আর্জেন্টিনা কি আসলেই মেসিনির্ভর দল, পরিসংখ্যান কী বলে

আর্জেন্টাইন কিংবদন্তি লিওনেল মেসিএএফপি
আর্জেন্টিনা কি আসলেই মেসিনির্ভর দল? পর্তুগাল কি রোনালদোকে নিয়ে ভালো, নাকি রোনালদোকে ছাড়া? এমবাপ্পের ওপর কতটা নির্ভরশীল ফ্রান্স কিংবা ভিনিসিয়ুসের ওপর ব্রাজিল?

ফুটবলে জিততে হলে দল হিসেবেই খেলতে হয়। কিন্তু দিন শেষে কিছু মানুষ রক্তমাংসের সীমানা পেরিয়ে মহাতারকা হয়ে ওঠেন, যাঁদের স্পর্শে ম্যাচের ভাগ্যরেখা বদলে যায়। ২০২৬ বিশ্বকাপে ঠিক এই দৃশ্যই দেখা যাচ্ছে। বিশ্বমঞ্চে আলো ছড়াচ্ছেন সেরা তারকারা। গোল্ডেন বুটের লড়াইয়ে তাকালেই সেটা স্পষ্ট।

৩ ম্যাচে ৬ গোল করে এই দৌড়ে সবার চেয়ে এগিয়ে লিওনেল মেসি। তাঁর ঠিক পেছনেই ৪টি করে গোল নিয়ে আছেন কিলিয়ান এমবাপ্পে, উসমান দেম্বেলে, আর্লিং হলান্ড ও ভিনিসিয়ুস জুনিয়র। ৩ ম্যাচে ৩ গোল নিয়ে দৌড়ে আছেন ইংল্যান্ড অধিনায়ক হ্যারি কেইনও। এমনকি ৪১ বছর বয়সেও ২ গোল করে তাঁদের সবার সঙ্গে লড়াইয়ের আভাস দিয়ে রেখেছেন ক্রিস্টিয়ানো রোনালদোও।

প্রশ্ন হলো, কোন দলটি তাদের মহাতারকার ওপর সবচেয়ে বেশি নির্ভরশীল? ২০২২ বিশ্বকাপের পর থেকে দলগুলোর সব পরিসংখ্যান ও পারফরম্যান্স বিশ্লেষণ করে ‘ইএসপিএন গ্লোবাল স্পোর্টস রিসার্চ’ খুঁজে বের করার চেষ্টা করেছে এই প্রশ্নের উত্তর।

লিওনেল মেসি (আর্জেন্টিনা)

প্রথম আলো গ্রাফিকস

আর্জেন্টিনা কি তবে ওয়ান-ম্যান টিম? এই বিশ্বকাপে তাদের ৮টি গোলের মধ্যে ৬টিই এসেছে মেসির পা থেকে। বিশ্বকাপে টানা ৭টি ম্যাচে গোল করার অনন্য কীর্তিও গড়েছেন আর্জেন্টাইন অধিনায়ক। তবে পরিসংখ্যানের সবচেয়ে বড় চমক হলো—মেসিকে ছাড়া আর্জেন্টিনার জয়ের হার এবং মেসিকে নিয়ে জয়ের হার একদম সমান!

গত বিশ্বকাপের পর থেকে বিশ্ব চ্যাম্পিয়নরা মেসিকে নিয়ে খেলে যেমন ৮৩ শতাংশ ম্যাচ জিতেছে, তাঁকে ছাড়াও ঠিক ৮৩ শতাংশ ম্যাচেই শেষ হাসি হেসেছে। অবশ্য তিনি মাঠে থাকলে গোলের হার বাড়ে—মেসি মাঠে থাকাকালীন আর্জেন্টিনা গোল করেছে ৫৮টি, আর না থাকলে ৩৫টি। ২০২২ সালের পর ৩০ ম্যাচে ২৫ গোল ও ৯টি অ্যাসিস্ট করে দলের মোট গোলের ২৭ শতাংশে নিজের নাম লিখেছেন মেসি। তবে বাস্তবতা এটাই যে মেসিকে ছাড়াও আর্জেন্টিনা মাঠের লড়াইয়ে সমান সমীহজাগানিয়া দল।

আরও পড়ুন

ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো (পর্তুগাল)

প্রথম আলো গ্রাফিকস

গত শনিবার কলম্বিয়ার বিপক্ষে পর্তুগালের গোলশূন্য ড্রয়ের ম্যাচে আল নাসর ফরোয়ার্ডের নিষ্প্রভ পারফরম্যান্স যাঁরা দেখেছেন, তাঁদের মনে এই প্রশ্ন জাগতেই পারে—কোচ রবার্তো মার্তিনেজ কেন কখনোই রোনালদোকে তুলে নেওয়ার সাহস দেখান না? ২০২২ সালের পর থেকে রোনালদোকে নিয়ে পর্তুগাল যে খুব বেশি ম্যাচ জিতেছে, তা নয়। সিআর সেভেনকে নিয়ে তাদের জয়ের হার ৬৭ শতাংশ, যা তিনি না থাকলে সামান্য কমে দাঁড়ায় ৬৩ শতাংশে।

ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড ও রিয়াল মাদ্রিদের সাবেক এই মহাতারকার ধার আগের চেয়ে কিছুটা কমলেও, পরিসংখ্যান বলছে তিনি মাঠে থাকলে পর্তুগাল দলগতভাবে কিছুটা এগিয়ে থাকে। তিনি থাকলে দল গোল বেশি করে (৬৮ বনাম ৪০) এবং সুযোগ তৈরি করে বেশি (৩৮১ বনাম ১৮৫)। তবে রোনালদোকে ছাড়াও পর্তুগাল গোল উৎসব করতে পারে; এই সময়ে তাদের ৭৫ শতাংশ গোলই এসেছে অন্য ফুটবলারদের পা থেকে।

হ্যারি কেইন (ইংল্যান্ড)

প্রথম আলো গ্রাফিকস

১১৭ ম্যাচে ৮২ গোল করে হ্যারি কেইন দেশের ইতিহাসের সর্বোচ্চ গোলদাতা; দ্বিতীয় ওয়েইন রুনির চেয়ে ২৯ গোল বেশি। টমাস টুখেলের দল যে বায়ার্ন মিউনিখের এ ফরোয়ার্ডের ওপর একটু বেশিই নির্ভরশীল, তা সংখ্যাগুলোই চিৎকার করে বলছে। ২০২২ সালের পর থেকে কেইনকে ছাড়া ইংল্যান্ড তাদের মাত্র ২৯ শতাংশ ম্যাচ জিততে পেরেছে! অথচ কেইন মাঠে থাকলেই জয়ের সেই হার লাফিয়ে দাঁড়ায় ৭৬ শতাংশে! মাঠে কেইনের উপস্থিতি প্রতিপক্ষের ডিফেন্সের বুকে কাঁপন ধরিয়ে দেয়।

২০২২ সালের পর কেইনকে নিয়ে ইংল্যান্ড করেছে ৭৩ গোল, অথচ তিনি না থাকলে সেই সংখ্যাটা নেমে আসে মাত্র ১৯-এ! একইভাবে কেইন ছাড়া দল যেখানে মাত্র ১৬৮টি সুযোগ তৈরি করতে পেরেছে, সেখানে কেইন মাঠে থাকলে গোলের সুযোগ তৈরির সংখ্যা দাঁড়ায় ৩৫১। এই সময়ে ইংল্যান্ডের মোট গোলের ৩২ শতাংশই করেছেন কেইন, যা মেসি বা রোনালদোর চেয়েও ঢের বেশি।

কিলিয়ান এমবাপ্পে (ফ্রান্স)

প্রথম আলো গ্রাফিকস

এবারের বিশ্বকাপ জয়ের অন্যতম হট ফেবারিট ভাবা হচ্ছে ফ্রান্সকে। উসমান দেম্বেলে, মাইকেল অলিসে, দেজিরে দুয়ে কিংবা ব্র্যাডলি বারকোলা—প্রত্যেকেই বিশ্বমানের খেলোয়াড়। কিন্তু তাঁদের ভিড়েও কিলিয়ান এমবাপ্পেই ফ্রান্সের আসল ‘সুপারস্টার’। এমবাপ্পে যখন একাদশে থাকেন না, ব্লুজদের জয়ের হার নেমে আসে ঠিক ৫০ শতাংশে। আর তিনি মাঠে নামলেই জয়ের হার বেড়ে হয় ৭১ শতাংশ। এমনকি এমবাপ্পে মাঠে থাকলে গোল করার অনুপাত ৩ গুণেরও বেশি বেড়ে যায়। সুযোগ তৈরির ক্ষেত্রেও এমবাপ্পের উপস্থিতি ফ্রান্সকে অনেক বেশি ক্ষুরধার করে তোলে।

এমবাপ্পে মাঠে থাকাকালীন দল ৪৭২টি সুযোগ তৈরি করেছে, যেখানে তিনি না থাকলে সুযোগ তৈরি হয়েছে মাত্র ১৫৪টি। অবশ্য এমবাপ্পেকে ছাড়াও ফ্রান্স গোল করতে পারে। ২০২২ সাল থেকে দলের ২৪ শতাংশ গোল এসেছে তাঁর পা থেকে; যা প্রমাণ করে কোচ দিদিয়ের দেশম তাঁর বাকি ফরোয়ার্ডদের কাছ থেকেও সেরাটা আদায় করার মন্ত্রটা ভালোই জানেন।

আরও পড়ুন

ভিনিসিয়ুস জুনিয়র (ব্রাজিল)

প্রথম আলো গ্রাফিকস

নিশ্চিতভাবেই কার্লো আনচেলত্তির এই ব্রাজিল দলের সবচেয়ে বড় বিজ্ঞাপন ভিনিসিয়ুস জুনিয়র। এই বিশ্বকাপে তাঁর পারফরম্যান্সও সে কথাই বলছে। তবে সামগ্রিকভাবে, ২৫ বছর বয়সী এই তারকার সেলেসাওদের জার্সিতে রেকর্ড কিছুটা মলিন—৫২ ম্যাচে গোল মাত্র ১৩টি।

আন্তর্জাতিক ফুটবলে তাঁর গোল করার এই হার সমসাময়িক প্রতিদ্বন্দ্বীদের চেয়ে বেশ কম। তাই হয়তো ভিনি না থাকলেও ব্রাজিল খুব একটা বিপদে পড়ে না। ২০২২ সালের পর থেকে ভিনিকে ছাড়া ব্রাজিল তাদের ৬৩ শতাংশ ম্যাচ জিতেছে, অথচ তিনি যখন মাঠে ছিলেন, জয়ের হার উল্টো কমে দাঁড়িয়েছে মাত্র ৪৪ শতাংশে! অবশ্য ভিনি যখন খেলেন, দল গোল বেশি পায় (৪৮ বনাম ২৫) এবং সুযোগও তৈরি হয় বেশি (২৬৯ বনাম ১২০)।

লামিনে ইয়ামাল (স্পেন)

বার্সেলোনার এই বিস্ময়বালক ইতিমধ্যেই ইউরো ২০২৪-এ স্পেনের হয়ে ট্রফির স্বাদ পেয়ে গেছেন। ২০২৩ সালের আগস্টে অভিষেকের পর থেকে প্রতি ৪ ম্যাচে ১টি করে গোল (২৮ ম্যাচে ৭ গোল) করেছেন এই ফরোয়ার্ড। স্পেন এমন এক দল, যারা একক কোনো গোলদাতার ওপর খুব বেশি নির্ভরশীল নয়। তাই লুইস দে লা ফুয়েন্তের দল ইয়ামালের ওপর ঠিক কতটা নির্ভর করে, তা সংখ্যা দিয়ে মাপা কঠিন। তবে ইয়ামাল যে এক বিরল প্রতিভা এবং আগামী দিনে ‘লা রোহা’দের আক্রমণের মূল শক্তি হবেন, তা নিয়ে সংশয় নেই। যদিও বর্তমান পরিসংখ্যান বলছে, ইয়ামালকে ছাড়াই স্পেন বেশি ম্যাচ জেতে! ইয়ামালহীন স্পেনের জয়ের হার ৭৫ শতাংশ, যা তিনি খেললে কমে হয় ৭১ শতাংশ। ইয়ামাল মাঠে থাকলে দল সামান্য কিছু গোল বেশি করে (৫৯ বনাম ৫৪), কিন্তু ইয়ামালকে ছাড়া দল সুযোগ তৈরি করে বেশি (৩২২ বনাম ৩০৬)। ২০২২ সাল থেকে স্পেনের মোট গোলের মাত্র ৬ শতাংশ এসেছে তাঁর পা থেকে। মাত্র তিন বছর আগে আন্তর্জাতিক ফুটবলে পা রাখায় এই সংখ্যাটা কম হওয়াই স্বাভাবিক। ইয়ামাল স্পেনের আক্রমণের অন্যতম বড় অস্ত্র হলেও, তাঁকে ছাড়াও স্পেন বেশ ভালোভাবেই মানিয়ে নিতে পারে।

আর্লিং হলান্ড (নরওয়ে)

প্রথম আলো গ্রাফিকস

নরওয়ের ক্ষেত্রে সত্যিটা হলো—‘নো হলান্ড, নো পার্টি’। এই তো গত সপ্তাহেই ফ্রান্সের কাছে ৪-১ গোলে হেরে হলান্ডহীন জীবনের একটা তিক্ত স্বাদ পেয়েছে নরওয়ে। বোস্টনের সেই ম্যাচে হলান্ডের বিকল্প হিসেবে মাঠে নামা ফরোয়ার্ড জোরগেন স্ট্র্যান্ড লারসেনের পেনাল্টি মিস নরওয়ের ধারহীন আক্রমণভাগকে আরও নগ্নভাবে ফুটিয়ে তোলে। হলান্ডকে নিয়ে নরওয়ে এক সম্পূর্ণ অন্য দল—তিনি থাকলে যেখানে জয়ের হার ৬৯ শতাংশ, তিনি না থাকলে তা এক ধাক্কায় নেমে আসে ২৫ শতাংশে! ২০২২ সালের পর হলান্ড যখন খেলেছেন, নরওয়ে গোল করেছে ৭৪টি, আর তিনি না থাকলে করতে পেরেছে মাত্র ২১টি!

২৫ বছর বয়সী ম্যানচেস্টার সিটির এই গোলমেশিন ২০২২ সালের পর থেকে ৩৮টি গোল ও ৪টি অ্যাসিস্ট করেছেন। নরওয়ের মোট গোলের আকাশচুম্বী ৪০ শতাংশই এসেছে তাঁর একক অবদান থেকে! পরিসংখ্যান কেইনের ওপর ইংল্যান্ডের নির্ভরতার কথা বললেও, এই বিশ্বকাপে হলান্ড নরওয়ের জন্য যতটা গুরুত্বপূর্ণ, অন্য কোনো দলের কাছে তাদের সেরা তারকা ততটা নন। সহজ কথায়, হলান্ড সুস্থ থাকলে নরওয়ে এই টুর্নামেন্টে অনেক দূর যেতে পারে। আর তিনি না থাকলে? নরওয়ের জন্য বিমানের টিকিটটা বোধ হয় একটু আগেই কেটে রাখতে হবে!