ইউরোতে স্কুলের হোমওয়ার্ক করা ছেলেটির সামনে আজ বিশ্বকাপ ট্রফির হাতছানি
ফাইনালের দুই দিন আগে নিউইয়র্কের ‘ফ্যানাটিকস ফেস্টে’ লিওনেল মেসি, রদ্রি, দুই দলের কোচসহ ছিলেন আরও অনেক সেলিব্রিটি। তার মধ্যেও আলোকচিত্রীদের ক্যামেরা নিশ্চয়ই খুঁজে বেড়াচ্ছিল আরেকজনকেও।
কিন্তু তিনি তখন নিউইয়র্কের ঝলমলে রোদে ভাই ও বান্ধবীর সঙ্গে নির্ভার সময় কাটাচ্ছেন। লামিনে ইয়ামাল সেখানে ছিলেন না, তবে প্রশ্ন হয়েছে তাঁকে নিয়েও। আজকের ফাইনালে স্পেনের আলো তো তাঁর ওপরই বেশি পড়ছে!
১৯ বছরের মেসির সঙ্গে পাঁচ মাস বয়সী ইয়ামালের ২০০৭ সালের ছবিটা এর মধ্যেই হয়তো আপনি দেখে ফেলেছেন, জানা হয়ে গেছে পেছনের গল্পটাও।
পরশু মেসিকে আবার সেটি মনে করিয়ে দেওয়ায় হাসতে হাসতে বললেন, ‘এটা অবিশ্বাস্য। আমরা দুজনই যে বিশ্বকাপে খেলছি, এটাই তো একটা পাগলামি!’
এরপর ইয়ামালের প্রশংসা করে একটু দুষ্টুমিও করলেন, ‘সে অসাধারণ ফুটবলার। কিন্তু এবার যাতে সে চ্যাম্পিয়ন হতে না পারে, সে জন্য আমি সর্বোচ্চ চেষ্টা করব!’
মেসিরা যে ইয়ামালকে আটকে দেওয়ার ছক কষছেন, ১৯ বছর বয়সী ফুটবলারের জন্য সেটি স্বপ্নের চেয়েও বেশি কিছু হওয়ার কথা। দুই বছর আগেও ইউরোতে গিয়ে যে ছেলেটা স্কুলের বাড়ির কাজ করত জাতীয় দলের হয়ে খেলার ফাঁকে, সে এখন বিশ্বকাপ ফুটবলের ফাইনালে খেলবে—এমন তো আসলে রূপকথাতেই হয়!
ইয়ামালের জীবনটাই আসলে এমন। মেসির সঙ্গে ওই ছবির কথাই ধরুন। বার্সেলোনার হাজার হাজার শিশু থাকতে ইয়ামালের সঙ্গেই কেন ছবি তুললেন মেসি? ইয়ামাল কিন্তু আদতে ‘খাঁটি’ স্প্যানিশও নন। বাবা মরোক্কান, মা ইকুয়েটোরিয়াল গিনির।
বার্সেলোনা থেকে ঘণ্টাখানেক দূরত্বের মাতারোর রোকাফোন্দোয় বড় হয়ে ওঠা। সেই স্মৃতি খুব সুখকর নয়। ইয়ামাল নিজেই বলেছেন, ছেলেবেলা থেকে দেখা পরিবারের আর্থিক সংগ্রাম অল্প বয়সেই তাঁকে পরিণত করেছে।
এমন নয় যে এই বিশ্বকাপে অসাধারণ কিছু করে ফেলেছেন ইয়ামাল। গ্রুপ পর্বের দ্বিতীয় ম্যাচে সৌদি আরবের বিপক্ষে করা গোলটাই বিশ্বকাপে তাঁর একমাত্র লক্ষ্যভেদ। কিন্তু ইয়ামালের অবদান তো গোল করাতেই থেমে নেই! ফ্রান্সের বিপক্ষে সেমিফাইনালে যেমন আদায় করেছেন মহামূল্যবান পেনাল্টি।
আবার সেই ম্যাচে এমবাপ্পেকে ঠেকাতে নেমে গেছেন রক্ষণেও। তবে এটাও ঠিক, এই বিশ্বকাপের আগে থেকেই চোটের সঙ্গে লড়াই চলছে ইয়ামালের। পর্তুগালের বিপক্ষে শেষ ষোলোতে বিশ্বকাপে প্রথম পুরো ৯০ মিনিট খেলতে পেরেছেন। সেমিফাইনালের দুই দিন আগেও দলের সঙ্গে অনুশীলন করতে পারেননি। পরে অবশ্য স্পেন কোচ লুইস দে লা ফুয়েন্তে আশ্বস্ত করেছেন, ইয়ামালের চোট গুরুতর কিছু নয়।
মেসির সঙ্গে ইয়ামালের তুলনা শুরু হয়ে গেছে অনেক দিন থেকেই। ১৯ বছর বয়সেই দেশ ও ক্লাবের হয়ে ১৩৩টি ম্যাচ খেলে ফেলেছেন ইয়ামাল, গোল ৩৭টি। অথচ এই বয়সে মেসি ৩৫ ম্যাচ খেলে করেছিলেন ৯ গোল। এমনকি ১৯ বছরের পেলে ও ম্যারাডোনাও এত গোল করতে পারেননি!
পেশাদার ক্যারিয়ারে তিন বছরের বেশি হয়ে গেছে ইয়ামালের। ২০২৩ সালের এপ্রিলে বার্সেলোনার জার্সিতে অভিষেক বয়স ১৬ হওয়ার আগেই। এরপর রেকর্ডবুক তোলপাড় করে বার্সেলোনার হয়ে সবচেয়ে কম বয়সে একাদশে অভিষেক, লিগে সবচেয়ে কম বয়সী গোলদাতা, এল ক্লাসিকোয় সবচেয়ে কম বয়সী খেলোয়াড়। তারপর এল ২০২৪ ইউরো, যেখানে সেমিফাইনালে ফ্রান্সের বিপক্ষে বাঁ পায়ের সেই জাদুকরি গোল।
এত অল্প বয়সে তারকা খ্যাতি পেয়েও পা দুটি মাটিতেই আছে। স্পেন কোচ লুইস দে লা ফুয়েন্তের ভাষায়, ‘ইয়ামালকে গণমাধ্যমের অনেক চাপ নিতে হয়। কিন্তু এত কিছুর পরও ও খুব কম ভুল করে।’
লিওনেল স্কালোনি চাইবেন, ইয়ামাল আজ অন্তত ভুলটা করুন। আর্জেন্টিনা কোচ গত পরশু সংবাদ সম্মেলনে হাসতে হাসতে বলছিলেন, সুযোগ পেলে ইয়ামালকে তিনি ফাইনালের আগে ঘরবন্দী করে তালা মেরে রাখতেন। কিন্তু এই বয়সেই যে যেকোনো রক্ষণের তালা ইয়ামাল খুলে ফেলতে পারেন, তা কি আর স্কালোনির অজানা!