গার্দিওলা কি নতুন মাস্টারপিস আঁকবেন, নাকি থামবে তুলির আঁচড়

প্রথম আলো গ্রাফিকস

অবশেষে কি একটা চক্র পূরণ হলো পেপ গার্দিওলার? নাকি এটা কোনো নতুন চক্রের শুরু?

আট বছর আগে, ২০১৮ সালে কারাবাও কাপের ফাইনালে ম্যানচেস্টার সিটি যখন আর্সেনালকে হারিয়েছিল, সেটা ছিল এক অর্থে পেপ গার্দিওলার রাজত্বের শুরু। গত রোববার ওয়েম্বলিতে সেই একই প্রতিপক্ষকে হারিয়ে এই টুর্নামেন্টে পঞ্চমবারের মতো ট্রফি জেতেন গার্দিওলা। এই প্রতিযোগিতার ইতিহাসে সবচেয়ে বেশিবার শিরোপাজয়ী কোচও এখন গার্দিওলা। ইংলিশ ফুটবলে তাঁর আধিপত্যের দশকটার এ যেন এক মানানসই সমাপ্তি।

আসলেই কি সিটিতে শেষের একেবারে কাছে চলে এসেছেন গার্দিওলা?  কারাবাও কাপ বা লিগ কাপ হয়তো এই ম্যান সিটির জন্য মৌসুমের সম্ভাব্য চার ট্রফির মধ্যে গুরুত্বের বিচারে চার নম্বরে। কিন্তু রোববারের ওই জয় শুধু একটা ধাতব পাত্র জেতা নয়, এ যেন সজোরে দেওয়া এক হুঙ্কারও।

গার্দিওলা নিজেই যাদের ‘ইংল্যান্ডের সেরা দল, হয়তো ইউরোপেরও’ বলে মেনে নিয়েছেন, সেই আর্সেনালকে যেভাবে উড়িয়ে দিয়েছে তাঁর শিষ্যরা, তাতে একটা বার্তা পরিষ্কার—সিটি এখনো ফুরিয়ে যায়নি, গার্দিওলা নিজেও ফুরিয়ে যাননি।

পেপ গার্দিওলা। এখনো ফুরিয়ে যাননি
এএফপি

মৌসুম এখনো শেষ হয়নি। লিগ শিরোপার লড়াইয়ে আর্সেনালকে ধাওয়া করার স্বপ্ন আছে, এফএ কাপও আছে হাতের নাগালে। কিন্তু ওই দুই টুর্নামেন্টে যা-ই ঘটুক, কারাবাও কাপ জেতার মুহূর্তটা গার্দিওলার স্মৃতিতে হয়তো একটা আলাদা জায়গা নিয়ে থাকবে। কীভাবে তাঁর সাবেক শিষ্য মিকেল আরতেতাকে কৌশলে ঘায়েল করলেন, কীভাবে নিকো ও’রাইলি, যে ছেলেটিকে মাত্র ১৭ বছর বয়সে মূল দলের অনুশীলনে ডেকেছিলেন তিনি—মাত্র চার মিনিটের মধ্যে দুই হেডে গানারদের ম্যাচ থেকে ছিটকে দিল!

অনেকে বলছেন, বিদায় বলার এটাই তো সেরা সময়, চুক্তির এক বছর আগেই মাথা উঁচু করে সরে দাঁড়ানো। কিন্তু এই তরুণ দলটা যা দেখিয়েছে, তার পর কি সত্যিই গার্দিওলার চলে যাওয়া উচিত?

আরও পড়ুন

ম্যাচ শেষে গার্দিওলা নিজেই টেনে আনলেন ২০১৮ সালের সেই ম্যাচের স্মৃতি। আর্সেন ওয়েঙ্গারের আর্সেনালকে ৩-০ গোলে উড়িয়ে দেওয়া সেই ম্যাচ। বললেন, ‘দশ বছর আগের মতো লাগছে।’

কিন্তু দুটো ফাইনালের প্রেক্ষাপট এক নয়। ২০১৮ সালের সেই ম্যাচের সময় সিটি লিগে ১০০ পয়েন্টের দিকে ছুটছিল। আর আর্সেনাল তখন ওয়েঙ্গার-যুগের শেষনিশ্বাস ছাড়ছে। সেই সময় প্রিমিয়ার লিগে দুই দলের ম্যাচে এমিরেটসের গ্যালারিই ভরেনি।

এখন চিত্রটা উল্টো। আর্সেনাল শিরোপার সবচেয়ে কাছে। একটি ম্যাচ বেশি খেলেও সিটির চেয়ে ৯ পয়েন্ট এগিয়ে। চ্যাম্পিয়নস লিগের কোয়ার্টার ফাইনালে যাওয়ার পথও মসৃণ, এফএ কাপেও তাঁরা উঠেছে শেষ আটে।

কারাবাও কাপ জিতে ভীষণ উচ্ছ্বাস দেখান গার্দিওলা
এএফপি

কারাবাও কাপের ফাইনালের আগে সিটির অবস্থা বেশ খারাপ ছিল। নটিংহাম ফরেস্ট ও ওয়েস্ট হামের সঙ্গে ড্র, রিয়াল মাদ্রিদের কাছে পরপর দুই হারে চ্যাম্পিয়নস লিগ থেকেও ছিটকে পড়ে সিটি। সেখান থেকে কারাবাও কাপের ফাইনালে এমন দাপট!

গার্দিওলা নিজেই বললেন, ‘এই জয়ের পক্ষে কেউ এক পাউন্ড বাজিও ধরেনি, এমনকি আমিও না। আর্সেনাল এখন সেরা, এতে কোনো সন্দেহ নেই। তাই চ্যালেঞ্জটা ছিল সত্যিকারের কঠিন। ছেলেদের বলেছিলাম, আজ দেখব আমরা আসলে কতটা ভালো।’

তবে এই মৌসুমে সিটির কিছু ফল আগেও এই তরুণ দলটার সামর্থ্যের পক্ষে কথা বলেছিল। ১৯৩৭ সালের পর এই প্রথম এক মৌসুমে লিভারপুলকে দুবার হারিয়েছে তারা। সেপ্টেম্বরে শেষ মুহূর্তে গ্যাব্রিয়েল মার্তিনেল্লির গোল না করলে এমিরেটস থেকে জয় নিয়েই ফিরত সিটি। ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডকে ঘরে একেবারে ধুলায় মিশিয়ে দিয়েছিল তাঁরা।

বার্নাব্যুতেও জিতেছে, যদিও সেটা চ্যাম্পিয়নস লিগের গ্রুপ পর্বে। কিন্তু সেটা ইতিহাসে টিকবে না। বরং এই মাসেই শেষ ষোলো প্রথম লেগে সেখানে ৩-০ গোলে হারাটা থাকবে—গার্দিওলার অহংকারের মূল্য চুকানোর প্রমাণ হিসেবে। ৮০ হাজার মাদ্রিদ-সমর্থকের সামনে ‘আমরা চাইলেই পারি’ প্রমাণ করতে গিয়ে বুমেরাং হয়েছে তাঁর কৌশল।

চ্যাম্পিয়নস লিগে রিয়ালের কাছে হারে বিদায় নিতে হয়েছে সিটিকে। শেষ ষোলো ফিরতি লেগে হারের পর গার্দিওলা
এএফপি

তবে আরেকটি মৌসুম পেলে সেই স্মৃতিও মুছে দিতে পারবেন গার্দিওলা। চ্যাম্পিয়নস লিগে দশবারের চেষ্টায় একটি শিরোপা—এ পরিসংখ্যানটা হয়তো তাঁর মনে খোঁচা দেয়। সেটা একটু ভালো করার চেষ্টা তো করাই যায়।

২০২৪ সালের মে মাসে সিটি সর্বশেষ প্রিমিয়ার লিগ জেতার পর মূল দলের ১১ জন খেলোয়াড় বদলে গেছেন। জ্যাক গ্রিলিশ, কেভিন ডি ব্রুইনা, কাইল ওয়াকারের মতো সিনিয়রেরা বিদায় নিয়েছেন। এসেছেন নতুন ১২ জন। জানুয়ারিতে তাড়াহুড়া করে যে কেনাকাটা হয়েছিল, সেটাতে একটু বেসামাল মনে হয়েছিল দলটাকে। কিন্তু সাম্প্রতিক কালে সেই দলটাই ভারসাম্যে ফিরেছে। মার্ক গুয়েহি আর আন্তোয়ান সেমেনিও সিটিতে যোগ দেওয়ার আগেই প্রিমিয়ার লিগে নিজেদের প্রমাণ করেছেন। মানিয়েও নিয়েছেন অনায়াসে।

আরও পড়ুন

গুয়েহিকে অবশ্য কারাবাও কাপের ফাইনালে বসে থাকতে হয়েছে—এর আগে অন্য দলের হয়ে কাপে খেলেছেন বলে মাঠে নামতে পারেননি। নতুন মুখদের মধ্যে সেরা খুসানভ দ্রুতই সিটি সমর্থকদের পছন্দের তালিকায় চলে এসেছেন। তাঁর গতি আর মনোবল দেখলে বোঝা যায়, কেন।

সামনে আরও পরিবর্তন অপেক্ষা করছে। জুনে চুক্তি শেষ হবে বের্নার্দো সিলভা ও জন স্টোনসের। স্টোনস গার্দিওলার সঙ্গে একই গ্রীষ্মে সিটিতে যোগ দিয়েছিলেন ২০১৬ সালে। গত তিন মৌসুম বলা যায় চোটেই কেটেছে তাঁর। কার্যত গুয়েহি-খুসানভ তাঁর জায়গা নিয়ে নিয়েছেন। ইওস্কো গাভার্দিওলের মধ্যমাঠ থেকে সেন্ট্রাল ডিফেন্সে ফেরাও শূন্যস্থান পূরণে সাহায্য করছে। তবে সিলভার অভাব পূরণ করা কঠিন হবে।

সমালোচকদের ভুল প্রমাণ করে এই মৌসুমে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তগুলোতে অসাধারণ খেলেছেন তিনি।

পেপ গার্দিওলা ও বের্নার্দো সিলভা
রয়টার্স

এই কঠিন পালাবদলের প্রক্রিয়াটা গার্দিওলা নিজেই শুরু করেছিলেন,  গুন্দোয়ান, ডি ব্রুইনাকে বিদায় জানানোর মতো কঠিন সিদ্ধান্ত নিয়ে। এখন কাজটা কি অন্য কাউকে দিয়ে শেষ করাবেন তিনি?

রোববারের উদ্‌যাপন দেখে বোঝা গেল, গার্দিওলার ভেতরে আগুনটা নিভে যায়নি। বিজ্ঞাপনী বোর্ডে লাথি মারলেন, হলুদ কার্ড পেলেন, বিন্দুমাত্র অনুশোচনা নেই। চিৎকার করলেন, ‘আরেকটা হলুদ কার্ড দাও, তবু উদ্‌যাপন করব। আমি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নই। আমি মানুষ। আর জিতলে আমি উদ্‌যাপন করবই।’

আসলে এত কিছু জিতেও শীর্ষ পর্যায়ের ম্যাচ জেতার উত্তেজনা গার্দিওলাকে এখনো রোমাঞ্চিত করে। বিশেষত, যখন দল দুর্দান্ত খেলে।

ট্রফির নেশা তাঁর কোনো দিনই লুকানো ছিল না। ২০২১ সালে প্রিমিয়ার লিগ ফিরে পাওয়ার পর বলেছিলেন, ‘এটা এত আনন্দের, এত নেশা লাগানো। নেশা লাগে, তারপর কেন থামব? কেন আরও ভালো করার চেষ্টা করব না? যখন মনে হবে যথেষ্ট হয়েছে, আনন্দ নেই—তখনই বলব বিদায়। কিন্তু যতক্ষণ খেলোয়াড়রা এগিয়ে যেতে চায়, কেন আমি আবার চেষ্টা করব না?’

গত বছর, ক্যারিয়ারের সবচেয়ে খারাপ মৌসুম কাটানোর পর গার্দিওলা খোলামেলা বলেছিলেন, কীভাবে সেটা তাঁর ব্যক্তিজীবনে ছাপ ফেলেছিল, ‘হারলে কষ্ট পেতে চাই। ঘুম না হোক। পরিস্থিতি খারাপ হলে তা যেন আমাকে প্রভাবিত করে। এটা চাই আমি। রেগে থাকি। খাবারও স্বাদহীন লাগে। বেশি খেতেও পারি না; কারণ, ওই রাগটা অনুভব করতে চাই। যদি না করি, তাহলে মানেটা কী? জয়-পরাজয়... এই পৃথিবীতে আমরা বিভিন্ন অভিজ্ঞতা, বিভিন্ন অনুভূতির জন্যই তো আছি।’

ফুটবলই গার্দিওলার জীবনের ধ্যানজ্ঞান
রয়টার্স

ফুটবলের প্রতি এই নেশায় তাঁর বিবাহিত জীবনও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সেটা ঠিক রাখতে সময় পেলেই বার্সেলোনায় ফিরে যান। এ মৌসুমে মাঝেমধ্যে সংবাদ সম্মেলনও এড়িয়ে গেছেন। কিন্তু এখন বাড়ির টানটা আগের মতো জোরালো নেই। ছেলেমেয়েরা বড় হয়েছে, তাঁরা নিজেরাই ছুটে যায় বাবাকে দেখতে। ওয়েম্বলিতে কারাবাও কাপের ফাইনালে তাঁর বড় মেয়ে মারিয়াও ছিল গ্যালারিতে।

আর যতক্ষণ ম্যানচেস্টারে থাকেন, গার্দিওলা ডুবে থাকেন ফুটবল নিয়ে। ওটাই তাঁর শিল্প। ইতিহাদের তরুণ এই খেলোয়াড়দের নিয়ে দলটা আবার নতুন করে গড়তে শুরু করেছেন। যেন এক শিল্পী নতুন এক মাস্টারপিস আঁকতে শুরু করেছেন মাত্র। ক্যানভাসে রঙের আঁচড় পড়তে শুরু করেছে।

গার্দিওলা কি এখনই তুলি নামিয়ে রাখবেন?