মাছ ধরার শহরে গিয়ে যেভাবে জালে আটকে পড়ল সিটি
চ্যাম্পিয়নস লিগের ইতিহাসে অন্যতম বড় অঘটনের সাক্ষী হলো ম্যানচেস্টার সিটি। গতকাল রাতে নরওয়ের পুঁচকে ক্লাব বোডো/গ্লিমটের কাছে ৩–১ গোলে হেরে গেছে ইউরোপের এই ধনকুবের দলটি। বিব্রতকর এই হারে দ্বিতীয়ার্ধে রদ্রির লাল কার্ড দেখা সিটির বিপর্যয়ের মাত্রাকে যেন আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। ম্যাচে প্রায় আধা ঘণ্টা ১০ জন নিয়ে খেলতে হয়েছে সিটিকে।
সিটিকে যেতে হয়েছিল ৫৫ হাজার জনগোষ্ঠীর বোডো শহরে, যেটা মূলত মাছ ধরার শহর হিসেবে বিখ্যাত। প্রতীকী অর্থে বোডোর ফেলা জালেই যেন আটকাল সিটি। বোডো শহরটি নরওয়ের রাজধানী অসলো থেকে প্রায় এক হাজার কিলোমিটারের বেশি দূরে। মাইনাস ৯ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রায় সিটির হারের সাক্ষী হয়ে রইল এ শহর। চ্যাম্পিয়নস লিগ অভিষেক মৌসুমেই সেখানকার ছোটখাটো এক ক্লাব সিটির মতো ‘বিগ ফিশ’ ধরে ফেলবে, তা জানত কে!
মাইনাস তাপমাত্রায় ২০২৩ সালের ইউরোপসেরা সিটি যেন পুরোপুরি জমে যায়। তবে বোডোর সাফল্য আকস্মিক কিছু নয়। এর আগে গত মৌসুমে ইউরোপা লিগের সেমিফাইনালে খেলেছিল তারা। পাশাপাশি চ্যাম্পিয়নস লিগের এবার অভিষেকেই বরুশিয়া ডর্টমুন্ড ও টটেনহামের বিপক্ষে করেছে ড্র। সিটি প্রতিপক্ষের এই সতর্কবার্তা আমলে নেয়নি।
ম্যাচে ২২ ও ২৪ মিনিটে কাছ থেকে দুটি গোল করেন বোডোর কাসপার হোগ। সিটির বিপক্ষে চ্যাম্পিয়নস লিগে এত দ্রুত দুই গোল করার কীর্তি এর আগে শেষবার দেখা গিয়েছিল ২০১৯ সালে এপ্রিল মাসে। সন হিউং-মিন মাত্র ১০ মিনিটের মধ্যে দুটি গোল করেছিলেন। বিরতির পর ৫৮ মিনিটে জেন্স হাউগের গোলে ব্যবধান ৩–০ করে বোডো।
৬০ মিনিটে রায়ান শেরকি এক গোল শোধ করলেও তা শুধুই ব্যবধান কমিয়েছে। উল্টো ৬২ মিনিটে রদ্রির লাল কার্ড সিটির ম্যাচে ফেরার পথ আরও বন্ধ করে দেয়। ম্যাচে রদ্রির প্রথম ও দ্বিতীয় হলুদ কার্ডের ব্যবধান ছিল মাত্র ৫৪ সেকেন্ড। চ্যাম্পিয়নস লিগে কোনো ইংলিশ ক্লাবের খেলোয়াড়ের এত দ্রুত লাল কার্ড দেখার ঘটনা ২০০৫ সালের সেপ্টেম্বরের পর প্রথম। সেবার ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের হয়ে ভিয়ারিয়ালের বিপক্ষে ওয়েন রুনি ৪ সেকেন্ডের মধ্যে দুটি কার্ড দেখেছিলেন।
সিটি চাইলে হারের পেছনে আবহাওয়া, একাধিক গুরুত্বপূর্ণ খেলোয়াড়ের অনুপস্থিতি কিংবা কৃত্রিম ঘাসের মাঠকে অজুহাত হিসেবে দাঁড় করাতে পারে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, তারা পুরো ম্যাচেই প্রতিপক্ষের কাছে স্পষ্টভাবে বিধ্বস্ত হয়েছে, যা মূলত প্রিমিয়ার লিগে ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের বিপক্ষে ডার্বিতে হারার ধারাবাহিকতা। প্রিমিয়ার লিগে শেষ চার ম্যাচেও জয়হীন সিটি।
নিজের জন্মভূমি নরওয়ের মাটিতে এই ম্যাচ সিটি তারকা আর্লিং হলান্ডের জন্য বিশেষ কিছু ছিল। কিন্তু এমন ম্যাচে হলান্ড ছিলেন একেবারেই নিষ্প্রভ। আগামী ২৮ জানুয়ারি গালাতাসারায়ের বিপক্ষে ঘরের মাঠে সিটির শেষ গ্রুপ ম্যাচ। শেষ ষোলোয় সরাসরি উঠতে তাদের শীর্ষ আটে থাকা নিশ্চিত করতে হবে। হেরেও অবশ্য ৭ ম্যাচে ১৩ পয়েন্ট নিয়ে টেবিলের ৭ নম্বরে সিটি। তবে আজ রাতে অন্য ম্যাচের পর এই অবস্থান বদলে যেতে পারে।
এই ম্যাচে তিন গোলের লিড নিয়ে অভিজাত একটি ক্লাবে নাম লিখিয়েছে বোডো। তাদের আগে ৫টি দল চ্যাম্পিয়নস লিগে সিটির বিপক্ষে ৩ গোলের লিড নিয়েছিল। সেই দলগুলো হলো বায়ার্ন মিউনিখ (অক্টোবর ২০১৩), বার্সেলোনা (অক্টোবর ২০১৬), লিভারপুল (এপ্রিল ২০১৮)), স্পোর্টিং লিসবন (নভেম্বর ২০২৪) এবং রিয়াল মাদ্রিদ (ফেব্রুয়ারি ২০২৫)।
সব প্রতিযোগিতা মিলিয়ে শেষ সাত ম্যাচে ম্যানচেস্টার সিটি জিতেছে মাত্র দুটি। এর একটি জয় এসেছে আবার এফএ কাপে তৃতীয় স্তরের দল এক্সেটার সিটির বিপক্ষে। ম্যাচ শেষে সিটি কোচ পেপ গার্দিওলা বলেন, ‘আজকের ম্যাচটা আমাদের জন্য দারুণ একটা সুযোগ ছিল। কিন্তু বাস্তবতা হলো, সবকিছুই যেন আমাদের বিপক্ষে যাচ্ছে, ছোট ছোট অনেক বিষয় আমাদের এখন সেসব বদলানোর চেষ্টা করতে হবে। খেলোয়াড়েরা মাঠে ছিল, আমরাও চেষ্টা করেছি।’
পিএসজিও অঘটনের শিকার:
একই রাতে অঘটনের শিকার হয়েছে বর্তমান চ্যাম্পিয়ন পিএসজি। স্পোর্তিং লিসবনের মাঠে ২–১ গোলে হেরে গেছে লুইস এনরিকের দল। ম্যাচটিতে গোলের জন্য দর্শকদের অপেক্ষা করতে হয়েছে ৭৪ মিনিট পর্যন্ত। লুইস সুয়ারেজের গোলে এগিয়ে যায় লিসবন।
৭৯ মিনিটে পিএসজিকে সমতায় ফেরান খিচা কাভারস্কেইয়া। তবে ৯০ মিনিটে সুয়ারেজ নিজের ও দলের দ্বিতীয় গোল করে জয় নিশ্চিত করেন। এই হারের পরও অবশ্য ৭ ম্যাচে ১৩ পয়েন্ট নিয়ে তালিকায় পঞ্চম পিএসজি।