ নয়, কোচ মার্ক কক্সের কথামতো ২০৩৬ (আসলে হবে ২০৩৪) সালে আমাদের লক্ষ্যে পৌঁছাতে হবে।’