কার ওপর কেমন নির্ভরতা

প্রথমেই বলতে হয় ইয়োশুয়া কিমিখের কথা। বিশ্বকাপে হ্যান্সি ফ্লিকের মূল অস্ত্র হতে পারেন এই বায়ার্ন মিউনিখ তারকা। তাঁকে হয়তো কিছু ডিফেন্সিভ দায়িত্ব দেওয়া থেকেও মুক্তি দেওয়া হতে পারে যেন ফাইনাল থার্ডে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারেন। গুরুদায়িত্ব থাকবে ম্যানচেস্টার সিটি তারকা ইলকায় গুন্দোয়ানের কাঁধেও। পজিশনাল জ্ঞান, ‘প্রেস’ সামলানোর সামর্থ্য এবং পাসিং রেঞ্জে দক্ষতার কারণে গুন্দোয়ানের ওপর ফ্লিকের বিশেষ নির্ভরতা থাকবে। প্রতিপক্ষের প্রতি–আক্রমণ নষ্ট করার ক্ষেত্রেও দারুণ মুনশিয়ানা দেখাতে পারেন এই ম্যানচেস্টার সিটি তারকা।

নিচ থেকে রক্ষণচেরা পাসের দক্ষতা তো আছেই। ফ্লিকের দলে অভিজ্ঞ থমাস মুলারের ভূমিকা হতে পারে অ্যাটাকিং মিডফিল্ডারের। সেন্টার ফরোয়ার্ডের একটু পেছনে থেকে নিজের দায়িত্ব পালন করতে হতে পারে তাঁকে। ফ্লিক যখন বায়ার্ন মিউনিখের দায়িত্বে ছিলেন, তখন এভাবেই মুলারকে ব্যবহার করেছিলেন। বিশ্বকাপে একইভাবে ভূমিকা রাখতে দেখা যেতে পারে এই বায়ার্ন তারকাকে। এ ছাড়া আগের বিশ্বকাপগুলোর অভিজ্ঞতা তো আছেই।

উইংয়ে লেরয় সানে ও সার্জ নাবরির ওপর ভরসা রাখতে পারেন ফ্লিক। গত বিশ্বকাপে লুভের দলে জায়গা হয়নি এই দুজনের। তবে ফ্লিকের দলে দুজনকেই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকায় দেখা যেতে পারে। উইংয়ে এ সময়ের অন্যতম সেরাদের তালিকায় এই দুজনের নাম নিশ্চিতভাবেই থাকবে। আর কাই হাভার্টজ থাকবেন গোল করার ভূমিকায়। ২০১৪ সালের বিশ্বকাপের পর থেকে স্কোরারের অভাবে ভুগছিল জার্মানি। সে অভাব যে দূর হয়েছে, তা প্রমাণ করার চ্যালেঞ্জ থাকবে হাভার্টজের কাঁধে।

বিশ্বকাপে ফ্লিকের লুকানো তাস হতে পারেন জামাল মুসিয়ালা ও পাঁচ বছর পর দলে ফেরা মারিও গোটশে। আর গোলরক্ষকের পজিশনে মানুয়েল নয়্যারের ভূমিকা নিয়ে নতুন করে কিছু বলার নেই। সুইপার-কিপার নয়্যার গোলপোস্ট সামলানোর সঙ্গে প্রায় একজন ডিফেন্ডারের কাজও করে দিতে পারেন। সঙ্গে আন্তোনিও রুডিগার ও নিকোলাস সুলের মতো দুর্দান্ত দুই ডিফেন্ডার তো আছেনই। সব মিলিয়ে দলে বৈচিত্র্যময় খেলোয়াড় থাকাতে ফ্লিক কৌশলে প্রচুর স্বাধীনতা নিতে পারবেন।

বৈচিত্র্যে ভরপুর আক্রমণকৌশল

ফ্লিকের আগ্রাসী কৌশলে গোল করার জন্য অনেকগুলো পথ খোলা থাকে। সম্প্রতি গোল করা, শট ও প্রতিপক্ষের ডি-বক্সে বল স্পর্শ—সব ক্ষেত্রেই জার্মানি নিজেদের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ করেছে, যা কিনা প্রতিপক্ষ অনেক দলের চেয়ে বেশি। জার্মানিকে যে ‘মেশিন’ বলা হয়, সেটি অবশ্য এই দলের ক্ষেত্রে কমই প্রয়োগ করার সুযোগ আছে। এই জার্মানি সেই অর্থে লং বল সেভাবে খেলেই না।

গুন্দোয়ান ও কিমিখ—দুজনই নিচ থেকে বিল্ডআপের মাধ্যমে আক্রমণগুলো তৈরি করবেন। বিশেষ করে কিমিখ। শুরুটা হবে তাঁকে দিয়েই। নিজেদের থার্ড থেকেই ৪-২ আকার তৈরি করে সামনের দিকে অগ্রসর হতে শুরু করবে জার্মানি। সে সময় মিডফিল্ডে থাকা খেলোয়াড়েরাও কিছুটা পিছিয়ে আসেন, যা সামনে দুই অ্যাটাকারকে ফাঁকা জায়গা ধরে প্রতিপক্ষ ডি-বক্সে যাওয়ার সুযোগ করে দেয়।

তবে এভাবে আক্রমণে যাওয়ার বিপদ হচ্ছে, কোনো একজন খেলোয়াড় যদি ঠিকঠাক নিজের দায়িত্ব পালন করতে ব্যর্থ হন, তবে সব ভন্ডুল হয়ে যেতে পারে। প্রতি-আক্রমণনির্ভর দলের সামনে পড়লে রক্ষণদুর্গ মুহূর্তের মধ্যে ভেঙে পড়তে পারে এবং গোল খেয়ে ফেলার আশঙ্কাও তৈরি হয়।

আক্রমণ তৈরির ক্ষেত্রে জার্মানি আরেকটি কৌশল ব্যবহার করে থাকে। দুই সেন্টারব্যাক ধীরে ধীরে উইংয়ের দিকে সরে যেতে শুরু করেন এবং কিমিখ উইং ছেড়ে দুই ডিফেন্ডারের মাঝামাঝি জায়গায় চলে আসেন। এতে কী হয়, মাঝের তিন খেলোয়াড় আক্রমণ তৈরি করেন এবং দুজন উইংয়ের দিকে সরে গিয়ে সামনে অগ্রসর হয়ে প্রতিপক্ষের ওপর চাপ তৈরি করতে শুরু করেন। আর দ্রুত পজিশন পরিবর্তনের ফলে প্রতিপক্ষ হকচকিত হয়ে পড়ে এবং অনেক সময় খেই হারিয়ে ফেলে।

তবে জার্মান খেলোয়াড়েরা তাঁদের পজিশনাল কাঠামো অক্ষুণ্ন রেখে ঠিকঠাক আক্রমণ শানাতে পারেন, তাঁরা প্রতিপক্ষকে শুরু থেকেই চাপের মুখে রাখতে পারবেন। একটু আগে বলছিলাম, প্রতি–আক্রমণনির্ভর দলের বিপক্ষে ভেঙে পড়ার আশঙ্কার কথা।

এই বিপদ এড়াতে প্রতি–আক্রমণনির্ভর দলের বিপক্ষে ফ্লিক অনেক সময় ৩-২-৫ ফরমেশন ব্যবহার করে চেষ্টা করেন আগেই প্রতিপক্ষ ডিফেন্স ভেঙে দিতে। অন্যদিকে তিন ডিফেন্ডার সারাক্ষণ একে অন্যকে কাভার করতে থাকেন এবং তাঁরা চেষ্টা করেন প্রতি-আক্রমণের ক্ষেত্রে প্রতিপক্ষকে উইংয়ের দিকে ঠেলে দিয়ে আক্রমণ বিলম্বিত করতে।

আর জার্মান দলের দুই পিভটের (ডিফেন্সিভ মিডফিল্ডার) মধ্যে কিমিখ চেষ্টা করেন সামনে গিয়ে প্রতিপক্ষের ডিফেন্স লাইনে ক্রমাগত চাপ তৈরির। প্রতিপক্ষের আক্রমণ ঠেকানোর ক্ষেত্রেও দুই পিভট তথা ডিফেন্সিভ মিডফিল্ডারকে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে হয়। আর অপেক্ষাকৃত দুর্বল প্রতিপক্ষের বিপক্ষে যখন গোলের প্রয়োজন হয়, তখন জার্মানি ২-২-৬–এ বদলে যায়। যেখানে রাইট উইং ভেতরের দিকে চলে যায় এবং রাইটব্যাক সামনের দিকে এগিয়ে যায়।

আর জার্মানি যখন দুর্দান্ত কোনো রক্ষণের মুখোমুখি হয়, তখনো কিমিখকে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিতে হয়। বিশেষ করে তাঁর পাসিং রেঞ্জ কাভার করার দক্ষতা এ ক্ষেত্রে প্রতিপক্ষের রক্ষণ ভেঙে দিতে গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার হয়ে উঠতে পারে। যখন বল নিয়ে এগোনোর জন্য কোনো ফাঁকা জায়গা থাকে না, তখন আপনাকে হয় ওপর দিয়ে বল পাঠাতে হবে কিংবা পাশ দিয়ে ঢুকতে হবে।

আর কিমিখ ড্রিবল করে যখন ঢুকতে পারেন না, তখন রক্ষণে বিপজ্জনকভাবে বল ফেলার চেষ্টা করেন। জার্মান দলে কিমিখের গুরুত্ব বোঝা যেতে পারে একটা পরিসংখ্যানে। নেশনস লিগের ৬ ম্যাচে কিমিখ একাই ৪৮০টি পাস সম্পন্ন করেছেন।

তবে এরপরও আক্রমণভাগ নিয়ে ভুগতে হতে পারে জার্মানিকে। গোল করার মতো খেলোয়াড় আছে হাতে গোনা। শক্তিশালী রক্ষণের সামনে হিমশিম খেতে হতে পারে দলটিকে। সাম্প্রতিক সময়ের পারফরম্যান্সও ঠিক পক্ষে নেই। হাঙ্গেরির বিপক্ষেও দেখতে হয়েছে হার। তার ওপর টিমো ভের্নারকেও হারাতে হয়েছে তাদের। এখন হাভার্টজ-মুলার–মুসিয়ালারা ঠিকঠাক জ্বলে উঠতে পারলেই হয়।

জমাট রক্ষণ
রক্ষণে দারুণ কিছু খেলোয়াড় আছে জার্মানির। বিশেষ করে আন্তোনিও রুডিগার ও নিকোলাস সুল বিশ্বের যেকোনো শক্তিশালী আক্রমণভাগকে বোতলবন্দী করে রাখতে যথেষ্ট। তবে লং বল খেলার প্রবণতা কমানোয় তাদের রক্ষণ নিয়ে খুব বেশি পরীক্ষায় পড়তে হয় না। ট্যাকলও করতে হয় খুব কম। জার্মান রক্ষণ তাদের শক্তি প্রমাণ করে যখন বল পুনরুদ্ধারের বিষয় সামনে আসে।

দুর্দান্ত প্রেসিংয়ে দ্রুত বল কেড়ে নিতে দারুণ ওস্তাদ জার্মান ডিফেন্ডাররা। যা কিনা প্রতিপক্ষ দলগুলোর চেয়ে ৯৬ শতাংশ বেশি। এমনকি এয়ারেও তাঁরা দুর্দান্ত খেলেন। সেন্টারব্যাক শক্তিশালী হওয়াটাও ফ্লিকের ফরমেশনে বৈচিত্র্য আনার মূল কারণ, যা জার্মান এই কোচকে ব্যাকলাইন নিয়ে দুশ্চিন্তা কম করে ওপরে ওঠার অনুমতি দেয়।

শেষ কথা

বিশ্বকাপে জার্মানি বরাবরই ফেবারিট। এবারও ব্যতিক্রম নয়। কাতারেও জার্মানির মূল লক্ষ্য হবে শিরোপা জিতে বাড়ি ফেরা। তবে এবারের বিশ্বকাপ দলটির জন্য চ্যালেঞ্জিং হতে পারে। কৌশলের অস্থিরতা ভোগাতে পারে। নিখুঁত কাউন্টার অ্যাটাকে ধসে পড়ার আশঙ্কাও উড়িয়ে দেওয়া যায় না।

তবে গ্রুপ পর্বের পথ পাড়ি দেওয়াও সহজ হবে না। জার্মানির সঙ্গে আছে সাবেক বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন স্পেন, জাপান ও কোস্টারিকা। গতবার বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন হয়ে খেলতে এসে প্রথম রাউন্ডে হেরে বিদায় নিতে হয়েছিল।

সেখান থেকে শিক্ষা নিয়ে এবার ঘুরে দাঁড়াতে চাইবে তারা। তবে বললেই তো আর হয় না। স্থিরতার সঙ্গে এটি করেও দেখাতে হবে। সে জন্য দলকে একসঙ্গে জ্বলে ওঠার বিকল্প নেই। আর গ্রুপে চ্যাম্পিয়ন হতে ব্যর্থ হলে তো পদে পদে বিপদ অপেক্ষা করছে। সেই বিপদ সামলানোর টোটকা অবশ্য ফ্লিকের ভালোই জানা আছে। এখন কেবল মাঠে ঠিকঠাক প্রয়োগ করতে পারলেই হয়।