কান্নার ভাষায় আনন্দ লিখলেন ভোজিনিয়া
স্পেন–কেপ ভার্দের ম্যাচের পরপরই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হয়েছে ২০০১ সালে মুক্তি পাওয়া হংকংয়ের বিখ্যাত ‘শাওলিন সকার’ সিনেমার একটি দৃশ্য—যেখানে প্রতিপক্ষের নেওয়া একের পর এক শট ঠেকিয়ে যাচ্ছেন গোলরক্ষক। আগুনের গোলার মতো আসা বলটি গোলকিপারের শরীর রক্তাক্ত করলেও তাঁকে একটুও টলাতে পারেনি।
চলচ্চিত্রের এই দৃশ্যের সঙ্গে জুড়ে দেওয়া হয়েছে কেপ ভার্দের গোলরক্ষকের ছবি। স্পেনের বিপক্ষে কেপ ভার্দে গোলরক্ষক ভোজিনিয়ার পারফরম্যান্স যাঁরা দেখেছেন, তাঁদের কাছে এই কোলাজ মোটেই বাড়াবাড়ি মনে হওয়ার কথা নয়। বরং চলচ্চিত্রের নাটকীয়তাকেও যেন ছাড়িয়ে গেছে ভোজিনিয়ার একেকটি বিস্ময়কর সেভ!
বিশ্বকাপের অন্যতম ফেবারিট স্পেনের বিপক্ষে গোলপোস্টে ভোজিনিয়া একাই তুলে দিয়েছিলেন চীনের প্রাচীর। একটু ভুল হলো, কেপ ভার্দের প্রাচীর। এককথায় অবিশ্বাস্য!
বলা হয়, গোলকিপাররা যেদিকে হেঁটে যান, সেদিকে ঘাস ওঠে না। এমনকি ম্যাচে হারের দায়ও বেশির ভাগ সময় বর্তায় গোলকিপারের কাঁধে। কিন্তু ভোজিনিয়া আজ পোস্টের নিচে গোলকিপারদের জয়গান গেয়েছেন। শুধু ঘাস নয়, ফুলও ফুটিয়েছেন।
৪০ পেরোনো অখ্যাত এই গোলরক্ষকের সামনে স্পেনের তারকাপুঞ্জের আলো নিভে যায়। ম্যাচজুড়ে অন্তত সাতটি নিশ্চিত গোল সেভ করেন। এ ছাড়া অসংখ্যবার দুর্দান্ত পজিশনিংয়ের কারণে একটি পিন ঢোকানোর মতো জায়গাও ছাড়েননি স্পেনের আক্রমণভাগের জন্য।
ভোজিনিয়ার একক প্রাচীর ভাঙতেই একপর্যায়ে বর্তমান সময়ের অন্যতম সেরা তারকা লামিনে ইয়ামালকে মাঠে নামান স্পেন কোচ দে লা ফুয়েন্তে। নয়তো এই ম্যাচে খেলার কথাই ছিল না তাঁর। কিন্তু ১৮ বছর বয়সী ইয়ামালকেও নিজের সামনে ‘পুঁচকে’ শিশু বানিয়ে রেখেছেন ভোজিনিয়া। অবশ্য বয়স বিবেচনা করলে ইয়ামাল ভোজিনিয়ার সামনে শিশুই।
কেপ ভার্দের বিপক্ষে বদলি নামার সময় ইয়ামালের বয়স ছিল ১৮ বছর ৩৪২ দিন। আর ভোজিনিয়ার বয়স ৪০ বছর ২২ দিন। ভোজিনিয়া ও ইয়ামালের মধ্যে বয়সের ব্যবধান ২১ বছর ৪৫ দিন! বিশ্বকাপের ইতিহাসে ম্যাচে দুই প্রতিপক্ষ খেলোয়াড়ের মধ্যে এটাই সবচেয়ে বেশি বয়সের ব্যবধান। ওহ, ভোজিনিয়া কিন্তু ইয়ামালের বাবারও দুই বছরের বড়!
১৯৬৬ বিশ্বকাপের পর থেকে এখন পর্যন্ত ৪০ বা এর বেশি বয়সী গোলরক্ষক এক ম্যাচে মাত্র একবারই ভোজিনিয়ার চেয়ে বেশি সেভ করতে পেরেছেন। ১৯৮৬ বিশ্বকাপে নিজের ৪১তম জন্মদিনে ব্রাজিলের বিপক্ষে উত্তর আয়ারল্যান্ডের হয়ে ১০টি সেভ করেছিলেন প্যাট জেনিংস।
সাতটি সেভ ছাড়াও এ ম্যাচে ৬৯ শতাংশ সঠিক পাস (৪২টির মধ্যে ২৯টি) দিয়েছেন ভোজিনিয়া। অন্যান্য পরিসংখ্যানের মধ্যে নিখুঁত লং বল দিয়েছেন ৪৩ শতাংশ, ডাইভিং সেভ ৩টি এবং বক্সের ভেতর সেভ করেছেন ৬টি।
অবিশ্বাস্য এই পারফরম্যান্সের পর ম্যাচ শেষে কেঁদেছেন ভোজিনিয়া। তাঁকে নিয়ে সাবেক স্কটিশ উইঙ্গার ও বিবিসির ফুটবল বিশ্লেষক প্যাট নেভিন লিখেছেন, ‘পুরো ম্যাচেই আলো ছড়িয়েছেন ভোজিনিয়া। ৪০ বছর বয়সে দাঁড়িয়ে মাঠে যা দেখালেন, তা এককথায় অবিশ্বাস্য, দুর্দান্ত! ম্যাচ শেষে স্টেডিয়ামের প্রতিটি ক্যামেরার চোখ এখন তাঁর দিকেই। সতীর্থ খেলোয়াড়দের সবাই আঙুল উঁচিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছেন দলের এই আসল নায়ককে। ফুটবল মাঠে সত্যিই এটি এক দারুণ আবেগঘন ও দৃষ্টিনন্দন মুহূর্ত।’
সাবেক ইংলিশ ডিফেন্ডার লি ডিক্সন লিখেছেন, ‘সত্যিই কিছুটা আবেগপ্রবণ হয়ে পড়েছি। এটা এককথায় অবিশ্বাস্য, দুর্দান্ত এক পারফরম্যান্স! এই একটি পয়েন্ট তাদের (কেপ ভার্দে) প্রাপ্য ছিল, যেকোনো কিছুর চেয়েও বেশি। আর স্পেন? তারা তো মনে হয় এক পয়েন্ট পাওয়ারও যোগ্য ছিল না। আজকের রাতটা শুধুই কেপ ভার্দের। ভোজিনিয়া কাঁদছেন—তা দেখে তো আমার নিজেরই প্রায় কান্না চলে আসছে।’
ভোজিনিয়ার কান্নায় ভিজেছেন ফুটবলপ্রেমীরা। এই ম্যাচের আগে ইনস্টাগ্রামে তাঁর অনুসারী ছিল ৪৫ হাজার। ম্যাচের পর সেটা ১০ লাখ পেরিয়ে গেছে!
ভোজিনিয়ার এই কান্না তাই আনন্দের। এই কান্না গোলিয়াথের বিপক্ষে ডেভিডের জয়ের। আন্ডারডগদের এমন গল্প তো আর প্রতিদিন লেখা হয় না। ভোজিনিয়া আসলে কান্নার ভাষায় লিখেছেন আনন্দের ইতিহাস।