সাম্প্রতিক সময়ে চ্যাম্পিয়নস লিগে রিয়ালের বিপক্ষে লিভারপুলের ম্যাচ মানেই একরাশ হতাশা ও আক্ষেপের ক্লিশে গল্প। ইয়ুর্গেন ক্লপের প্রেসিং ফুটবলের জাদু যেন রিয়াল নামের দৈত্যের সামনে এসে পড়ে বিকল হয়ে পড়ে। জাদুকর যেমন ধূর্ত দর্শকের সামনে জাদু দেখাতে গিয়ে হাঁসফাঁস করতে থাকেন, ভুলে যান ট্রাম্প কার্ডটা বের করতে, রিয়ালের সামনে ক্লপের গল্পটাও তেমন। পুরো রাস্তা পাড়ি দিয়ে চূড়ান্ত পর্যায়ে খেই হারানো—এমনটাই তো হয়ে এসেছে।

চ্যাম্পিয়নস লিগের মঞ্চটা অবশ্য ‘লস ব্লাঙ্কোসের’ ব্যক্তিগত সম্পত্তিতে পরিণত হয়েছে। ইউরোপীয় শ্রেষ্ঠত্বের এ মঞ্চে রিয়ালের দাপটই যেন শেষ কথা। জিততে জিততে ক্লান্ত হয়ে মাঝেমধ্যে নিজেরা পথ ছেড়ে না দিলে বাকিদের জেতার উপায় নেই।

গত এক দশকের গল্প কিংবা শিরোপা ক্যাবিনেটের দিকে তাকালে তেমন কিছুরই দেখা মিলবে। এক দশকে ৫ শিরোপা—এর বেশি ব্যাখ্যার বোধ হয় প্রয়োজন নেই। এবার কি তবে ভিন্ন কিছু হবে? ক্লপ কি পারবেন ‘ডন’ কার্লো আনচেলত্তির ‘মাস্তানি’ থামাতে। সেই প্রশ্নের উত্তরও সময়ের হাতে তোলা রইল। আমরা শুধু বাস্তবতাটা খতিয়ে দেখতে পারি।

এ মুহূর্তের পরিস্থিতির দিকে তাকালে মনে হবে, আগামী ফেব্রুয়ারি-মার্চে আরও একটি রিয়াল দাপটের পুনরাবৃত্তিই হবে। দুই দলের বর্তমান ছন্দ তেমন কিছুরই ইঙ্গিত দিচ্ছে। প্রিমিয়ার লিগে লিভারপুলের বর্তমান অবস্থান ৮ নম্বরে। ইতিমধ্যে হেরেছে ৪ ম্যাচ। চ্যাম্পিয়নস লিগেও নকআউটে গেছে নাপোলির পেছনে থেকে গ্রুপ রানার্সআপ হয়ে।

অন্য দিকে লা লিগায় রিয়াল এখন পর্যন্ত একটি ম্যাচে হেরেছে। চ্যাম্পিয়নস লিগে খেলছে দাপুটে ফুটবল। সেখানেও মাত্র একটি ম্যাচে হেরেছে তারা। এমন দল যে লিভারপুলকে অনায়সে হারাবে, তেমন ভাবাটাই প্রাসঙ্গিক। তবে এ ভাবনার মধ্যে কিন্তু ফাঁকিও আছে।

লিভারপুল-রিয়ালের এ দুটি ম্যাচ মাঠে গড়াবে ২০২৩ সালের ফেব্রুয়ারি ও মার্চে। মানে আরও তিন-চার মাস পর। এর মধ্যে নিষ্পত্তি হয়ে যাবে বিশ্বকাপ শিরোপারও। বিশ্বকাপ ও ক্রিসমাস শেষে নিশ্চিতভাবেই বড় ধরনের ওলট-পালট হতে যাচ্ছে।

লিভারপুলের এই মৌসুমে এখন পর্যন্ত ছন্দে না থাকার বড় কারণ দলটির চোট। লুইস দিয়াজ, দিওগো জোতাসহ একাধিক তারকা ফুটবলার দলের বাইরে, যাদের বিশ্বকাপ খেলার সম্ভাবনাও শেষ। বিশ্বকাপ খেলা হবে না মোহাম্মদ সালাহরও। তাঁর দেশ মিসর যে বাছাইপর্বের গণ্ডিই পেরোতে পারেনি। চোটে পড়া খেলোয়াড়েরা বিশ্বকাপ ও বড়দিনের বিরতির মধ্যে পুরোপুরি সেরে উঠবেন বলেই ধারণা করা হচ্ছে।

আর বিশ্বকাপে খেলতে না পারার কারণে সালাহও পাবেন লম্বা বিশ্রাম। বিশ্বকাপ দলে জায়গা না পাওয়া রবার্তো ফিরমিনোর ব্যাপারটাও তাই। এর মধ্যে জানুয়ারির দলবদলে লিভারপুলের খেলোয়াড় কেনার কথাও শোনা যাচ্ছে। বিশেষ করে মিডফিল্ড–ঘাটতি পোষাতে উন্মুখ থাকবে অ্যানফিল্ডের দলটি, যা রিয়ালের সামনে অন্য এক লিভারপুলকেই হাজির করতে পারে।

বিপরীতে রিয়ালের বেশির ভাগ খেলোয়াড়ই বিশ্বকাপে গভীরভাবে যুক্ত থাকবেন। করিম বেনজেমা, এদোয়ার্দো কামাভিঙ্গারা ফ্রান্সের হয়ে বিশ্বকাপ জিততেই যাবেন। যেমন ভিনিসিয়ুস জুনিয়র, রদ্রিগোরা যাবেন ব্রাজিলকে ষষ্ঠ বিশ্বকাপ জেতাতে। তাঁদের সাফল্য কিংবা ব্যর্থতা দুটিই রিয়ালের দুশ্চিন্তার কারণ হতে পারে।

শিরোপা জিততে হলে বা ভালো কিছু করতে হলে তাঁদের খেলতে হবে একেবারে ফাইনাল পর্যন্ত, যা শরীরিক ও মানসিকভাবে খেলোয়াড়দের ক্লান্ত করতে পারে। আর ব্যর্থ হলে সেটি তারকা খেলোয়াড়দের মানসিক বিপর্যয়ের কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে। এ ছাড়া বিশ্বকাপে চোট শঙ্কা তো রয়েছেই। এত লম্বা টুর্নামেন্টের ধকল সামলে চ্যাম্পিয়নস লিগের আসরে নিজেদের সেরাটা নিয়ে ফেরাটা রিয়াল খেলোয়াড়দের জন্য চ্যালেঞ্জিং হবে।

অবশ্য এমন নয় যে লিভারপুলের খেলোয়াড়দের বিশ্বকাপের মঞ্চে ভালো করার সুযোগ কম। আলিসন বেকার, ফাবিনিও, ফন ডাইকদেরও দারুণ কিছু করার সুযোগ আছে। তবে লিভারপুল গুরুত্বপূর্ণ কিছু ফুটবলারকে সতেজ অবস্থায় পাবে, যা তাদের রিয়ালের চেয়ে কিছুটা এগিয়ে রাখতে পারে।

ব্যক্তিগতভাবে সালাহর জন্যও ম্যাচটি অনেক কিছুর জবাব দেওয়ার। ফ্ল্যাশব্যাকে ২০১৮ সালে ফিরে গেলে নিজের দুর্দান্ত সালাহকেই আমরা খুঁজে পাব। অবিশ্বাস্য ছন্দে থেকে দলকে ফাইনালে তোলার পথে সামনে থেকে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন ‘ইজিপশিয়ান কিং’খ্যাত এই তারকা। তবে সালাহর জন্য সেই ফাইনাল পরিণত হয়েছিল এক কান্নাকাব্যের। সেই ফাইনালে রিয়াল ডিফেন্ডার সার্জিও রামোসের ট্যাকলে চোখ মুছতে মুছতে মাঠ ছেড়েছিলেন।

আর গতবার রিয়ালকে হারিয়ে শিরোপা জিততে চেয়েছিলেন সালাহ। মুক্তকণ্ঠে সেই ঘোষণাও দিয়েছিলেন। সালাহর আশাও পূরণ হয়নি। থিবো কোর্তোয়া নামের এক অতিমানবীয় দেয়ালের সামনে বারবার মুখ থুবড়ে পড়েছে সালাহর সব প্রচেষ্টা। ম্যাচের পর সালাহর কথা নিয়েও সমালোচনা হয়েছে অনেক। সেই সমালোচনার জবাব দেওয়ার উপলক্ষও আবার পেলেন সালাহ। দানে দান তিন দানেই হার নাকি এবার সালাহ ভাগ্য বদলাবেন, সেটিই দেখার অপেক্ষা থাকবে আবার।

এখনই ছেড়ে যাবেন না কিন্তু, উৎসবের উপলক্ষ আরও আছে, আছে প্রতিশোধেরও । ২০২০ সালের ফাইনালে প্রথমবারের মতো চ্যাম্পিয়নস লিগ জেতার সুযোগ পেয়েছিল পিএসজি। তবে বায়ার্ন মিউনিখের বাধা পেরোতে পারেননি নেইমার-এমবাপ্পেরা। প্রতিশোধ অবশ্য পরের মৌসুমেই নিয়েছিল পিএসজি। সেবার শেষ আটে মুখোমুখি হয়েছিল দুই দল। প্রথম লেগে ৩-২ গোলে জিতেছিল প্যারিসের পরাশক্তিরা।

তবে পরের লেগে ১-০ গোলে হারলেও অ্যাওয়ে গোলের সুবিধা নিয়ে নকআউটে গিয়েছিল পিএসজি। এবার পাল্টা প্রতিশোধের সুযোগ বায়ার্নের।

তবে দারুণ ছন্দে আছেন পিএসজির তিন তারকা—মেসি–নেইমার-এমবাপ্পে। তাঁদের কাঁধে ভর দিয়েই বায়ার্ন ‘পুলসিরাত’ পেরোতে চাইবে পিএসজি। বিশেষ করে দুর্দান্ত ছন্দে থাকা মেসিই হবেন বায়ার্নের সেই ‘গাণ্ডীব’ তথা শক্তিশালী ধনুক। এখন এই শক্তিতে বায়ার্ন-বধ করতে মরিয়া থাকবে পিএসজি।

অন্যদিকে বায়ার্নের মূল অনুপ্রেরণা গ্রুপ পর্বের পারফরম্যান্স। মরণকূপ থেকে বার্সেলোনাকে বিদায় করার পথে শতভাগ ম্যাচ জিতেছে বাভারিয়ান জায়ান্টরা। এখন ‘এমএনএম’ ত্রয়ী দুর্দান্ত এই বায়ার্নকে থামাতে পারে কিনা সেটাই দেখার অপেক্ষা।