ফুটবলারদের সংবর্ধনাকে হালকা বানিয়ে ফেলা হচ্ছে না তো
হাতিরঝিলের অ্যাম্ফিথিয়েটারের প্রবেশপথে দাঁড়ালে যে কারও চোখ ধাঁধিয়ে যেত। রংবেরঙের বিলবোর্ড, উজ্জ্বল আলোয় হাসছে খেলোয়াড়দের ট্রফি জয়ের ছবি। ভেতরে পা রাখলে মনে হবে এক ভিন্ন জগৎ। মঞ্চের সামনে গিয়ে তো চোখ ছানাবড়া অবস্থা! ৩৪টি সুসজ্জিত চেয়ার, সামনে বড় বড় ইংরেজি অক্ষরে লেখা ‘চ্যাম্পিয়ন’। গ্যালারিতেও বিশেষ চেয়ার বাফুফের কর্তাদের জন্য।
শুক্রবার মালদ্বীপের মালেতে ভারতকে টাইব্রেকারে হারিয়ে অনূর্ধ্ব-২০ সাফ শিরোপা জেতা যুবকদের বরণ করে নিতে পরশু রাতে বাফুফের আয়োজন ছিল রাজকীয়। কিন্তু চাকচিক্যের আড়ালে বারবার উঁকি দিয়েছে একটা প্রশ্ন—সব প্রাপ্তিতেই কি ছাদখোলা বাস আর হাতিরঝিলে সংবর্ধনা উৎসব প্রয়োজন?
একটি তথ্যের সংশোধন জরুরি। এবারের অনূর্ধ্ব-২০ সাফ জয় কিন্তু নতুন কোনো ইতিহাস নয়, এটি মূলত মুকুট ধরে রাখার সাফল্য। ২০২৪ সালেও নেপালের মাটিতে নেপালকে ৪-১ গোলে গুঁড়িয়ে বাংলাদেশ এই শিরোপা জিতেছিল। তারও আগে ২০২২ সালে ভুবনেশ্বরে ভারতের কাছে হেরে হয়েছিল রানার্সআপ।
মজার ব্যাপার হলো, ২০২৪ সালে যখন ছেলেরা এই একই ট্রফি জিতেছিল, তখন কোনো সংবর্ধনা দেওয়া হয়েছিল বলে মনে পড়ে না, এত শোরগোলও হয়নি। দল ট্রফি নিয়ে দেশে ফিরেছিল নীরবে। আর এবার বিমানবন্দর থেকে ছাদখোলা বাসে করে যুবাদের নিয়ে যাওয়া হলো হাতিরঝিলে।
বাংলাদেশে এখন ছাদখোলা বাসে সংবর্ধনা দেওয়াটা যেন রীতি হয়ে দাঁড়িয়েছে। ২০২২ সালে সানজিদা আক্তারের আবেগপ্রবণ ফেসবুক স্ট্যাটাসের পর মেয়েদের সাফ জয় উপলক্ষে ছাদখোলা বাসের আয়োজন ছিল যথার্থ ও প্রশংসনীয়। কিন্তু অনূর্ধ্ব-২০ বা প্রথম নারী সাফ ফুটসাল জয়ের পর কেউ ছাদখোলা বাস বা হাতিরঝিলে সংবর্ধনার দাবি করেনি। বাফুফে আগ বাড়িয়েই তা দিয়েছে। দিতেই পারে, খেলোয়াড়দের উৎসাহিত করলে ক্ষতি কী?
প্রশ্ন আসলে অন্য জায়গায়। এসব সংবর্ধনা অনুষ্ঠান মোটা অঙ্কের অর্থ খরচ করে ইভেন্ট ম্যানেজমেন্ট প্রতিষ্ঠানকে দিয়ে আয়োজনের প্রয়োজন আদৌ আছে কি না! বিলবোর্ড, লাইট, সাউন্ড সিস্টেম, সাজসজ্জা বাবদ লাখ লাখ টাকা খরচ হচ্ছে এসব অনুষ্ঠানে। অবশ্য একেকটি সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে ঠিক কত টাকা খরচ হয়, বাফুফের কয়েকজন কর্মকর্তাকে প্রশ্ন করেও উত্তর মেলেনি। এক কর্মকর্তা জানালেন, ফেডারেশনের সহসভাপতি ফাহাদ করিম হয়তো ধারণা দিতে পারবেন। কিন্তু ফাহাদ করিম ফোনই ধরেননি।
এটা ঠিক যে সারা পৃথিবীতেই ছাদখোলা বাসে বিজয়ীদের বরণ করার রীতি আছে। রাস্তার দুপাশে হাজার হাজার মানুষ জড়ো হন। এক ঘণ্টার রাস্তা পেরোতে পাঁচ ঘণ্টা লাগে। যেমনটা লেগেছিল চার বছর আগে বাংলাদেশের মেয়েরা প্রথমবার সাফ জিতে আসার পর।
কিন্তু পরশু রাতে রোনান-ইসমাইলদের বরণ করতে রাস্তায় তেমন মানুষ ছিল না, ছিল শুধু নিয়মিত যানবাহন। খেলোয়াড়েরা হাত নাড়ছেন, কিন্তু জবাব দেওয়ার লোকও ছিল না বললে চলে। হাতিরঝিলের অ্যাম্ফিথিয়েটারে শনিবার রাত ১০টার অনুষ্ঠানে খেলার জগতের বাইরের অল্প কিছু মানুষেরই উপস্থিতি ছিল। গ্যালারির তিন ভাগের এক ভাগও ভরেনি। মানুষ যেন বিষয়টার সঙ্গে একাত্মই হতে পারেনি। কেউ কেউ তো এটাকে তাই বাফুফের ‘সংবর্ধনা–বিলাস’ও বলছেন।
জানুয়ারিতে নারী সাফ ফুটসালে চ্যাম্পিয়ন হওয়ার পরও একই চিত্র। ছাদখোলা বাস, রাস্তায় দর্শক নেই, অতঃপর হাতিরঝিলে কর্তাদের মিষ্টি কথা শুনে বিদায়।
সংবর্ধনার চেয়ে তরুণ ফুটবলারদের বেশি দরকার নিয়মিত খেলার সুযোগ, মানসম্মত লিগ আর আর্থিক নিরাপত্তা। পরশুর অনুষ্ঠানে বাফুফের নিজস্ব তহবিল থেকে কোনো আর্থিক পুরস্কারের ঘোষণা আসেনি। অবশ্য ২০২৪ সালে সাফ জেতার পর মেয়েদের দেড় কোটি টাকা পুরস্কার দেওয়ার পুরোনো প্রতিশ্রুতিই তো এখনো পূরণ হয়নি!
বাফুফের এক সহসভাপতি তাঁর ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে সাফজয়ী যুব দলের সব খেলোয়াড়কে এক লাখ টাকা করে দিয়েছেন। ঢাকা উত্তর সিটির প্রশাসক প্রত্যেক খেলোয়াড়কে ৫০ হাজার টাকা করে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, সেটাও উপস্থিত কিছু সমর্থকের দাবির পর।
হাতিরঝিলের সংবর্ধনার সঙ্গে দেশের ফুটবলের প্রথম পরিচয় গত বছর জুলাইয়ে মেয়েরা মিয়ানমারকে হারিয়ে এশিয়ান কাপের টিকিট পাওয়ার পর। রাত ১টায় দল ঢাকা পৌঁছায়, রাত ৩টায় ঘুম চোখে তাদের হাতিরঝিলে হাজির করে হুলুস্থুল কাণ্ড বাধিয়ে সংবর্ধনা দেওয়া হয়। এক কানাকড়িও তাদের হাতে দেওয়া হয়নি সেদিন।
এরপর জানুয়ারিতে নারী সাফ ফুটসালে চ্যাম্পিয়ন হওয়ার পরও একই চিত্র। ছাদখোলা বাস, রাস্তায় দর্শক নেই, অতঃপর হাতিরঝিলে কর্তাদের মিষ্টি কথা শুনে বিদায়। সংবর্ধনা বাফুফে ভবনেও দেওয়া যেত। সেখানে হয়তো লাইট-ক্যামেরা বা সাউন্ড সিস্টেমের জমকালো ভাব থাকত না, কিন্তু সংবর্ধনা তো হতো। লাখ লাখ টাকাও সাশ্রয় হতো, যা খেলোয়াড়দের কল্যাণে অন্যভাবে ব্যয় করা যেত।
ঘরোয়া ফুটবলে খেলোয়াড় তৈরির সূতিকাগার পাইওনিয়ার লিগ সর্বশেষ হয়েছে ২০২২ সালের জুলাইয়ে, দ্বিতীয় বিভাগ ও তৃতীয় বিভাগ লিগ ২০২৪ সালে। বর্তমান বাফুফে সভাপতি তাবিথ আউয়ালের মেয়াদের ২২ মাস চলছে। এই সময়ে বাংলাদেশ লিগ ও চ্যাম্পিয়নশিপ লিগ আগের ধারাবাহিকতায় চলছে। এর বাইরে একটি সিনিয়র ডিভিশন লিগ, অনূর্ধ্ব-১৫ ও জাতীয় চ্যাম্পিয়নশিপ হয়েছে। কিন্তু নিচের দিকের লিগগুলো অনিয়মিত। জেলা লিগ তো বাক্সবন্দী হয়েই আছে। সামগ্রিকভাবে তৃণমূল ফুটবলে স্থবিরতা কাটেনি। অনেক খেলোয়াড় ও কোচ হয়ে আছেন কর্মহীন।
বাফুফে খেলোয়াড়দের সংবর্ধনা দিতেই পারে। কিন্তু সংবর্ধনাকে বিলাসিতায় পরিণত না করে সুযোগ–সুবিধা বাড়ানোর দিকে নজর রাখাটাও জরুরি। তরুণদের ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করতে নিয়মিত লিগের আয়োজন হোক। বিলবোর্ড, ব্যানার, ফেস্টুনের চেয়ে পাইওনিয়ার লিগটা মাঠে রাখা বেশি দরকার। যুবাদের সংবর্ধনায় বাংলাদেশের নবাগত আইরিশ কোচ মার্ক কক্সের কথাটা মনে ধরার মতো। তিনি বলেছেন, বাংলাদেশকে এখন ২০৩৪ বিশ্বকাপের স্বপ্ন নিয়ে এগোতে হবে।
বাংলাদেশের বাস্তবতায় এটি এই মুহূর্তে অলীক স্বপ্ন সন্দেহ নেই। কিন্তু সামনে একটা পা তো ফেলা যায়। সংবর্ধনা আয়োজনে করিতকর্মা বাফুফে কি সে চিন্তা করবে?