বিশ্বকাপ শেষ, চুক্তিও শেষ: ফিফা থেকে টাকা পায়নি যুক্তরাষ্ট্রের ১১ আয়োজক শহর
২০২৬ ফুটবল বিশ্বকাপ আয়োজনের জন্য বড় অঙ্কের ব্যয় বহন করলেও প্রতিশ্রুত অর্থ এখনো পায়নি যুক্তরাষ্ট্রের ১১টি আয়োজক শহর। এ কারণে ফিফার কাছে বারবার অর্থ পরিশোধের বিষয়ে জানতে চাইছে তারা।
২০২৫ সালে যুক্তরাষ্ট্রে অনুষ্ঠিত ক্লাব বিশ্বকাপের আগে ফিফা সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনো ঘোষণা দিয়েছিলেন, ম্যাচ আয়োজনকারী ১১টি শহরের প্রতিটিকে ১০ লাখ ডলার করে দেওয়া হবে। তিনি এটিকে ‘লিগ্যাসি কনট্রিবিউশন’ বা উত্তরাধিকার তহবিল হিসেবে উল্লেখ করেছিলেন। এই অর্থ ছোট ফুটবল মাঠ নির্মাণ ও বিভিন্ন সামাজিক প্রকল্পে ব্যয় করার কথা ছিল।
এরপর ২০২৬ বিশ্বকাপের আয়োজক শহরগুলো জানতে চায়, আরও বড় পরিসরে বিশ্বকাপ আয়োজনের জন্য তারাও একই পরিমাণ অর্থ পাবে কি না। যুক্তরাষ্ট্রের চারটি আয়োজক শহরের কমিটির শীর্ষ কর্মকর্তার দাবি, ফিফার ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা একাধিক বৈঠকে মৌখিকভাবে একই পরিমাণ অর্থ দেওয়ার আশ্বাস দিয়েছিলেন। তবে এ বিষয়ে ফিফা কখনো প্রকাশ্যে কোনো ঘোষণা দেয়নি, আর এখন পর্যন্ত সেই অর্থও পরিশোধ করা হয়নি।
বিশ্বকাপের যুক্তরাষ্ট্রের আয়োজক শহরগুলো হলো সিয়াটল, সান ফ্রান্সিসকো বে এরিয়া, লস অ্যাঞ্জেলেস, ডালাস, হিউস্টন, কানসাস সিটি, আটলান্টা, ফিলাডেলফিয়া, নিউইয়র্ক/নিউ জার্সি, মায়ামি ও বোস্টন।
প্রতিশ্রুত অর্থ না পাওয়ায় আয়োজক শহরগুলোর কিছু কমিটি সমস্যায় পড়েছে। বিশ্বকাপ শেষ হওয়ার পর কয়েকটি কমিটি তাদের কার্যক্রম গুটিয়ে নিচ্ছে। ফলে এই অর্থ এলে কোন সংস্থার মাধ্যমে তা ব্যবস্থাপনা করা হবে, সেটি নিয়েও অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। আবার অনেক শহর স্থানীয় কর্তৃপক্ষের কাছে আর্থিক প্রতিবেদন প্রস্তুত করছে, কিন্তু অর্থটি আদৌ পাওয়া যাবে কি না, তা নিশ্চিত না হওয়ায় হিসাব চূড়ান্ত করতে পারছে না। এ বিষয়ে ক্রীড়াভিত্তিক পোর্টাল ‘দ্য অ্যাথলেটিক’ যোগাযোগ করলে মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে ফিফা।
দুই আয়োজক শহরের কর্মকর্তার প্রশ্ন, ২০২৩ থেকে ২০২৬ সাল পর্যন্ত চার বছরের আর্থিক চক্রে ১৫ বিলিয়ন ডলারের বেশি আয় করা একটি সংস্থা কেন এত সামান্য অর্থ পরিশোধে গড়িমসি করছে। বিশেষ করে, বিশ্বকাপের পরিচালন বাজেটই ছিল প্রায় ২৭০ কোটি ডলার।
এই বিতর্ক এমন এক সময়ে সামনে এল, যখন বিশ্বকাপের বাণিজ্যিক স্বত্বের একটি অংশ বেসরকারি বিনিয়োগকারীদের কাছে বিক্রির পরিকল্পনা ভেস্তে গেছে। আর এরপর ফিফা সভাপতি ইনফান্তিনো ইউরোপীয় ফুটবল সংস্থা উয়েফাসহ বিভিন্ন মহল থেকে তীব্র চাপের মুখে রয়েছেন।
২০২৬ বিশ্বকাপ আয়োজনের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় ও অঙ্গরাজ্য সরকার নিরাপত্তা, পরিবহন, অবকাঠামো, লজিস্টিকস ও পরিচালনাসহ বিভিন্ন খাতে কয়েক বিলিয়ন ডলার ব্যয় করেছে। এর পাশাপাশি ছিল বেসরকারি অনুদানও।
বিশ্বকাপের আয়োজক হওয়ার জন্য মিসৌরি অঙ্গরাজ্য কানসাস সিটিকে নির্বাচিত করতে বিশ্বকাপের টিকিটের ওপর অঙ্গরাজ্য ও স্থানীয় বিক্রয়কর মওকুফ করেছিল। টুর্নামেন্টের আগের এক বিশ্লেষণ অনুযায়ী, এতে অন্তত ১ কোটি ৫৬ লাখ ডলার কর আদায় থেকে বিরত থাকতে হয়েছে, যদিও আতিথেয়তা খাতের আয় এতে ধরা হয়নি।
বিশ্বকাপ আয়োজক শহরগুলোর দায়িত্বের মধ্যে ছিল ফিফা মনোনীত ভিআইপিদের জন্য বিশেষ ট্র্যাফিক লেন ও পুলিশি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, স্টেডিয়াম থেকে ফিফাবহির্ভূত সব ধরনের বিজ্ঞাপন সরিয়ে ‘ক্লিন স্টেডিয়াম’ তৈরি করা এবং নিউইয়র্কের মেটলাইফ স্টেডিয়ামের মাঠ বিশ্বকাপ ফাইনালের উপযোগী করতে অতিরিক্ত ১ কোটি ৩০ লাখ ডলার ব্যয় করা।
বিশ্বকাপ আয়োজনের আগে থেকেই ব্যয়ভার নিয়ে ফিফা ও আয়োজক শহরগুলোর মধ্যে আলোচনা চলছিল। তবে ফিফার দাবি ছিল, পর্যটন ও বিভিন্ন আয়োজনের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতিতে প্রায় ৩০৫০ কোটি ডলার যোগ হবে।
বিশ্বকাপের টিকিট বিক্রি, সম্প্রচারস্বত্ব, স্পনসরশিপ, স্টেডিয়ামের বিভিন্ন বিক্রি ও পার্কিং থেকে আয়ের বেশির ভাগই পেয়েছে ফিফা। অন্যদিকে পরিবহন, নিরাপত্তা, ফিফা ফ্যান ফেস্ট, বিমানবন্দর এবং টুর্নামেন্ট-সংশ্লিষ্ট যানবাহনের ব্যয়ের বড় অংশ বহন করেছে আয়োজক শহরগুলো।
উদাহরণ হিসেবে কানসাস সিটির আয়োজক কমিটি জানিয়েছে, তারা মিসৌরি অঙ্গরাজ্য থেকে ৪ কোটি ২৫ লাখ, কানসাস অঙ্গরাজ্য থেকে ২ কোটি ৮০ লাখ, কানসাস সিটি কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে ১ কোটি ৪৮ লাখ এবং অন্যান্য সরকারি উৎস থেকে আরও ১৫ লাখ ডলার পেয়েছে। সব মিলিয়ে সরকারি বিনিয়োগ হয়েছে ৮ কোটি ৬৮ লাখ ডলার। এর বাইরে নিরাপত্তা খাতে কেন্দ্রীয় সরকারের ৫ কোটি ৯৫ লাখ ডলার এবং পরিবহন খাতে আরও ১ কোটি ৩৩ লাখ ডলার অনুদান পেয়েছে তারা।