এমবাপ্পে–দেম্বেলেদের অবিশ্বাস্য ফ্রান্সকে থামাবে কে

এমবাপ্পের গোল উদ্‌যাপনরয়টার্স

বুকে হাত দিয়ে বলুন, ফ্রান্স–মরক্কো ম্যাচের কোনো পর্যায়ে কি মনে হয়েছে, ফ্রান্স হারতে পারে? হার তো দূরের কথা, গোল খেতে পারে—এমনও মনে হয়নি পুরো ম্যাচে। মরক্কো ম্যাচ তো বটেই, পুরো বিশ্বকাপে এখন পর্যন্ত ফ্রান্সকে হারানোর সম্ভাবনা কেউ তৈরি করতে পারেনি। এমনকি এই বিশ্বকাপে ফ্রান্সকে হারানোর মতো কোনো দল আছে কি না, সেই প্রশ্নও উঠেছে।

ফ্রান্সকে হারাতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কেউ কেউ আগের বিশ্বকাপের দলগুলোর দিকে ফিরে তাকাতে শুরু করেছেন। কেউ বলছেন, এই ফ্রান্সকে হারাতে পারে ২০০২ সালের ব্রাজিল। আবার কারও মতে, ২০১০ সালের স্পেনকে হয়তো এই দলের সামনে দাঁড় করানো যায়। অবশ্য ২০১৮ সালে বিশ্বকাপ জেতা ফ্রান্সকেও রাখা যায় এই তালিকায়।

কেউ চাইলে আরও পেছনে যেতে পারেন। তবে তারা যে এই ফ্রান্সকে হারিয়ে চ্যাম্পিয়ন হতে পারে, সে কথা নিশ্চিত করে বলার সুযোগ নেই। দিদিয়ের দেশমের ফ্রান্স এতটাই অপ্রতিরোধ্য! বিশ্বকাপ ফুটবল ইতিহাসের সেরা দলকে যদি গ্রিক দার্শনিক প্লেটোর ‘পরম–রূপ’ আকারে দেখা হলে, এই ফ্রান্স দল এখন পর্যন্ত সেই পরম রূপই, অর্থাৎ সেরাদের মধ্যে সেরা।

মরক্কো–ফ্রান্স কোয়ার্টার ফাইনাল ম্যাচে ফেরা যাক। প্রথম মিনিট থেকে ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ নিজেদের দখলে নেয় ফ্রান্স। ৫ মিনিটের মধ্যে দুইবার এগিয়ে যাওয়ার সুযোগ পায় তারা। তবে গোলপোস্টের নিচে দাঁড়িয়ে থাকা ইয়াসিন বুনুর অতিমানবীয় সেভে সে যাত্রায় বেঁচে মরক্কো। বলা হয়, ভোরের সূর্য নাকি দিনের পূর্বাভাস দেয়। একইভাবে ৫ মিনিটের মধ্যে সেই দুটি আক্রমণ ছিল পুরো ম্যাচের পূর্বাভাস। এরপর শুরু হয় ফ্রান্সের আক্রমণ–ঝড়। মিডফিল্ডে প্লে–মেক করছিলেন মাইকেল ওলিসে–আদ্রিয়াঁ রাবিওরা। আর আক্রমণকে পরিণতি দেওয়ার চেষ্টা করছিলেন এমবাপ্পে–দেজিরে দুয়ে–দেম্বেলেরা।

আরও পড়ুন

ফ্রান্সের আক্রমণের ঢেউগুলো এমনভাবে আঁচড়ে পড়ছিল যে সেগুলো ঠেকানোর জন্য মরক্কোর ১১ জন খেলোয়াড়কে নিচে নেমে ‘বাস পার্ক’ করতে হচ্ছিল। এমন পরিস্থিতিতে ফ্রান্সের আক্রমণের চাপ সামলাতে না পেরে এমবাপ্পেকে বক্সের ভেতর ফাউল করে বসেন নুসাইর মাজরাউয়ি।

সম্ভবত নিজের ক্যারিয়ারে অন্যতম দুর্বল পেনাল্টি শট নিয়ে সুযোগটি হাতছাড়া করেন এমবাপ্পে। পেনাল্টিতে এমবাপ্পে গোল না পেলেও ফ্রান্সের সমর্থকদের স্নায়ুচাপে ভোগার কোনো কারণ ছিল না। বোঝায় যাচ্ছিল, এই ম্যাচে যদি শেষ পর্যন্ত কেউ গোল করে, তবে সেটি হবে ফ্রান্স। ম্যাচের শুরুর আগে ‘মরক্কো–ভীতি’ তৈরির চেষ্টা করা হলেও সেসব ততক্ষণে হাওয়ায় মিলিয়ে গেছে।

দেম্বেলের গোলের পর ফ্রান্সের খেলোয়াড়দের উদ্‌যাপন
রয়টার্স

প্রথমার্ধে ফ্রান্সকে ঠেকিয়ে রাখা গেলেও বিরতির পর ঠিকই ভেঙে পড়ে মরক্কোর রক্ষণ। প্রথমার্ধের খানিকটা ছায়ায় ঢাকা পড়া এমবাপ্পে আলোয় এসে দাঁড়ালেন ম্যাচের ৬০ মিনিটে। বক্সের কাছাকাছি জায়গায় থেকে ট্রেডমার্ক শটে দুর্দান্ত এক গোল করে এগিয়ে দিলেন ফ্রান্সকে। এরপর দেম্বেলের গোলটা এল ৬ মিনিট পর। ৬৬ মিনিটের মধ্যে ২–০ গোলে পিছিয়ে পড়ে মরক্কো তখন ম্যাচ থেকে অনেক দূর ছিটকে গেছে। এরপর যে আর ফেরার পথ ছিল না, সেটা বোধহয় ততক্ষণে মরক্কোও বুঝে গেছে। শেষ পর্যন্ত ফ্রান্সের ২–০ গোলের জয়ে শেষ হলো ম্যাচ।

অথচ ম্যাচ শুরুর আগে মরক্কোকে কঠিন প্রতিপক্ষ হিসেবেই দেখা হচ্ছিল। ফিফা র‍্যাঙ্কিংয়েও দুই দলের ব্যবধান ছিল মাত্র পাঁচ ধাপ। কিন্তু কে জানত, কোয়ার্টার ফাইনালে এমন একপেশে লড়াই হবে। ম্যাচে দুই দলের শক্তির পার্থক্য বোঝাতে একটি পরিসংখ্যানই যথেষ্ট। প্রথমার্ধে ফ্রান্স গোলের উদ্দেশ্যে শট নিয়েছে ১৩টি আর মরক্কো মাত্র ১টি, অর্থাৎ ব্যবধান ১২ শট। কোয়ার্টার ফাইনালের মতো ম্যাচে এ ব্যবধান অবিশ্বাস্য।

১৯৬৬ সাল থেকে বিশ্বকাপের নকআউট পর্বের এমন পরিসংখ্যান রাখা শুরু হওয়ার পর প্রথমার্ধে শটের ব্যবধানে এর চেয়ে বড় পার্থক্য দেখা গেছে মাত্র একবার। ১৯৯৪ বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে সুইডেনের বিপক্ষে ব্রাজিল নিয়েছিল ১৭টি শট আর সুইডেন মাত্র ১টি। সেই ম্যাচে ব্রাজিল ১-০ গোলে জিতেছিল। কয়েক দিন পর যুক্তরাষ্ট্রে অনুষ্ঠিত সেই বিশ্বকাপের শিরোপাও জিতেছিল সেলেসাওরা।

মরক্কোর রক্ষণদেয়াল ভেদ করে গোল করছেন এমবাপ্পে
রয়টার্স

এবারের বিশ্বকাপে এখন পর্যন্ত একবারও পিছিয়ে পড়তে হয়নি ফ্রান্সকে। এটুকু তথ্যই প্রমাণ দেয়, ফ্রান্স বিশ্বকাপে কতটা অপ্রতিরোধ্য। তবে সেমিফাইনালে ও ফাইনালে যদি প্রতিপক্ষ শুরুতে এগিয়ে যায়, তখন ফ্রান্স কীভাবে ঘুরে দাঁড়ায়, সেটি দেখার মতোই হবে।

আরও পড়ুন

আর ফ্রান্সের এগিয়ে যাওয়া মানেই প্রতিপক্ষের জন্য বড় দুঃসংবাদ। ফ্রান্স মূলত তখনই সবচেয়ে ভয়ংকর হয়ে ওঠে, যখন তারা এগিয়ে থাকে। কারণ, তখন প্রতিপক্ষকে সমতায় ফেরার জন্য আক্রমণে উঠতেই হয়। আর তাতেই ফাঁকা জায়গা পেয়ে ফ্রান্সের দুরন্ত গতির ফরোয়ার্ডরা আরও বেশি ভয়ংকর হয়ে ওঠেন।
মরক্কোর বিপক্ষেও ঠিক সেটাই হয়েছে। এমবাপ্পের প্রথম গোলের পর সমতায় ফেরার চেষ্টায় মরক্কো ওপরে উঠে আসে। সেই সুযোগে পাল্টা আক্রমণ থেকে উসমান দেম্বেলে গোল করে ফ্রান্সের সেমিফাইনাল নিশ্চিত করেন।

স্পেন, ইংল্যান্ড কিংবা আর্জেন্টিনার মতো দলগুলোর আক্রমণভাগ এবং ব্যক্তিগত নৈপুণ্য ফ্রান্সকে এখন পর্যন্ত তাদের মুখোমুখি হওয়া যেকোনো দলের চেয়ে বেশি চাপে ফেলতে পারে। নিঃসন্দেহে এই বিশ্বকাপে সবচেয়ে শক্তিশালী প্রথম একাদশ এবং সবচেয়ে সমৃদ্ধ বেঞ্চ ফ্রান্সের। তবে বিশ্বকাপের ইতিহাস বারবারই দেখিয়েছে, পুরো একটি সফল অভিযান ভেঙে পড়তে কখনো কখনো কয়েক মিনিটই যথেষ্ট। আপাতত সেই কয়েক মিনিটের ওপর ভরসা করা ছাড়া প্রতিপক্ষ দলগুলোর খুব বেশি কিছু করার নেই।