দর্শকে ঠাসা গ্যালারিতে বসে দুরন্ত স্পেনের জয় দেখলাম, জয়টা তাদেরই প্রাপ্য

যুক্তরাষ্ট্রে এসে গ্যালারিতে বসে গোটা পাঁচেক বিশ্বকাপের ম্যাচ দেখা হয়ে গেছে। তবে স্পেন-বেলজিয়াম ম্যাচটিই মাঠে বসে আমার শেষ ম্যাচ। বাকি দুটি কোয়ার্টার ফাইনাল (ইংল্যান্ড–নরওয়ে ও আর্জেন্টিনা–সুইজারল্যান্ড) আমাকে টিভিতে দেখতে হবে। কারণ, ১৩ জুলাই এখান থেকে আমার ফ্লাই করার কথা, আশা করছি ১৫ তারিখ নাগাদ ঢাকায় পৌঁছাব।

যুক্তরাষ্ট্র সফরটি আমার জন্য দারুণ এক অভিজ্ঞতা। এখানকার মানুষের মধ্যে বিশ্বকাপ নিয়ে উপচে পড়া উৎসাহ চোখে পড়ার মতো। চারপাশ নানা দেশের বিচিত্র লোকজনে ভরপুর। তবে সবচেয়ে বড় চমক ছিল আমার নিজের দেশের মানুষের ভালোবাসা। আজ হোটেল থেকে বের হতেই দেখি জনা বিশেক বাংলাদেশি ভক্ত আমার জন্য নাকি দীর্ঘ দুই ঘণ্টা ধরে দাঁড়িয়ে আছেন! এই অল্প সময়ে এখানকার বাঙালিদের কাছ থেকে যে উষ্ণ আতিথ্য, ভালোবাসা আর দাওয়াত পেয়েছি, তা সত্যিই ভোলার নয়। অনেকে আগ্রহ নিয়ে ছবিও তুলেছেন।

আজকের ম্যাচটি ছিল লস অ্যাঞ্জেলেস স্টেডিয়ামে, যা প্রায় ৭০ হাজার দর্শকে ঠাসা ছিল। মাঠে স্পেনের সমর্থকই ছিল বেশি। তবে খেলা দেখার অভিজ্ঞতাটা কিন্তু খুব একটা আরামদায়ক ছিল না। স্থানীয় সময় দুপুর ১২টায় ম্যাচ শুরু হওয়ায় আবহাওয়া ছিল বেশ গরম। স্টেডিয়ামের ছাদের ওপরের অংশ ঢাকা থাকলেও এর চারপাশ বা দেয়ালগুলো উন্মুক্ত, বাতাস চলাচল করতে পারে। কিন্তু এই এলাকাটি একটু পাহাড়ি হওয়ায় দিনে যেমন কড়া গরম, রাতে তেমনি কিছুটা ঠান্ডা নামে।

বাতাসে আর্দ্রতার কারণে আসল তাপমাত্রার চেয়ে গরম অনেক বেশি অনুভূত হচ্ছিল আজ। দুপুরের কড়া রোদে খেলা হওয়ায় গ্যালারিতে বসে থাকাই কখনো কখনো যেন দায় হয়ে যাচ্ছিল, বলতে গেলে আমার বেশ কষ্টই হয়েছে।

আরও পড়ুন

তবে সব কষ্ট ভুলে গেছি মাঠের ফুটবলের উত্তেজনায়। গ্যালারিতে বসে স্পেনের খেলাটা বেশ উপভোগ করেছি। শেষ পর্যন্ত ভালো খেলেই বেলজিয়ামকে হারিয়ে বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে উঠেছে স্পেন। তারা দাপটের সঙ্গে জিতেছে বলতে হয়। যদিও জয়সূচক গোলটা এসেছে একেবারে শেষ মুহূর্তে, তবে পুরো ম্যাচে আধিপত্য দেখিয়েছে স্পেনই। সত্যি বলতে, এই জয়টা স্পেনের প্রাপ্যই ছিল।

বেলজিয়াম দল হিসেবে স্পেনের মতো অতটা শক্তিশালী নয়, ম্যাচে তারা সুযোগও তেমন তৈরি করতে পারেনি। স্পেনের মাঝমাঠ ছিল ভীষণ শক্তিশালী এবং এই জয়ের পেছনে তাদের মাঝমাঠের দুর্দান্ত ভূমিকা ছিল। মাঝমাঠ থেকে একের পর এক প্রচুর আক্রমণ তৈরি হয়েছে।

গ্যালারিতে বাংলাদেশের পাতাকা হাতে জামাল ভূঁইয়া
ইনস্টাগ্রাম

বিশেষ করে স্পেনের তরুণ তুর্কি লামিনে ইয়ামালের খেলা আলাদা করে চোখ কেড়েছে। মাঠে লিওনেল মেসিকে যেমন তাঁর টিমমেটরা বল দেওয়ার জন্য খোঁজে, আজ স্পেনের ম্যাচেও প্রায় একই দৃশ্য দেখলাম। সতীর্থরা বারবার ইয়ামালকেই বল বাড়িয়ে দিচ্ছিল। ইয়ামাল যেন এখন স্পেনের সবচেয়ে কাঙ্ক্ষিত খেলোয়াড় হয়ে উঠছে।

স্পেনের জয়ের পেছনে আরেকটি বড় গল্প হলো মিকেল মারিনো। গত ম্যাচে বদলি নেমে গোল করেছিল, আজও করল বদলি নেমেই। পারফেক্ট ‘সুপার সাব’ বলতে যা বোঝায়! দলের গুরুত্বপূর্ণ একজন খেলোয়াড় হয়ে উঠেছে সে। তাকে বদলি হিসেবে ব্যবহার করা স্পেন কোচের দারুণ একটা ট্যাকটিক্যাল বাজি, যে বাজির ফল তিনি টানা দুটি নকআউট ম্যাচে পেয়েছেন।

জয়ের পর স্পেনের উদ্‌যাপন
এএফপি

অন্যদিকে বেলজিয়ামকে ভুগতে হয়েছে তাদের গোলকিপার নিয়ে। ম্যাচে বেলজিয়ামের মূল গোলকিপার থিবো কোর্তোয়ার চোট নিয়ে ৭০ মিনিটের পর উঠে গেলে সেনে লামেন্সকে নামাতে হয়েছিল। কিন্তু ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের এই গোলরক্ষক বিশ্বকাপে নিজের প্রথম ম্যাচ খেলতে নেমে গোল খেয়ে বসল। বলটা গ্রিপ করতে গিয়ে যদি হাত থেকে বল বেরিয়ে যায়, তবে তা খুবই বিপজ্জনক। বলটা তাঁর ধরা উচিত ছিল।

আরও পড়ুন

এই টুর্নামেন্টে নিজেদের ষষ্ঠ ম্যাচে এসে আজ প্রথম গোল হজম করল স্পেন। এর আগে কেপ ভার্দের সঙ্গে গোলশূন্য ড্রর পর থেকে তাদের আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। তবে সামনে সেমিফাইনালে তাদের প্রতিপক্ষ শক্তিশালী ফ্রান্স। ফ্রান্স যেভাবে খেলছে, তাতে কিলিয়ান এমবাপ্পেদেরই একটু হলেও এগিয়ে রাখতে হবে। তবে ব্যবধানটা খুব বেশি নয়, ফ্রান্সের পক্ষে শতকরা হিসাবে ৫৫-৪৫ বলা যায়।

ম্যাচ শেষে গ্যালারিতে দেখলাম স্পেনের সমর্থকেরা আনন্দে ভাসছে। সবাই নাচছে, গাইছে, ভীষণ উল্লাস করছে। সবার মুখে খুশির ঝিলিক। মাঠের এই উন্মাদনা গায়ে মেখেই স্টেডিয়াম থেকে বেরোলাম। কড়া রোদের ক্লান্তির পর একটা কফি শপে ঢুকে একটু গলা ভিজিয়ে নিলাম।

লেখক: বাংলাদেশ ফুটবল দলের অধিনায়ক