‘অন্য দেশের জন্য আর গলা ফাটাতে হবে না’—বিশ্বকাপের আগে রোমাঞ্চিত হলান্ড
দীর্ঘ ২৬ বছরের এক দীর্ঘশ্বাস। যে খরা শুরু হয়েছিল ২০০০ সালের ইউরোর পর, তা অবশেষে কাটল। নরওয়ে যখন সবশেষ কোনো বড় টুর্নামেন্টে খেলেছিল, আর্লিং হলান্ডের জন্ম হতে তখনো ১৯ দিন বাকি! আর বিশ্বকাপে? সে তো আরও আগের গল্প—১৯৯৮ সালের ফ্রান্স আসর। বেড়ে ওঠার পুরোটা সময় ফুটবলের সবচেয়ে বড় মঞ্চে নিজের দেশকে দেখার সৌভাগ্য হয়নি ম্যানচেস্টার সিটির এই গোলমেশিনের। প্রতিবার বাধ্য হয়ে গলা ফাটিয়েছেন অন্য দেশের জন্য। অবশেষে ঘুচল সেই আক্ষেপ। চারবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন ইতালিকে পেছনে ফেলে ২০২৬ বিশ্বকাপের টিকিট কেটেছে নরওয়ে। আর এই রূপকথার প্রধান নায়ক? বাছাইপর্বে গোলের বন্যা বইয়ে দেওয়া সেই আর্লিং হলান্ড।
ফিফার সঙ্গে এক একান্ত আলাপচারিতায় নরওয়েজিয়ান এই স্ট্রাইকার মেলে ধরলেন তাঁর ভেতরের আবেগ, বাবার স্মৃতি আর এক বুক স্বস্তি। ২০২৬ উত্তর আমেরিকা বিশ্বকাপে নরওয়ের ফেরার গল্পে হলান্ড এক লড়াকু চরিত্র।
অস্ট্রিয়া, জার্মানি কিংবা ইংল্যান্ড—যেখানেই পা রেখেছেন, সোনা ফলিয়েছেন হলান্ড। সদ্য সমাপ্ত ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগেও জিতেছেন গোল্ডেন বুট। ট্রফি ক্যাবিনেটে উপচে পড়া ভিড়, অথচ তাঁর সিভিতে এত দিন একটা বড় শূন্যতা ছিল—আন্তর্জাতিক কোনো বড় টুর্নামেন্টে না খেলা। এবার সেই আক্ষেপ মিটছে। বাছাইপর্বে যৌথভাবে রেকর্ড ১৬ গোল করা এই স্ট্রাইকারের কাছে নিজের রেকর্ডের চেয়ে দেশের প্রাপ্তিটাই প্রকাণ্ড।
হলান্ড বলছিলেন, ‘বিষয়টা নিয়ে কথা বলা অস্বস্তিকর নয়, তবে এটা ছিল দীর্ঘ এক অপেক্ষা। দীর্ঘদিন ধরে আমরা চেষ্টা করেছি, কিন্তু সফল হইনি। একটা সময় তো মনে হতো, আমরা যেন এ ব্যর্থতাতেই অভ্যস্ত হয়ে গিয়েছিলাম! আমি নিজেই কখনো নরওয়েকে বিশ্বকাপে খেলতে দেখিনি।’ ব্যক্তিগত অর্জনের চেয়ে দেশের শিশুদের জন্য তাঁর আনন্দটা বেশি। হলান্ডের ভাষায়, ‘ছোটবেলায় বিশ্বকাপ দেখার সময় আমাকে অন্য দেশকে সমর্থন করতে হতো। এখন নরওয়ের শিশুরা সেই আক্ষেপে পুড়বে না। নিজের দেশকে বিশ্বকাপে দেখার আনন্দ ওরা পাবে, এটাই আমার সবচেয়ে বড় তৃপ্তি।’
ইতিহাসের এক অদ্ভুত চক্র পূরণ হতে যাচ্ছে এবার। উত্তর আমেরিকার এই বিশ্বকাপে গ্রুপ পর্বে নরওয়ের তিনটি ম্যাচই যুক্তরাষ্ট্রে। ৩২ বছর আগে, ১৯৯৪ সালের যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বকাপে খেলেছিলেন হলান্ডের বাবা আলফ-ইঙ্গস হলান্ড। সেবার জায়ান্টস স্টেডিয়ামে ইতালির বিপক্ষে মাঠে ছিলেন তিনি। সময়ের পরিক্রমায় সেই স্টেডিয়াম ভেঙে এখন গড়া হয়েছে নিউইয়র্ক নিউ জার্সি স্টেডিয়াম। আর এখানেই নিজেদের ম্যাচে সেনেগালের মুখোমুখি হবে নরওয়ে।
বাবার স্মৃতিধন্য সেই আঙিনায় দাঁড়াতে রোমাঞ্চ ছুঁয়ে যাচ্ছে ছেলেকে। বাবার কাছ থেকে শোনা বিশ্বকাপের গল্প ভাগ করে নিলেন হলান্ড, ‘বাবা বলতেন, বিশ্বকাপের গ্রুপ পর্বের ম্যাচগুলো একেকটা ফাইনালের মতো। যেখানে সবাই দেশের জন্য নিজেকে উজাড় করে দেয়। এ কারণেই বিশ্বকাপে প্রায়ই ছোট দলগুলো বড়দের হারিয়ে দেয়।’
শুধু বাবা নন, মায়ের কাছ থেকেও শুনেছেন গ্যালারির সেই স্নায়ুচাপের গল্প। হলান্ড মনে করেন, ফুটবল এভাবেই মানুষকে, একটা পুরো দেশকে এক সুতায় বেঁধে ফেলে। ২৮ বছর পর যখন বিশ্বকাপে ইরাকের বিপক্ষে নিজেদের প্রথম ম্যাচ খেলতে মাঠে নামবে নরওয়ে, কেমন হবে সেই অনুভূতি? হলান্ড যেন এখনই সেই রোমাঞ্চের সাগরে ভাসছেন। মুচকি হেসে বললেন, ‘স্বপ্ন সত্যি হওয়ার মতো একটা অনুভূতি হবে। যেহেতু এই অভিজ্ঞতা আমার আগে কখনো হয়নি, তাই অনুভূতিটা হবে একদম অন্য রকম, ভীষণ আকর্ষণীয় আর বিস্ময়কর। আমি এখন শুধু সেই মুহূর্তটার দিকেই তাকিয়ে আছি।’
বিশ্ব ফুটবলে নরওয়ে এক পরাশক্তি হয়ে ফিরবে কি না, তা সময়ই বলবে। তবে হলান্ডের হাত ধরে নরওয়ের এই পুনরুত্থান ফুটবল রোমান্টিকদের মনে দোলা দিতে বাধ্য। নরওয়ের নতুন প্রজন্মকে আর যা-ই হোক, অন্তত টিভির সামনে বসে অন্য দেশের পতাকা গায়ে জড়াতে হবে না।