ভবিষ্যদ্বাণী খুবই সহজ, যদি হয় বিশ্বকাপ নিয়ে
ফুটবল এক অদ্ভুত খেলা। প্রখর যুক্তিবাদী মানুষও এই খেলার পাকে-চক্রে দ্বিচারী হয়ে পড়েন। কীভাবে, সেটাই বলছি।
এর প্রস্তুতি নেওয়া হয় বিজ্ঞানসম্মতভাবে। মানে, শারীরিক কলাকৌশল, দক্ষতা, ফিটনেস—সবকিছুর মধ্যে সায়েন্স, যুক্তি ও বাস্তবতার ছিটেফোঁটা থাকে। কিন্তু পছন্দের দলের ক্ষেত্রে যুক্তি, বিজ্ঞান কিংবা বাস্তবতা নয়, কথা বলে মন। মনে হয়, সমস্ত বাস্তবতা গোল্লায় যাক, মন আমার ফড়িং হয়ে পদ্মপাতায় বসে পছন্দের দলের সঙ্গে পিরিত করে মরুক রে, পিরিত করে মরুক!
সেই পিরিত জ্বাল দেওয়া দুধের ওপর পুরু সর পড়ার মতো ঘন হয়ে ওঠে বিশ্বকাপে। মানবজাতির একটা বড় অংশ তখন সব যুক্তি ও বিবেচনাবোধের ঊর্ধ্বে। পছন্দের দল চোয়ালের জোরে চ্যাম্পিয়ন হয় বিশ্বকাপের বাঁশি বাজার আগেই। অথচ এই মানবজাতিরই এক প্রতিনিধি (মার্ক টোয়েন) বলে গেছেন, ‘ভবিষ্যদ্বাণী করা অত্যন্ত কঠিন—বিশেষ করে যখন তা ভবিষ্যৎ নিয়ে হয়।’
তবে বিশ্বকাপ আলাদা ব্যাপার। তখন মানুষের অবস্থা দেখলে মার্কিন লেখক হয়তো কথাটা ঘুরিয়ে বলতেন, ‘ভবিষ্যদ্বাণী করা খুবই সহজ—বিশেষ করে যখন তা বিশ্বকাপ নিয়ে হয়।’ এই যুগে জন্মালে হয়তো একটু যোগও করতেন, ‘বিশ্বকাপে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ঘরে (অ্যাকাউন্টে) ঘরে নস্ত্রাদামুসের জন্ম হয়।’ কিংবা প্রখর যুক্তিবাদী ফুটবলবোদ্ধাও বিশ্বকাপে ভরসা রাখেন জ্যোতির্বিদ্যায়। কেন?
মানুষ যতই বোঝাক, সে যুক্তিনির্ভর ও বিজ্ঞানভিত্তিক সত্তা, সেসব আসলে বুজরুকি। জীবনে চরম আবেগের মুহূর্তে অজানা বিশ্বাসে সে দৈবকেও আঁকড়ে ধরে। আর শাস্ত্রে আছে, পশুপাখি প্রাকৃতিক দুর্যোগ সবার আগে টের পায়। কিন্তু শাস্ত্রে যেটা বলা হয়নি, প্রাকৃতিক দুর্যোগের বাইরেও কিছু পশুপাখি জ্যোতিষী হয়ে ওঠে; এই যেমন ধরুন ইউরো কিংবা বিশ্বকাপে।
‘নেলি’ নামে এক জার্মান হাতি আছে উত্তর জার্মানির সেরেনগেতি পার্কে। ফুলটাইম খাইদাইয়ের পাশাপাশি পার্টটাইমার ‘সাইকিক’। ২০০৬ ও ২০১০ বিশ্বকাপ এবং ২০১২ ইউরো মিলিয়ে মোট ৩৩ ম্যাচের ৩০টিতেই সঠিক ভবিষ্যদ্বাণী করেছিল। তবে ভূপৃষ্ঠের প্রাণী বলেই সম্ভবত নেলি মানবসমাজে ‘ওরাকল’ শিরোমণি হিসেবে অধিষ্ঠিত হতে পারেনি। কারণ, বাস্তুতন্ত্রে দুটি প্রজাতিই শীর্ষস্তরের খাদক। হ্যাঁ, ‘সারভাইভাল অব দ্য ফিটেস্ট’ নিয়মে মানুষই এগিয়ে। এই এগিয়ে থাকা আর হিংসা থেকেই হয়তো নেলি মানবসমাজে অতটা পাত্তা পায়নি। আর হিংসার ব্যাপারটি ধরতে না পারলে নিজেকে মানুষ হিসেবে দাবি করা অর্থহীন। অক্টোপাস পল সেখানে ব্যতিক্রম। রীতিমতো কিংবদন্তি!
সে ছিল সাগরচারী প্রাণীদের প্রতিনিধি। আটপায়া। ঠিকানা ছিল জার্মানির ওবেরহাউসেন সেন্টারের সি লাইফের এক কাচের জার। হ্যাঁ, ওটা ভূপৃষ্ঠের ওপরই ছিল কিন্তু বুকে হাত দিয়ে বলুন তো, হাতি দু-একবার ফুটবলে লাথি মারার সুযোগ পেলেও অক্টোপাস ও ফুটবলের মধ্যে দূরত্ব উত্তর মেরু এবং দক্ষিণ মেরু নয় কি!
সেই অক্টোপাস পলের নিখুঁত সব লক্ষ্যভেদে মানুষের চোয়াল বিস্ময়ে যেমন ঝুলেছে, তেমন হিংসায়ও হয়তো লুচির মতো ফুলেছে।
আসলে সভ্যতার গতিপথ নির্ধারক মানুষের অধীন (বাস্তু) তন্ত্রে তৃতীয় স্তরের বাসিন্দা শামুক-ঝিনুকের জাতভাই অষ্টভুজ পল ২০১০ বিশ্বকাপে জ্যোতিষকুলের মানসম্মান একদম মেরে দিয়েছিল। বিশ্বকাপে জার্মানির সাত ম্যাচের সব কটিই ঠিকঠাক ভবিষ্যদ্বাণী, এর সঙ্গে ফাইনালে স্পেনকে বিজয়ী ঘোষণা ছিল পলের পক্ষ থেকে মানবকুলের জন্য বোনাস। অন্য অর্থে, নিচু স্তরের খাদকদের ছোট করে দেখার প্রতিশোধবার্তা—আমরাও পারি।
২০১০ বিশ্বকাপ ও ২০০৮ ইউরো মিলিয়ে একটি অক্টোপাস যদি ১৪ ম্যাচের ১২টিতেই সঠিক ভবিষ্যদ্বাণী করে বসে, তখন মানুষ হালকা ভয় পাবেই।
যাক সেসব কথা। চার বছর আগে কাতার বিশ্বকাপে ‘ক্যামিলা’ নামের উট, তাইয়ো নামের সেই উদ, এমনকি নাম না–জানা এক ইঁদুরও ভবিষ্যদ্বাণীর কাজে নেমে পড়ে দু-একবার সফল হয়। কিন্তু কেউ-ই পলের মতো তারকাখ্যাতি পায়নি। ওহ, গল্পে গল্পে মানুষের ভয়টা কিসের, সেটাই বলা হয়নি। সেটা আসলে তার অস্তিত্বের সংকটের ভয়।
দেখুন, মানুষ ঈর্ষাপরায়ণ প্রাণী। প্রতিবেশীর উন্নতিতেও তার জ্বলে। সেখানে অন্য প্রাণিকুলের কেউ তার হাজার বছরের বিদ্যায় ওস্তাদি ফলাবে, সে কেন তা সইবে? মানুষ তাই অন্য পথ ধরল।
ঘরে ঘরে ইন্টারনেটও তত দিনে সহজলভ্য। একে একে সামনে চলে এল ফেসবুক, টুইটার (এখন এক্স) ও ইনস্টাগ্রাম। খেলা নিয়ে যা খুশি তা–ই বলা ও লেখা যায়। কিংবদন্তি জ্যোতিষী নস্ত্রাদামুস হয়ে উঠতে তাই নস্ত্রাদামুসের মতো জ্যোতির্বিদ্যা শেখার আর দরকার পড়ল না। কিন্তু কিছু অসাধারণ মানুষ ঠেকিয়ে দিলেন প্রাণিকুলের সামনে স্বজাতির অস্তিত্বের সংকট।
জার্মান অর্থনীতিবিদ জোয়াকিম ক্লেমেন্ত তাঁদের একজন। ভদ্রলোক গণনার এক সূত্র আবিষ্কার করলেন, যার মাধ্যমে সর্বশেষ তিন বিশ্বকাপেই চ্যাম্পিয়নের একদম সঠিক ভবিষ্যদ্বাণী করা গেল। কিন্তু সবাই ক্লেমেন্ত নন। কেউ কেউ রবার্তো মার্তিনেজ।
৫২ বছর বয়সী এ স্প্যানিশ ভদ্রলোকের কোচিংয়ে অভিজ্ঞতা ১৯ বছরের। পর্তুগালকে জিতিয়েছেন নেশনস লিগ এবং তাদেরই কোচ। এমন একজন ব্যক্তি যদি ২০২৬ বিশ্বকাপ সামনে রেখে বলেন, ‘ভাবতে ভালো লাগে ২০১৬ ইউরো জিতেছি আমরা (পর্তুগাল), ইউসেবিও ’৬৬ বিশ্বকাপে সর্বোচ্চ গোলদাতা, ’৬৫-তে জিতেছেন ব্যালন ডি’অর, আর সেই বিশ্বকাপের পর ৬০ বছর কেটে এখন ২০২৬। সবকিছুতেই “৬” আছে। তাই (এবার) স্বপ্ন দেখাই যায়।’
কী বুঝলেন? বিশ্বকাপ আসলে জগতের প্রাণিকুলকেই কমবেশি পাল্টে দেয়।