বিশ্বকাপের ম্যাচে ‘হাইড্রেশন ব্রেক’ আসলে কাদের জন্য
ম্যাচের সময় তখন ২৩ মিনিট, হুট করেই রেফারির লম্বা বাঁশি। ম্যাচ থামিয়ে দুই দলই বাধ্য ছেলের মতো হাঁটা ধরল নিজ নিজ ডাগআউটে।
বিশ্বকাপের প্রথম কয়েক ম্যাচে এই দৃশ্য একেবারেই স্বাভাবিক হয়ে ধরা দিয়েছে। দুই অর্ধে দুবার ম্যাচ থামিয়ে দেওয়া হয় পানি খাওয়ার বিরতি। ফিফার আনুষ্ঠানিক ভাষায়, ‘হাইড্রেশন ব্রেক’।
মেক্সিকো-যুক্তরাস্ট্র-কানাডা বিশ্বকাপে অতিরিক্ত গরমে যাতে কোনো খেলোয়াড় অসুস্থ না হয়ে পড়েন, তাই দুই অর্ধের মাঝখানে ছোট্ট একটা বিরতি নিয়ে হাজির হয়েছে ফিফা।
আপাতদৃষ্টিতে হাইড্রেশন ব্রেকের বুদ্ধিটা বেশ জুতসই। কেনই–বা হবে না? বেশির ভাগ ইউরোপিয়ান দলই সাধারণত ম্যাচ খেলে ১০ থেকে ২০ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রার মধ্যে।
পুরো বছর খেলা চললেও গ্রীষ্মকালটা হয়ে থাকে খেলোয়াড়দের জন্য অফুরন্ত এক ছুটির সময়। ইউরোপের উষ্ণ দিনগুলোতে তাই ফুটবলারদের আরাম-আয়েশেই সময় কাটে।
কিন্তু বিশ্বকাপ তো ভিন্ন এক গল্প। পৃথিবীর প্রতিটি প্রান্তে যেমন তাপমাত্রা এক নয়, তেমনি প্রত্যেক খেলোয়াড়ের শারীরিক সক্ষমতাও এক নয়। গ্রীষ্মের কড়া রোদে খেলোয়াড়দের সক্ষমতাও কমে আসে অনেকখানি।
যুক্তরাষ্ট্রে নরওয়ের প্রথম অনুশীলনের দিনই দেখা মিলেছে সেই দৃশ্যের। মাঠে ঠিকমতো অনুশীলনের আগেই হাঁপিয়ে উঠেছিলেন আর্লিং হলান্ড, মার্টিন ওডেগার্ডরা।
হাইড্রেশন ব্রেক হাজির হয়েছিল সেই সমস্যার সমাধান হিসেবে। প্রতি অর্ধে দুই দলকে দেওয়া হবে তিন মিনিটের একটা ছোট্ট বিরতি। আর সেই বিরতিতে সবাই যেমন পানি পান করে একটু জিরিয়ে নিতে পারবে, তেমনি খেলাটা নতুন করে প্রাণও ফিরে পাবে।
ফুটবল মাঠে এমন ‘কুলিং ব্রেক’ বা ‘ড্রিংকস ব্রেক’ নতুন কিছু নয়। ২০১৪ বিশ্বকাপেও দেখা গিয়েছে সেই নিয়ম। কিন্তু সেটা দেওয়া হতো ব্রাজিলের অতিরিক্ত গরম সামলাতে, শুধু দিনের বেলার খেলাগুলোতে। কাতারেও দিনের খেলায় দেখা গিয়েছে কুলিং ব্রেক।
কিন্তু এই বিশ্বকাপে ‘হাইড্রেশন ব্রেক’ একেবারে বাধ্যতামূলক। বিশ্বকাপের প্রতিটি ম্যাচেই দুই অর্ধ মিলিয়ে থাকবে ৩ মিনিট করে বাধ্যতামূলক ৬ মিনিটের বিরতি। সেটা দিনে হোক কিংবা রাতে। মাঠ শীতাতপনিয়ন্ত্রিত হোক কিংবা না হোক, বিরতি থাকবেই।
তবে সে বিরতিতে সবচেয়ে বেশি লাভবান ফুটবলাররা নন, বরং বিজ্ঞাপনদাতারাই হচ্ছে। কারণ, ম্যাচে রেফারির বাঁশি বাজতে দেরি, টিভি সম্প্রচার চলে যায় বিজ্ঞাপনে।
ফুটবল ম্যাচ এমনিতেই বিজ্ঞাপনহীন এক খেলা।
ম্যাচের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত বিজ্ঞাপন দেখানোর সুযোগ একেবারে আসে মাত্র একবার। দুই অর্ধের মাঝখানে খুব একটা সময়ও পাওয়া যায় না, কারণ বিশ্লেষকদের চুলচেরা বিশ্লেষণের অপেক্ষায়ও থাকেন দর্শকেরা।
এই সময়টা নিয়েই অনেকটা সময় ধরে আপত্তি তুলেছিল আমেরিকান ব্রডকাস্টাররা। যেকোনোভাবেই হোক না কেন, ফুটবলকে একধরনের ‘আমেরিকানাইজেশন’-এর মধ্যে দিয়ে নিয়ে যাওয়ার ইচ্ছা ছিল অনেকের। আর সেটাই যেন পূর্ণতা পেয়েছে প্রতি অর্ধে ৩ মিনিটের ‘ছোট্ট’ হাইড্রেশন ব্রেকে।
মার্কিন মুকুলের খেলাগুলোতে বিরতি থাকে অনেক। ৮০ মিনিটের রাগবি ম্যাচ শেষ হয় না সাড়ে তিন ঘণ্টাতেও। বাস্কেটবল, বেসবলেও থাকে বিরতির ছড়াছড়ি। পুরো ম্যাচজুড়ে ব্রডকাস্টাররা চান দর্শকদের সঙ্গে থাকার। কারণ যত বেশি বিরতি, তত বেশি বাড়ে দর্শকদের বিজ্ঞাপন দেখানোর সুযোগ।
এক সুপার বোল ফাইনালে ৩০ সেকেন্ডের বিজ্ঞাপন বিক্রি হয়েছে প্রায় ১০ কোটি টাকায়। সেই পদ্ধতি যদি ফুটবলেও কোনোভাবে প্রবেশ করানো যায়, তাহলে তো অর্থের ছড়াছড়ি। কারণ, আমেরিকান খেলার তুলনায় ফুটবলের দর্শক অনেক গুণ বেশি।
বিশ্বকাপের প্রতিটি ম্যাচকে যদি চার ভাগে ভাগ করা হয়, ১০৪ ম্যাচে ২০৮টি ব্রেক এমনিতেই চলে আসে। গুঞ্জন আছে, এই বিরতির বিজ্ঞাপনের দাম ফাইনাল আসতে আসতে পৌঁছে যাবে কোটির ঘরে। সে জন্যই হয়তো ম্যাচে ছোট্ট করে বিরতি প্রবেশ করানো।
বিজ্ঞাপনদাতাদের চোখে যখন টাকার খেলা, তখন ফুটবল ভক্তদের মনে বিরক্তির শেষ নেই। কারণ, তিন মিনিটের বিরতি বদলে দেয় খেলার রেশ। ব্রাজিল-মরক্কো খেলাতেই যেমন। যেই না মরক্কো এক গোল দিয়ে ম্যাচের মোমেন্টাম হাতে পেয়েছে, অমনি একটা বিরতি বদলে দিল ম্যাচের চিত্র।
ব্রাজিলের দিশাহারা ডিফেন্স যেন পেল গুছিয়ে নেওয়ার সময়। জার্মানি-কুরাসাও ম্যাচেও একই ঘটনা, বিশ্বকাপে প্রথমবার আসা সবচেয়ে ছোট্ট দেশটা প্রথম গোলের উদ্যাপন ঠিকঠাক করতেও পারেনি, টিভিতে দেখা দর্শকদের কাছে পৌঁছে দেওয়া হয়েছে বিজ্ঞাপন। মিনিট দশেকের জন্য যেই না জার্মানির টুটি চেপে ধরেছিল কুরাসাও, সেটাও শেষ হয়ে গিয়েছিল হাইড্রেশন ব্রেকে।
মজার ব্যাপার হলো, বিরতির দৈর্ঘ্য কিন্তু ঘড়িতে মাপা নয়, বরং বিরতি মাপা হয় টিভি ব্রডকাস্টারদের সৌজন্যে। যুক্তরাষ্ট্র-প্যারাগুয়ে ম্যাচেই দেখা মিলেছে সেই দৃশ্যে। হাতে আইপ্যাড নিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন ফক্স স্পোর্টসের কেউ একজন, সঙ্গে চতুর্থ রেফারি। মাঠে রেফারি আর খেলোয়াড়েরা তৈরি থাকলেও ম্যাচ শুরু হয়নি, কারণ টিভিতে তখনো বিজ্ঞাপনের বিরতি!
জার্মানি-কুরাসাও ম্যাচেও জার্মানি মাঠে ফিরেছিল দেড় মিনিটের মাথায়। তাদের চিন্তা তখন ম্যাচে ফেরার। অথচ রেফারি সাফ জানিয়ে দিলেন ৩ মিনিট ৩০ সেকেন্ডের বিরতি শেষ না হলে, ম্যাচ শুরু করার এখতিয়ার নেই তাঁর। হলোই তাই, তিন মিনিট শেষ করে টিভিতে শুরু হলো ম্যাচ। ততক্ষণে কুরাসাও হারিয়ে ফেলেছে পুরোনো ধার। জার্মানি ফিরে এসেছে খেলায়।
জার্মান কোচ ইয়ুর্গেন ক্লপের ব্যাখাটাই বোধ হয় সবচেয়ে মানানসই। ‘খেলোয়াড়দের ভালো থাকার কথা বলে বিজ্ঞাপনদাতাদের জন্য দরজা খুলে দেওয়া হয়েছে। মাঝখান থেকে ফুটবল বন্দী হয়েছে এসি রুমে বসে থাকা কোট-টাই পরা এক্সিকিউটিভদের কাছে।’
যুক্তরাষ্ট্রের কোচ মাউরিসিও পচেত্তিনোর কাছেও এই বিরতি কোনো কাজের বলে মনে হচ্ছে না, ‘যখন তাপমাত্রা অনেক বেশি থাকে, তখন এমন বিরতি মেনে নেওয়া যায়। কিন্তু প্রতি ম্যাচেই তো এমন বিরতির প্রয়োজন নেই।’
নেদারল্যান্ডসের অধিনায়ক ভার্জিল ফন ডাইক বলেছেন, ‘টেলিভিশনে যাঁরা খেলা দেখছেন, সেই নিরপেক্ষ দর্শকদের জন্যও এটা সুখকর কিছু নয়। আমার মতে, প্রতিটি ম্যাচের আবহাওয়া আলাদাভাবে বিবেচনা করে সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত।’
কোচ–খেলোয়াড়েরা তো বটেই, খোদ দর্শকদের কাছেও নেই বিরতির মূল্য। তাই তো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে চলছে ফিফাকে ধুয়ে ফেলার প্রতিযোগিতা। প্রতি ম্যাচেই বিরতি আসে আর দুই দফায় চলে ফিফার নিয়মের দফারফা।
ব্রডকাস্টাররাও তাই বেছে নিচ্ছেন অন্য উপায়। অনেক ইউরোপিয়ান ব্রডকাস্টাররা দেখাচ্ছে না কোনো বিজ্ঞাপন, ক্যামেরা থাকছে মাঠেই। খেলোয়াড়দের সঙ্গে, খেলার সঙ্গে। কারণ, ফুটবল মাঠে মুখ্য দিন শেষে ফুটবলই, ক্যামেরার চোখে ফুটবলারের কারিকুরির মূল্য দর্শকসারিতে হাজারও সেলিব্রিটির মুখ দেখিয়েও পূরণ করা সম্ভব না।
সম্ভব নয় কোটি টাকার বিজ্ঞাপন বিক্রি করেও। সে কারণেই হয়তো ফিফার দর্শক বাড়ানোর ফন্দি থেকে মুখ ফিরিয়ে নেবে সত্যিকারের দর্শক।