সাম্প্রতিক অতীতে নিজের কৌশলে স্থির থেকে তিতে বেশ কিছু পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালিয়েছেন। ব্রাজিল দলে গত কয়েক বছরে ইউরোপিয়ান ফুটবলে আলো ছড়ানো বেশ কিছু নাম উঠে এসেছে। তিতে চেষ্টা করেছেন প্রত্যেকের সামর্থ্যের সর্বোচ্চটা পরখ করে দেখতে। যেখানে তাঁর লক্ষ্য ছিল দলের একটি সমন্বিত ও ঐক্যবদ্ধ রূপ দাঁড় করানো।

তিতের দলকে খেলানোর ধরন মূলত নির্দিষ্ট একটি কাঠামোর ভেতরে নানা ধরনের বৈচিত্র্যময় বিষয়ের সমাবেশ ঘটানো। ধরা যাক, কোনো একটা ম্যাচে ৪-৩-৩ ফরমেশনে খেলা শুরু করল দল। তবে খেলা চলাকালেই এটি ক্রমাগত বদলাতে থাকে।
কৌশল সম্পর্কে বিস্তারিত আলাপে যাওয়ার আগে দেখে নেওয়া যাক, কেমন হলো ব্রাজিলের বিশ্বকাপ দল। গোলরক্ষক হিসেবে তিতের ১ নম্বর পছন্দ লিভারপুল তারকা আলিসন বেকার।

ব্যাকলাইনে দানিলো, থিয়াগো সিলভা, মার্কিনিওস ও অ্যালেক্স সান্দ্রো হবেন তিতের প্রথম পছন্দ। বিবেচনায় থাকতে পারেন অ্যালেক্স তেলেসও। মিডফিল্ডে দুই ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড তারকা কাসেমিরো ও ফ্রেদের ওপর আস্থা রাখবেন তিতে। একটু সামনে থাকতে পারেন লুকাস পাকেতা।

দুই উইং ধরে ক্রমাগত চাপ তৈরি করে ব্রাজিলকে গোলের সুযোগ তৈরি করে দেওয়ার চেষ্টা করবেন ভিনিসিয়ুস জুনিয়র ও রাফিনিয়া। আর নেইমারের ভূমিকা থাকবে অনেকটা ফলস নাইনের। যিনি মূলত গোটা আক্রমণভাগের প্রাণ হিসেবে মাঠে থাকবেন। দুই উইং থেকে আক্রমণের ঝড় তুলে ভিনি ও রাফিনিয়া তাঁর কাছে বল পাঠানোর কাজ করে যাবেন। গোল করার ক্ষেত্রে তিতে আরেকজন বড় অস্ত্র হতে পারেন রিচার্লিসনও।

এবারের ব্রাজিল দলটি তারকায় ঠাসা। তাই দলের প্রয়োজনে নিশ্চিতভাবে কিছু পরিবর্তন তিতে নিয়ে আসতে পারেন এবং শুরুর দিকে দেখা মিলতে পারে কিছু পরীক্ষা-নিরীক্ষারও। তবে ২০১৮ সালের বিশ্বকাপ দলের সঙ্গে তুলনা করলে ব্রাজিলের এই দল যথেষ্ট সামর্থ্যবান এবং পরিপক্বও বটে। সেলেসাওদের এবারের দল এতটাই পরিপূর্ণ যে রবার্তো ফিরমিনোর মতো ছন্দে থাকা খেলোয়াড়কে রেখে আসার বিলাসিতাও তিতে দেখাতে পেরেছেন।

সদা চঞ্চল আক্রমণভাগ

যদি পরিসংখ্যান বিবেচনায় নেওয়া হয়, তবে দেখা যাবে, তারা বিশ্বকাপে খেলতে আসা অন্য দলগুলোর তুলনায় ম্যাচপ্রতি ৯৬.৯ শতাংশ বেশি গোল করে থাকে। ডি–বক্সে বল স্পর্শ করাকে হিসেব করলে সেটি দাঁড়ায় ৮৭.৮ শতাংশ। বল দখলের ক্ষেত্রে যেটি ৭২.৭ শতাংশের বেশি।

তবে আর্জেন্টিনার মতো ব্রাজিলেরও লং বলে খেলার প্রবণতা কম। কাতারে অবশ্য এই কৌশলকে লুকোনো অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করতে পারে দলটি। তবে সাধারণত মাঠে বেশির ভাগ সময় বলের ওপর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে জোন ধরে আধিপত্য বিস্তার করে সামনে এগোনোর চেষ্টা করে পাঁচবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়নরা।

২০২২ সালের পরিসংখ্যান বিবেচনায় নিলে ব্রাজিল প্রতি ৯০ মিনিটে গড়ে ৫২৪.১৩টি পাস খেলেছে, যার মাত্র ৫.৬১ শতাংশ হচ্ছে লং পাস। তবে প্রতি ৯০ মিনিটে সাইড পাসের হার যেখানে ২১৫টি, সেখানে ফরোয়ার্ড বা সামনের দিকের পাসের ক্ষেত্রে সেটি ১৪২.৬৩।

এই পরিসংখ্যান তিতের দল মাঝমাঠে কতটা দাপুটে ফুটবল খেলে, সেই দিকটিকেই স্পষ্ট করে। মূলত ম্যাচে একচ্ছত্র আধিপত্য বিস্তার করেই প্রতিপক্ষকে বল থেকে দূরে সরিয়ে রাখার কাজটি করে সেলেসাওরা। পাশাপাশি সংঘবদ্ধ ও অর্কেস্ট্রেটেড ফুটবলের পসরা সাজিয়ে ক্রমাগত গোলের সুযোগ তৈরির চেষ্টা করে তারা।

২০১৮ সালের বিশ্বকাপের ব্যর্থতার পর তিতে নিজের কৌশলে কিছু পরিবর্তন আনেন। তিনি এর পর থেকে পজিশন (বল দখল) ধরে রাখার মধ্যে পজিশনাল প্লে সিস্টেম (ত্রিকোণাকৃতি বা ডায়মন্ড আকৃতি তৈরি করে সামনের দিকে এগোনোকে বোঝায়) তৈরি করেন। পজিশনের ক্ষেত্রে বলসহ এবং বলছাড়া দুটি ক্ষেত্রেই ব্রাজিল দারুণভাবে সংগঠিত থাকে। যে ম্যাচে ব্রাজিল এই কৌশল পুরোপুরিভাবে মাঠে প্রয়োগ করতে পারে, সেদিন প্রতিপক্ষের জন্য মাঠে খুব কম জায়গাই ফাঁকা থাকে।

এর ফলে হয় প্রতিপক্ষ কোণঠাসা হয়ে পড়ে, নয়তো বিভ্রান্ত হয়ে খেই হারিয়ে ফেলে কিংবা আউট অব দ্য বক্স কিছু করে ফাঁদ থেকে বের হতে চেষ্টা করে। তবে ফরমেশন বা খেলোয়াড় যেমনই হোক না কেন, তিতে চেষ্টা করেন নানা ধরনের বৈচিত্র্য তৈরি করে প্রতিপক্ষকে হতচকিত করে দিতে।

মাঠে নিজস্ব কাঠামো তৈরির ক্ষেত্রে তিতে অনেকগুলো উপায় ব্যবহার করে থাকেন। তবে এটির কার্যকারিতা নির্ভর করে দিনের খেলায় খেলোয়াড়দের পারফরম্যান্সের ওপর। অনেক সময় দেখা যায়, লেফটব্যাক থেকে কেউ এসে থার্ড সেন্টারব্যাক হিসেবে খেলতে শুরু করলেন। আর অন্য একজন ওপরে উঠে কাসেমিরোর সঙ্গে ডিফেন্সিভ মিডফিল্ডারের ভূমিকা গ্রহণ করলেন।

তবে মুহূর্তের মধ্যে সেই কৌশল বদলেও ফেলতে পারেন তাঁরা। তিতে মূলত নির্দিষ্ট একটি কৌশলের ভেতর ছোট ছোট কিছু পকেট কৌশল ঠিক করে রাখেন, যা প্রয়োজনের সময় চমক হিসেবে বেরিয়ে আসে।

তবে প্রশ্ন হচ্ছে, এর ভেতর দিয়ে গোলের সুযোগটা কীভাবে তৈরি হয়? পজিশনাল প্লে ব্যবহার করে ব্রাজিল মাঠের চারপাশে অনেক বড় জায়গা তৈরি করে। এরপর প্রতিপক্ষের রক্ষণদুর্গে একের পর এক হানা দিতে থাকে। এর ফলে একসময় প্রতিপক্ষের রক্ষণ ভেঙে গুঁড়িয়ে যায়।

আবার অনেক সময় প্রতিদ্বন্দ্বীদের এলোমেলো রক্ষণের সুযোগ নিয়ে এবং নিজেদের শক্তিশালী উইংকে কাজে লাগিয়ে প্রায় ফাঁকা জায়গা থেকে অরক্ষিত বক্সে ঢুকে পড়েন ফরোয়ার্ড লাইনের খেলোয়াড়েরা। এর ফলে নেইমারের জন্য দারুণ সব গোলের সুযোগ তৈরি হয়।

ব্রাজিলিয়ান কোচের এসব কৌশলের মধ্যমণি হবেন নেইমার। যিনি ঘোষণা দিয়ে বলেছেন, এই বিশ্বকাপের প্রতিটি ম্যাচ নিজের শেষ ম্যাচ মনে করে খেলতে নামবেন। তবে ব্রাজিলের জন্য বড় সুসংবাদ হচ্ছে নেইমারের দারুণ ছন্দ। মৌসুমের শুরু থেকে গোল করে এবং বানিয়ে দিয়ে দারুণ ভূমিকা রেখেছেন পিএসজি তারকা। এখন কেবল মাঠে ঠিকঠাক অনুবাদের অপেক্ষা। তবে একক প্রচেষ্টায় ম্যাচ বদলে দেওয়ার ক্ষেত্রে ভিনিসিয়ুস, রাফিনিয়ারাও নেইমারের মতো সমান কার্যকর।

রক্ষণে ব্রাজিল যেমন
রক্ষণে পজিশনাল প্লে সুবিধাটা ব্রাজিল ঠিকই পেয়ে থাকে। চাপের মুখে ভেঙে না পড়লে বা প্রতিপক্ষের কৌশল আরও বেশি নিখুঁত না হলে ব্রাজিলের ডিফেন্সকে খুব কমই ঘাম ঝরাতে হয়। মূলত বলের নিয়ন্ত্রণ নিজেদের কাছে থাকে বলেই, তারা এই সুবিধাটা নিতে পারে।

তবে এরপরও রক্ষণে সাম্প্রতিক সময়ে দারুণ দাপট দেখিয়েছে ব্রাজিল। বাছাইপর্বে ১৭ ম্যাচে মাত্র ৫ গোল হজম করাও তার প্রমাণ। এ ছাড়া ডিফেন্সিভ ডুয়েল, এরিয়েল ডুয়েল এবং বল পুনরুদ্ধারের ক্ষেত্রে সেলেসাওরা সাম্প্রতিক সময়ে ঈর্ষণীয় সাফল্য পেয়েছে।

আর হালের যে প্রেসিং ফুটবল, তার সঙ্গেও ব্রাজিল দারুণভাবে মানিয়ে নিয়েছে। তবে সব ছেড়েছুড়ে তারা প্রেস করতে মরিয়া হয়ে থাকে না। তারা মূলত নিজেদের মৌলিক বিষয়গুলো ঠিক রেখেই প্রেস করতে যায় এবং চেষ্টা করে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব বল পুনরুদ্ধার করতে।

আর নিজেদের হাই প্রেসের ক্ষেত্রেও ব্রাজিল চেষ্টা করে নিজেদের ছন্দ না হারাতে। আর এভাবে প্রতিপক্ষের জন্য জায়গা কমিয়ে আনার কথা তো আগেই বলা হয়েছে। অনেক সময় বল যখন নির্দিষ্ট জায়গায় থাকে, তারা সংঘবদ্ধভাবে ঝাঁপিয়ে পড়ে এবং চাপ তৈরি করে বল উদ্ধার করে নেয়। এভাবে তারা প্রতিপক্ষকে নিজেদের ফাইনাল থার্ডে আসার ক্ষেত্রেও দারুণভাবে বাধা তৈরি করে।

শেষ কথা
বিশ্বব্যাপী কোটি ভক্ত ব্রাজিলকে স্বরূপে দেখার অপেক্ষায় আছে। যে ব্রাজিল ও বিশ্বকাপ শিরোপা সমার্থক হয়ে গিয়েছিল, তারা পর্দার অন্তরালে গেছে অনেক দিন। সেই অপেক্ষা কি এবার ফুরাবে? সামর্থ্য ও শক্তি কোনোটাই কম নয়। তবে অনেক সময় ব্রাজিল ওভার প্লে করে। অর্থাৎ, বেশি কারিকুরিতে তালগোল পাকিয়ে ফেলে। বিশ্বকাপে চাপের মুহূর্তে আবার তালগোল পাকানোর আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যায় না।

আর একটি বড় মাথাব্যথার কারণ হতে পারে অতিরিক্ত নেইমারনির্ভরতা। আর্জেন্টিনা দল মেসিনির্ভরতা কাটিয়ে অনেকটা বেরিয়ে আসতে পারলেও ব্রাজিল এখনো অনেক ক্ষেত্রে নেইমারের ওপর নির্ভর করে থাকে, যা ব্রাজিলকে ভোগাতে পারে।

তবে ব্রাজিল সমর্থকদের প্রত্যাশা থাকবে, এই সব ছোটখাটো প্রতিবন্ধকতা দূর করে বড় মঞ্চে আরেকবার জ্বলে উঠুক সাম্বা রাজারা। সেলেসাওদের জিঙ্গার তালে নাচের অপেক্ষাটা নিশ্চয়ই আরও চার বছর বাড়াতে চাইবেন না তাঁরা।