হোটেল, হাইওয়ে আর শত মাইলের দৌড়ঝাঁপ: ফুটবল কোচদের কঠিন জীবন
ফুটবল কোচদের জীবন এমনিতেই তো বেশ কঠিন।
সবাই তাঁর কাছে ভালো ফল চায়, জয় চায়। কিন্তু পয়েন্ট টেবিলের চাপ অনেক কোচের জীবনকে দুর্বিষহ করে তোলে। তার ওপর যোগ হয় সমর্থকদের অস্থিরতা, পরিচালকমণ্ডলীর রক্তচক্ষু আর মিডিয়ার নজর তো আছেই।
এত সব সামলানোর মধ্যে আবার যদি কোনো কোচের জীবনে যুক্ত হয় প্রতিদিন শত শত মাইল যাতায়াতের ঝক্কি, কিংবা শত শত মাইল দূরে থাকা পরিবারকে ফেলে কাজের শহরে পড়ে থাকার একাকিত্ব, তাহলে কেমন হয় সেই জীবন?
ফ্যাঙ্ক ল্যাম্পার্ডের কথাই ধরা যাক। কভেন্ট্রি সিটি কোচের দায়িত্ব নিলেও তিনি থাকেন লন্ডনে, পরিবারের সঙ্গে। ক্লাবের সঙ্গে তাঁর বাসার দূরত্ব ১০০ মাইলের বেশি। গাড়িতে প্রায় ঘণ্টাখানেকের পথ।
ইংলিশ ফুটবলে এটা নতুন কিছু নয় অবশ্য। ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের কোচ থাকতে ক্লাবের স্যুইট ছেড়ে জোসে মরিনিও থিতু হয়েছিলেন বিলাসবহুল ফাইভ-স্টার হোটেলে। একদিকে তাঁর হোটেল-জীবন, অন্যদিকে লন্ডনে বসবাস করা পরিবার, দুইয়ের মাঝেই ভাগ হয়েছিল তাঁর জীবন।
আর্নে স্লটের গল্পও কম চমকপ্রদ নয়। লিভারপুলের কোচ থাকার সময় তিনি বাসা নিয়েছিলেন গ্রেটার ম্যানচেস্টারের হেল এলাকায়। ওল্ড ট্রাফোর্ড থেকে মাত্র ঢিলছোঁড়া দূরত্ব, কিন্তু অ্যানফিল্ডে পৌঁছাতে গাড়ি চালিয়ে যেতে লাগে পুরো এক ঘণ্টা।
ম্যানচেস্টার বিমানবন্দরটা কাছে বলেই এই বন্দোবস্ত ছিল, যাতে সুযোগ পেলেই উড়াল দেওয়া যায় নেদারল্যান্ডসে পড়ে থাকা স্ত্রী-সন্তানদের কাছে।
তবে যুক্তরাজ্যে দীর্ঘ দূরত্বের যাতায়াতে সম্ভবত সবাইকে ছাড়িয়ে গেছেন টনি পুলিস। স্টোক সিটির এই সাবেক কোচ ইংল্যান্ডের দক্ষিণ উপকূলে নিজের বাড়ি ছাড়েননি কখনোই। কাজের খাতিরে স্ট্যাফোর্ডশায়ারে যেতে-আসতে নিয়মিত পাড়ি দিতে হতো ৪০০ মাইলের বেশি পথ। ২০১৭ সালে মিডলসব্রোতে যোগ দেওয়ার পর তো দূরত্বটা গিয়ে ঠেকল একদিকেই ৩২০ মাইলে।
কীভাবে সামলান তারা এই ক্লান্তিহীন দৌড়ঝাঁপ? বিবিসি স্পোর্টসের কাছে জীবনের সেই অধ্যায় খোলসা করেছেন টনি পুলিস, ‘আমি কখনোই মনে করিনি যে ক্লাবের সঙ্গে প্রতারণা করছি। আমার স্ত্রী স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছিল, দক্ষিণ উপকূলের ওই বাড়িটাই আমাদের বাচ্চাদের বড় করার সেরা জায়গা। সে একদম ঠিক ছিল।’
৬৮ বছর বয়সী পুলিস ছিলেন বোর্নমাউথের কোচও। নিজের সিদ্ধান্ত নিয়ে কোনো আক্ষেপ নেই তাঁর, ‘পরিবারকে সঙ্গে না রাখা মানেই ক্লাবের কাজে ফাঁকি দেওয়া নয়। বরং ঘরে স্ত্রী-সন্তান না থাকায় আমি দল নিয়ে ভাবার, ছক কষার বাড়তি সময় পেয়েছি। শুনতে হয়তো নির্মম শোনাবে, কিন্তু এতে একজন কোচের প্রয়োজনীয় কাজগুলো গুছিয়ে নেওয়ার মতো যথেষ্ট মনস্তাত্ত্বিক জায়গা তৈরি হয়।’
কীভাবে? ম্যাচ শেষে গাড়ি চালনার সেই ঘণ্টার পর ঘণ্টা সময়টাকেই কাজে লাগাতেন পুলিস, ‘শনিবার খেলা শেষেই গাড়ির স্টিয়ারিং হাতে তুলে নিতাম। তিন ঘণ্টা বা তার বেশি লাগত বাড়ি পৌঁছাতে। কিন্তু ওই সময়টা ছিল মহামূল্যবান। গাড়িতে বসেই ফোনে পরবর্তী ম্যাচের সব প্রস্তুতি শুরু করে দিতাম।’
পুলিস বিস্তারিত ব্যাখ্যা করলেন, ‘হারলে সঙ্গে সঙ্গে চেয়ারম্যান পিটার কোটস ফোন করতেন। জিতলে আর বিরক্ত করতেন না, জানতেন সান্ত্বনার দরকার নেই। কিন্তু জয় কিংবা পরাজয় যা-ই হোক, গাড়িতে উঠেই সহকারী ডেভিড কেম্প আর জেরার্ড ফ্রান্সিসকে ফোন দিতাম। স্টেডিয়ামের হট্টগোল থেকে দূরে এসে ঠান্ডা মাথায় ম্যাচ বিশ্লেষণ করতাম আমরা। এরপরই আসত চিফ স্কাউটের ফোন। তিনি আমাদের পরবর্তী প্রতিপক্ষের খেলা দেখে সব বিবরণ দিতেন, তাদের ফর্মেশন, শক্তির জায়গা, দুর্বলতা, আর ইনজুরি রিপোর্ট।’
বাড়ি পৌঁছানোর আগেই ছক সাজানো শেষ। রাতে টিভির সামনে বসে রাতের খাবার খেতে খেতেই শুরু হতো প্রতিপক্ষের আগের ম্যাচগুলোর রেকর্ডিং দেখা। তবে পরিবারকে কখনো বঞ্চিত করেননি পুলিস, ‘রোববার দিনটা পুরোপুরি পরিবারের জন্য। তারপর রোববার গভীর রাতে বা সোমবার ভোরে আবার সেই মোটরওয়ে ধরে ক্লাবে ফেরা। ততক্ষণে পরের ম্যাচের কৌশল আমার মাথায় একদম পরিষ্কার।’
ফুটবল–দুনিয়ায় এই কর্মপদ্ধতি একেবারে নতুন নয়। অনেকেই মনে করেন, অফিসের চার দেওয়ালে বসে যে কাজ টানা সম্ভব নয়, গাড়ির নির্জনতায় একা বসে সিদ্ধান্ত নেওয়া অনেক সহজ। অফিসে থাকলে হাজারটা ঝামেলা লেগেই থাকে। গুরুতর কোনো আলোচনায় ব্যস্ত আছেন, অমনি চেয়ারম্যানের ডাক এল, বদলে গেল কাজের গতি। কিন্তু গাড়ির ভেতরে স্টিয়ারিং হাতে আপনি শুধুই একা। নিজের ভাবনাকে ধার দেওয়ার সেরা মুহূর্ত সেটাই।
অনেকে প্রশ্ন তুলতে পারেন, ক্লাব থেকে দূরে থাকলে কি সমর্থক আর ক্লাবকে ভেতর থেকে সেভাবে অনুভব করা যায়? পুলিস উত্তরটা দিলেন নিজের উদাহরণ দিয়ে, ‘স্টোক সিটির ডিএনএ বুঝতে আমার কোনো সমস্যা হয়নি। আমি সেই শহরটাকে চিনেছি, সেখানকার মানুষকে ভালোবেসেছি। তাদের জন্য এমন একটা দল তৈরি করতে চেয়েছি, যার সঙ্গে তারা নিজেদের মেলাতে পারে। যেখানেই কাজ করেছি, নিজের সততা বিকিয়ে দিইনি।’