এক্সপ্লেইনার: বিশ্বকাপ কি তবে বিক্রির মুখে, সামনে কী ঘটতে যাচ্ছে
বিশ্বকাপসহ নিজেদের বড় টুর্নামেন্ট পরিচালনার লক্ষ্যে ২০০০ কোটি ডলারের একটি নতুন সহযোগী প্রতিষ্ঠান গঠনের পরিকল্পনার কথা গত মঙ্গলবার ঘোষণা করে ফিফা। নতুন প্রতিষ্ঠানটির সর্বোচ্চ ২০ শতাংশ শেয়ার বিদেশি ও বেসরকারি বিনিয়োগকারীদের কাছে বিক্রির প্রস্তাবও দেওয়া হবে। ফিফার এই পদক্ষেপে তীব্র প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে ইউরোপিয়ান ফুটবলের নিয়ন্ত্রক সংস্থা উয়েফা। ফুটবলের নিয়ন্ত্রক সংস্থা ফিফাকে ফুটবলের ‘আত্মা’ বিক্রি করে দেওয়ার অভিযোগে অভিযুক্ত করেছে উয়েফা।
যুক্তরাষ্ট্রের ব্যাংক জেপি মরগান এ প্রকল্পে ফিফার প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে কাজ করছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের জামাতা জ্যারেড কুশনারের ভাই জশুয়া কুশনারের বিনিয়োগকারী প্রতিষ্ঠান ‘থ্রাইভ ইটারনাল’ এফএফইর ‘প্রস্তাবিত এই বিনিয়োগকারী দলের নেতৃত্ব দেবে বলে ধারণা করা হচ্ছে’।
এসবের মাঝে প্রশ্ন উঠেছে, ফিফা কি তবে বিশ্বকাপ বেচে দিচ্ছে? ফিফার এই পরিকল্পনার পেছনের গল্প ও সামনে যা ঘটতে যাচ্ছে—সেসব বিষয় ব্যাখ্যা করেছে ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম ‘দ্য গার্ডিয়ান।’
কী করতে যাচ্ছে ফিফা
বিশ্বকাপ শেষ হওয়ার এক সপ্তাহ পেরিয়ে গেছে। ফাইনালে মাঠে সহিংসতার জন্য আর্জেন্টিনার বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হবে কি না, সে বিষয়ে এখনো কিছু জানায়নি ফিফা। তবে এর মাঝেই বিশ্ব ফুটবল পরিচালনার সম্পূর্ণ নতুন এক রূপরেখা তৈরি করে ফেলেছে সংস্থাটি। ফিফা সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনোর ভাষায়, এটি মূলত ‘বিশ্বজুড়ে ফুটবলের গণতান্ত্রিকীকরণেরই এক প্রয়াস’।
তবে এর আড়ালে লুকিয়ে থাকা আসল পরিকল্পনা হলো,বেসরকারি বিনিয়োগকারীদের ফিফার বিভিন্ন প্রতিযোগিতায় শেয়ার কেনার সুযোগ দেওয়া, যাতে তারা সম্ভাব্য উপায়ে বিশ্বকাপ থেকেও মুনাফা তুলে নিতে পারে।
পরিকল্পনাটি কীভাবে কাজ করবে
গত মঙ্গলবার বিকেলে দ্য টাইমস ও ফিন্যান্সিয়াল টাইমসে খবরটি প্রকাশিত হওয়ার পর ফিফা একটি দীর্ঘ বিবৃতি দিয়ে তাদের এই নতুন উদ্যোগের ভূয়সী প্রশংসা করে। ‘ফিফা ফরওয়ার্ড এন্টারপ্রাইজ’ বা এফএফই নামে পরিচিত হতে যাওয়া এই নতুন সংস্থা ফিফার সম্প্রচার স্বত্ব, স্পনসরশিপ, টিকিট এবং লাইসেন্সিংসহ সব ধরনের বাণিজ্যিক অধিকার বিক্রি করবে। সেই সঙ্গে ফিফার বিভিন্ন টুর্নামেন্ট ‘পরিচালনা ও বাস্তবায়নের’ দায়িত্বও থাকবে তাদের হাতে।
ফিফার সব ধরনের আয়-রোজগারের প্রচেষ্টা এক ছাতার নিচে নিয়ে আসবে এই নতুন প্রতিষ্ঠান। সর্বোচ্চ সংস্থা হিসেবে ফিফা ‘এফএফইর একক নিয়ন্ত্রণ নিজের কাছেই রাখবে’। পাশাপাশি ‘স্বল্প শেয়ারের অ-নিয়ন্ত্রণকারী বিনিয়োগকারী হিসেবে তৃতীয় পক্ষকে যোগ দেওয়ার আহ্বান জানানো হবে।’
ফিফার ভাষ্যমতে, এই বিনিয়োগকারীদের নির্বাচন করা হবে সুনির্দিষ্ট দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা, পরিচালনা ব্যবস্থা ও কৌশলগত মানদণ্ডের ভিত্তিতে।
ফিফা কি ফুটবলকে অন্যের হাতে তুলে দিচ্ছে
পুরোটা নয়। কেবল সামান্য অংশ, যাতে কোনো ‘নিয়ন্ত্রণ ক্ষমতা’ থাকবে না। কিন্তু মূল প্রশ্ন হলো—খেলাটা আসলে কার?
ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম ‘দ্য টাইমস’কে ফিফা নিশ্চিত করেছে, নতুন প্রতিষ্ঠান এফএফইর শেয়ার কেনার দৌড়ে মূল বিনিয়োগকারী হিসেবে যাঁর নাম আসছে, তিনি ডোনাল্ড ট্রাম্পের জামাতা জ্যারেড কুশনারের ভাই জশুয়া কুশনার।
গত সোমবার ইনস্টাগ্রামে ১৫ স্লাইডের এক পোস্টে ফিফা সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনো জোর দিয়ে বলেছেন, বিশ্বের সবচেয়ে দারুণ আসরটি উপহার দিতে ফিফাই ‘সামনে থেকে নেতৃত্ব দিয়েছে, কঠোর পরিশ্রম করেছে এবং সফলভাবে আয়োজন সম্পন্ন করেছে।’
ফিফার সদস্য সংস্থাগুলোর মতামত কী
‘দ্য গার্ডিয়ান’কে সূত্রগুলো জানিয়েছে, এফএফইর পরিকল্পনা অনুযায়ী বিনিয়োগকারীরা এই প্রকল্প থেকে কোনো লভ্যাংশ তুলতে পারবেন না। তবে পরবর্তী সময়ে তাঁরা নিজেদের শেয়ার বিক্রির সুযোগ পাবেন। ফিফা পুরো বিষয়টি প্রচার করছে তাদের সদস্য অ্যাসোসিয়েশনগুলোর আর্থিক লাভের দিককে সামনে টেনে এনে।
ফিফা প্রতিশ্রুতি দিয়েছে যে বাইরের এই বিনিয়োগ এলে যেকোনো সদস্যদেশ চাইলে ‘ঐচ্ছিক’ হিসেবে অতিরিক্ত ২ কোটি ডলার তহবিল পেতে পারে। এর পাশাপাশি বার্ষিক বরাদ্দের পরিমাণ বাড়ানোরও আশ্বাস দেওয়া হয়েছে এবং তাদের হিসাব অনুযায়ী, সময়ের পরিক্রমায় সব মিলিয়ে অতিরিক্ত ১ হাজার কোটি ডলার বণ্টন করা হবে।
ফিফা আরও জানিয়েছে, বহিরাগত বিনিয়োগের অনুমতি পেতে হলে তাদের সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্যদেশগুলোকে এই অতিরিক্ত তহবিল নেওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করতে হবে। বাস্তবতা হলো, অনেক দেশ নিজেদের ফুটবল কার্যক্রম চালাতে পুরোপুরি ফিফার ওপর নির্ভরশীল। চলতি বছরই ইনফান্তিনো মন্তব্য করেছিলেন, ফিফা না থাকলে ‘বিশ্বের ১৫০টি দেশে ফুটবল বলে কিছুই থাকত না’। ফলে এই প্রক্রিয়ায় প্রয়োজনীয় সায় বা সম্মতি পাওয়া তাঁর জন্য খুব একটা কঠিন হবে না বলেই মনে হচ্ছে।
ইনফান্তিনোর এমন উদ্যোগ কি প্রথম
২০১৮ সালে ক্লাব বিশ্বকাপ নতুন করে সাজাতে জাপানি বিনিয়োগকারী প্রতিষ্ঠান সফটব্যাংকের সঙ্গে এক বিশাল চুক্তির কথা ঘোষণা করেছিলেন জিয়ান্নি ইনফান্তিনো। তবে চরম সমালোচনার মুখে পরবর্তী সময়ে সেই উদ্যোগ ভেস্তে যায়।
‘দ্য টাইমস’–এর প্রতিবেদনে ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে, ফিফা ছাড়ার পর ইনফান্তিনো নিজেই নতুন গঠিত এই এফএফইর প্রধান নির্বাহী (সিইও) হতে পারেন। আগামী বছর টানা চতুর্থ মেয়াদে ফিফা সভাপতি নির্বাচনের দৌড়েও তিনি প্রস্তুত। নির্বাচিত হলে তাঁর মেয়াদকাল ২০৩১ সাল পর্যন্ত বাড়বে।
এখন কী হবে
‘দ্য গার্ডিয়ান’ জানিয়েছে, বিশ্বকাপ শুরুর বহু আগেই এফএফই চালুর পরিকল্পনা করা হয়েছে। তবে এ খবর প্রকাশের পর বিস্মিত হয়েছেন অনেকেই। ফিফার মূল নীতিনির্ধারণী পর্ষদ ‘ফিফা কাউন্সিলে’র সদস্যরাও এ পরিকল্পনার বিষয়টি জানতেন না এবং এর রূপরেখা তৈরির কোনো প্রক্রিয়াতেই তাঁদের রাখা হয়নি।
অন্যদিকে এক মাসের ব্যবধানে দ্বিতীয়বারের মতো কঠোর বিবৃতি জারি করে সতর্ক বার্তা দিয়েছে উয়েফা। তাদের মতে, এটি এমন এক সীমারেখা অতিক্রম, যেখান থেকে ফেরা কঠিন।
সামনে হয়তো অসন্তোষের মাত্রা আরও বাড়বে এবং কোন প্রক্রিয়ায় এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া হলো—তা নিয়ে জোর প্রশ্ন উঠবে। তবে ফুটবল–সংশ্লিষ্ট অংশীদারদের কেউ শেষ পর্যন্ত এই পরিকল্পনা থামাতে বাস্তবে কোনো কঠোর পদক্ষেপ নেবেন কি না, তা এখনো অনিশ্চিত।