১৯ বছর বয়সেই রিয়ালের সবচেয়ে দামি ফুটবলার, দিয়োমান্দের উত্থানের গল্প
বিশ্বকাপের পর ‘আন্ডারডগ’ থেকে আরও একটি তারকার জন্ম হলো।
তিনি ইয়ান দিয়োমান্দে। লাইপজিগ থেকে গতকাল রাতে রিয়াল মাদ্রিদে দলবদল সম্পন্ন হতেই দিয়োমান্দে হয়ে গেলেন ইতিহাসের অংশ—আফ্রিকা ও রিয়ালের সবচেয়ে দামি ফুটবলার! ১৯ বছর বয়সী এই উইঙ্গারের পছন্দের খেলোয়াড় ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো হলেও তুলনা চলছে লিওনেল মেসির সঙ্গে।
লেগানেসের ‘বি’ দল, মূল দল এবং লাইপজিগ ঘুরে দিয়োমান্দে রিয়ালের হলেন মাত্র এক বছরের একটু বেশি সময়ের ব্যবধানে! গ্রীষ্মকালীন দলবদলে মার্ক কুকুরেয়া, বের্নার্দো সিলভা, ইব্রাহিমা কোনোতে, ডেনজেল ডামফ্রিস ও কার্লোস এসপির পর দিয়োমান্দে যোগ দিচ্ছেন নতুন কোচ জোসে মরিনিওর বহরে। দুই মৌসুম বড় কোনো শিরোপা না জেতার পর বার্সেলোনাকে টেক্কা দিতে রিয়ালের শক্তিশালী স্কোয়াড গড়ার পরিকল্পনার অংশই এই দলবদল।
সর্বশেষ বিশ্বকাপ মাতানো আইভরিকোস্ট তারকার জন্য বোনাস ছাড়াই ১০ কোটি ৭০ লাখ পাউন্ড এবং বোনাসসহ সর্বোচ্চ ১২ কোটি পাউন্ড (প্রায় ১৪ কোটি ইউরো) পর্যন্ত খরচ করবে স্প্যানিশ ক্লাবটি। এর ফলে জুড বেলিংহামকে টপকে দিয়োমান্দেই এখন রিয়ালের ইতিহাসে সবচেয়ে দামি ফুটবলার। আফ্রিকার ফুটবলারদের মধ্যেও দিয়োমান্দেই সবচেয়ে দামি।
২০২৩ সালে বরুসিয়া ডর্টমুন্ড থেকে জুড বেলিংহামকে দলে নিতে ৮ কোটি ৮৫ লাখ পাউন্ড খরচ করেছিল রিয়াল। এর পাশাপাশি দিয়োমান্দে আফ্রিকান ফুটবলে ভেঙেছেন ২০১৯ সালে লিল থেকে তাঁরই স্বদেশি নিকোলা পেপেকে ৭ কোটি ২০ লাখ পাউন্ডে আর্সেনালের দলে নেওয়ার রেকর্ড। শুধু তা-ই নয়, কিলিয়ান এমবাপ্পের পর ফুটবল ইতিহাসে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ দলবদল ফিতে ক্লাব বদল করা কিশোর ফুটবলারও এখন দিয়োমান্দে।
রিয়ালে যোগ দেওয়ার আগে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ইনস্টাগ্রামে এক আবেগঘন বার্তায় দিয়োমান্দে বিদায় জানান জার্মান ক্লাব লাইপজিগকে, ‘আমি অসীম কৃতজ্ঞ। মাত্র এক বছর আগে, যখন আমার পেশাদার ক্যারিয়ারে হাতে গোনা কয়েকটি ম্যাচ ছিল, তখন এই ক্লাব আমার ওপর বিশ্বাস রেখেছিল। নিজেদের আস্থা দিয়ে আমাকে ইউরোপের সর্বোচ্চ পর্যায়ে নিজেকে প্রমাণের সুযোগ করে দিয়েছিল।’
রিয়ালে যোগ দেওয়াকে শৈশবের স্বপ্নপূরণ বলেও উল্লেখ করেন দিয়োমান্দে, ‘রিয়াল মাদ্রিদে সই করে ছোটবেলার স্বপ্ন পূরণ হলো। চুক্তি থাকার পরও ক্লাব যেভাবে আমার এই স্বপ্ন পূরণে সহযোগিতা করেছে, তার জন্য আমি কৃতজ্ঞ।’
২০০৬ সালের ১৪ নভেম্বর আইভরিকোস্টের আবিদজানে জন্ম দিয়োমান্দের। ছোটবেলা থেকেই খেলতেন এএফআই সুদ কোমোয়ে একাডেমিতে। ২০২২ সালে ঘানায় অনূর্ধ্ব–১৭ টুর্নামেন্টে পাঁচ গোল করে নজর কাড়েন আফ্রিকার বিভিন্ন স্কাউটের।
রাশিয়ার একটি একাডেমি তাঁকে নিতে চাইলেও সেই প্রস্তাব আটকে দেন তাঁর অভিভাবকতুল্য মেন্টর দেজ বাম্বা। পরে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক মাল্টি-ক্লাব প্রতিষ্ঠান ব্লু ক্রো স্পোর্টস তাঁকে নিজেদের প্রকল্পে যুক্ত করে। প্রথমে দুবাইয়ের ব্লু ক্রো একাডেমি, পরে যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডার ডেটোনা বিচে ডিএমই একাডেমিতে পাঠানো হয় তাঁকে। সেখানে ফুটবলের পাশাপাশি পড়াশোনারও সুযোগ পেয়েছেন দিয়োমান্দে।
সেই সময় থেকেই তাঁর প্রতি আগ্রহ দেখায় বোর্নমাউথ, রেঞ্জার্স, ক্রিস্টাল প্যালেস ও চেলসির মতো ক্লাব। কয়েকটি ক্লাব বড় অঙ্কের অর্থ দিতেও প্রস্তুত ছিল। কিন্তু প্রতিনিধিদের আর্থিক দাবির কারণে কোনো চুক্তিই হয়নি।
২০২৩ সালে যুক্তরাষ্ট্রে ভিসার মেয়াদ শেষ হয়ে যাওয়ায় তাঁকে আইভরিকোস্টে ফিরে যেতে হয়। পরবর্তী ভিসা পাওয়ার আগপর্যন্ত মাঠের বাইরে কাটে প্রায় এক বছর। এই সময় তাঁকে ঘিরে শুরু হয় প্রতিনিধিত্ব নিয়ে টানাপোড়েন। ব্লু ক্রোর অজান্তে অন্য একটি পক্ষ তাঁকে গ্রিসের অলিম্পিয়াকোসে নেওয়ার চেষ্টা করে। শেষ পর্যন্ত ব্লু ক্রোর প্রতিনিধিরা হস্তক্ষেপ করে সেই দলবদল ঠেকান। এরপর দিয়োমান্দে লেগানেসের সঙ্গে প্রাক্-চুক্তি করেন। এর মধ্যেই নেমে আসে সবচেয়ে বড় ব্যক্তিগত ট্র্যাজেডি।
১৮তম জন্মদিনের ঠিক এক সপ্তাহ আগে দিয়োমান্দে জানতে পারেন, তাঁর ছোট বোন রোকসান হাসপাতালে মৃত্যুর সঙ্গে লড়ছেন। কিছুক্ষণ পরই আসে সেই মর্মান্তিক খবর, যা তাঁর জীবন বদলে দেয়। একটি পার্টিতে রোকসানের পানীয়তে কেউ বিষাক্ত কিছু মিশিয়ে দিয়েছিল। এরপর আর জ্ঞান ফেরেনি তাঁর। মাত্র ১৫ বছর বয়সেই মারা যান রোকসান।
বিশ্বকাপের আগে ‘দ্য প্লেয়ার্স ট্রিবিউন’-এ প্রকাশিত এক খোলাচিঠিতে বোনকে নিয়ে হৃদয়বিদারক স্মৃতিচারণা করেন দিয়োমান্দে, ‘আমি ফোন ধরতেই কেউ ঘুরিয়ে-পেঁচিয়ে কিছু বলেনি। শুধু বলেছে, “তোমার বোন আর নেই। একটা পার্টিতে কেউ ওর পানীয়তে কিছু মিশিয়ে দিয়েছিল। এরপর আর জেগে ওঠেনি।”’
ছোটবেলার স্মৃতিও উঠে এসেছে তাঁর লেখায়, ‘কেউ আমাকে নকল ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের জার্সি কিনে দিয়েছিল? আমি পেছনে কালো মার্কার দিয়ে লিখেছিলাম “রোনালদো ৭”। মনে আছে, প্রথমবার সত্যিকারের ফুটবল বুট পেয়ে আমি সেটা পরে ঘুমিয়েছিলাম?’
দিয়োমান্দের বিশ্বাস, সবচেয়ে কঠিন সময়ে তাঁর ওপর সবচেয়ে বেশি আস্থা ছিল রোকসানেরই। প্রয়াত বোনকে উদ্দেশ্য করে লিখেছেন, ‘সবাই সন্দেহ করলেও তুমি কখনো বিশ্বাস হারাওনি। তুমি সব সময় বলতে, আমি একদিন ক্রিস্টিয়ানো রোনালদোর চেয়েও ভালো ফুটবলার হব। যদি কোনো দিন তাঁর সঙ্গে দেখা হয়, তোমার হয়ে সালাম জানাব। আমি তোমার সেই ভবিষ্যদ্বাণী সত্যি করার চেষ্টা করব। না পারা পর্যন্ত থামব না।’
২০২৫ সালে মার্চের শেষ দিকে আন্তর্জাতিক বিরতির সময় লেগানেসের রিজার্ভ দলের সঙ্গে অনুশীলন করছিলেন দিয়োমান্দে। সে সময় লেগানেস কোচ বোর্হা হিমেনেস তাঁকে প্রথম দেখেন। তিনি বলেছেন, ‘রিজার্ভ দলের বিপক্ষে একটি প্রীতি ম্যাচ ছিল। বল পেলেই একজনকে কাটিয়ে যাচ্ছিল। আবার বল পাচ্ছিল, আবার একই কাজ করছিল। প্রথম দলের বিপক্ষে খেলেও একটুও ভয় পায়নি। আমি তখনই বলেছিলাম, আগামীকাল থেকেই সে আমাদের সঙ্গে অনুশীলন করবে।’
মাত্র তিন দিনের মধ্যে দিয়োমান্দের অভিষেক হয়ে যায় লা লিগায়। প্রতিপক্ষ ছিল রিয়াল মাদ্রিদ। বার্নাব্যুতে ম্যাচ শেষে তিনি জার্সি বদল করেন কিলিয়ান এমবাপ্পের সঙ্গে। মার্চ থেকে মে—এ অল্প সময়েই লা লিগায় ১০ ম্যাচ খেলেন দিয়োমান্দে। বার্সেলোনার বিপক্ষেও শুরুর একাদশে ছিলেন। লেগানেস অবনমিত হলেও দিয়োমান্দে সবার নজর কাড়েন।
সেভিয়ার বিপক্ষে যোগ করা সময়ে জয়ের সুযোগ নষ্ট করেছিলেন তিনি। সেই গোল হলে হয়তো লেগানেস টিকে যেত। তবে হিমেনেস তাঁর পাশে দাঁড়িয়েছিলেন, ‘অনেকে শুধু বলে, সে গোলটা মিস করেছে। কিন্তু আমি বলি, সেই বল পর্যন্ত পৌঁছাতে পারত একমাত্র ইয়ানই। ইয়ান না থাকলে ওই সুযোগই তৈরি হতো না।’
লেগানেস অবনমিত হওয়ার পর তাঁকে দলে নিতে আগ্রহ দেখায় ৪০টির বেশি ক্লাব। মোনাকোর সঙ্গে আলোচনা অনেক দূর এগোলেও শেষ পর্যন্ত ২ কোটি ইউরোর রিলিজ ক্লজ পরিশোধ করে তাঁকে দলে নেয় লাইপজিগ। মাত্র এক মৌসুমেই সেই সিদ্ধান্ত সঠিক প্রমাণ করেন দিয়োমান্দে।
২০২৫–২৬ মৌসুমে বুন্দেসলিগায় ১২ গোল ও ৮ অ্যাসিস্ট করেন। মোট ২০ গোলে সরাসরি অবদান রাখেন। ১৭টি বড় গোলের সুযোগ তৈরি করেন। ২১৪ বার ড্রিবলের চেষ্টা করে সফল হন ৫৫.১ শতাংশ ক্ষেত্রে, যা পুরো লিগে সর্বোচ্চ। মৌসুম শেষে জেতেন বুন্দেসলিগার বর্ষসেরা নবাগত খেলোয়াড়ের পুরস্কার।
ক্লাবের পারফরম্যান্সের সুবাদে জায়গা করে নেন আইভরিকোস্টের বিশ্বকাপ দলে। ইকুয়েডরের বিপক্ষে উদ্বোধনী ম্যাচেই শুরুর একাদশে নেমে ম্যাচসেরা হন। ১৯ বছর ২১২ দিন বয়সে আইভরিকোস্টের ইতিহাসে বিশ্বকাপে সবচেয়ে কম বয়সী ফুটবলার হিসেবে মাঠে নামেন। এরপর কুরাসাওয়ের বিপক্ষে একটি গোলে সহায়তা করে বিশ্বকাপে দেশের সর্বকনিষ্ঠ অ্যাসিস্টদাতার রেকর্ডও গড়েন। বিশ্বকাপে তাঁর নৈপুণ্যই ইউরোপের বড় ক্লাবগুলোর আগ্রহ আরও বাড়িয়ে দেয়।
দিয়োমান্দেকে দলে নিতে আগ্রহী ছিল লিভারপুল ও পিএসজিও। লিভারপুল সরে দাঁড়ানোর পর পিএসজিই ছিল সবচেয়ে এগিয়ে। দিয়োমান্দের নিজেরও পছন্দ ছিল ফরাসি ক্লাবটি। কিন্তু রিয়াল মাদ্রিদ আলোচনায় নামতেই বদলে যায় পরিস্থিতি।
যদিও দলবদল সহজ ছিল না। দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির পাশাপাশি তাঁর প্রতিনিধিত্ব ও ইমেজ রাইটস নিয়ে চলমান দুটি আইনি বিরোধ নিয়েও কিছু ক্লাবের উদ্বেগ ছিল। তবে রিয়াল দ্রুত আলোচনায় অগ্রগতি এনে শেষ পর্যন্ত তাঁকে দলে ভিড়িয়েছে।
লাইপজিগে মূলত ডান উইংয়ে খেললেও বিশ্বকাপে বাম দিকেও খেলেছেন দিয়োমান্দে। তবে রিয়ালের সবচেয়ে বড় প্রয়োজন ছিল ডান উইংয়েই। রদ্রিগো সেখানে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন না। গত মার্চে এসিএল চোটে পড়ার পর এখনো ফেরেননি। ফ্রাঙ্কো মাস্তানতুয়োনো ও ব্রাহিম দিয়াজও জায়গাটি নিজের করে নিতে পারেননি। প্রাক্-মৌসুমে মরিনিও ৪-২-৩-১ ছকে দল সাজাচ্ছেন। ধারণা করা হচ্ছে, কিলিয়ান এমবাপ্পে ও ভিনিসিয়ুস জুনিয়রের সঙ্গে আক্রমণভাগের ডান পাশে নিয়মিত দেখা যাবে দিয়োমান্দেকে।
মাত্র এক বছরের মধ্যে অচেনা এক কিশোর থেকে ইউরোপের সবচেয়ে দামি তরুণ ফুটবলারদের একজন হয়ে ওঠার গল্প যেন রূপকথাকেও হার মানায়। ছোটবেলায় যে বোন সবার আগে বিশ্বাস করেছিলেন, তাঁর ভাই একদিন বিশ্বের সেরা হবে—রিয়াল মাদ্রিদের জার্সি গায়ে সেই স্বপ্ন পূরণের পথেই এখন হাঁটছেন দিয়োমান্দে।