‘৮০০ পাসে মৃত্যু’ থেকে ‘স্বপ্নের সমাপ্তি’—মেসিদের বিদায়ে আর্জেন্টাইন সংবাদমাধ্যম
নিউ জার্সির মেটলাইফ স্টেডিয়ামে যখন রেফারির শেষ বাঁশি বাজল, তখন মাঠের সবুজ ঘাসে লুটিয়ে পড়েছেন আকাশি-সাদারা। গ্যালারিতে তখন কান্নার রোল। কাতার বিশ্বকাপের চ্যাম্পিয়নদের সিংহাসনচ্যুত করে ফুটবলের নতুন রাজা এখন স্পেন।
অতিরিক্ত সময়ের নাটকীয়তায় ১-০ গোলের এই হারে ভেঙে গেছে আর্জেন্টিনার টানা দ্বিতীয়বার বিশ্বজয়ের স্বপ্ন। সম্ভবত এখানেই ইতি ঘটল লিওনেল মেসির বিশ্বকাপ অধ্যায়েরও।
দারুণ এক টুর্নামেন্ট খেলে ফাইনালে এসেছিল আর্জেন্টিনা; কিন্তু শিরোপার মঞ্চে স্পেনের কাছে এই হার মেনে নিতে পারছে না দেশটির সংবাদমাধ্যম। তবে আর্জেন্টিনার গণমাধ্যমে এই পরাজয় কেবলই এক বিষাদের গল্প নয়; বরং মাথা উঁচু করে বিদায় নেওয়ার এক বীরত্বগাথা।
ম্যাচের নির্ধারিত সময় শেষ হয়েছিল গোলশূন্য সমতায়; কিন্তু ১০৬ মিনিটে স্পেনের ফেরান তোরেসের করা একমাত্র গোলটিই গড়ে দেয় ম্যাচের ভাগ্য। অবশ্য তার আগেই বড় ধাক্কা খায় আর্জেন্টিনা। নির্ধারিত সময়ের শেষ দিকে এনজো ফার্নান্দেজ দ্বিতীয় হলুদ কার্ড দেখে মাঠ ছাড়লে ১০ জনের দলে পরিণত হয় লিওনেল স্কালোনির দল।
লুইস দে লা ফুয়েন্তের স্পেন পুরো ম্যাচে প্রায় ৮০০ পাস খেলে একচেটিয়া আধিপত্য বিস্তার করে। আর্জেন্টিনার গোলরক্ষক এমিলিয়ানো মার্তিনেজ একের পর এক সেভ না করলে ব্যবধান আরও বাড়তে পারত; কিন্তু শেষ পর্যন্ত ১০ জনের দলের সেই টিকে থাকার লড়াই থামে তোরেসের ওই এক গোলে।
ম্যাচ শেষে আর্জেন্টিনার সংবাদমাধ্যমগুলো আবেগ ও শ্রদ্ধায় ভাসিয়েছে তাদের দলকে। বিখ্যাত স্পোর্টস দৈনিক ‘ওলে’ স্পেনের শ্রেষ্ঠত্ব মেনে নিয়েও লিখেছে, ‘আর্জেন্টিনা সর্বস্ব দিয়েছে এবং মাথা উঁচু রেখেই বিদায় নিয়েছে।’
অন্যদিকে ‘টিওয়াইসি স্পোর্টস’ তাদের প্রতিবেদনে স্পেনের আধিপত্যের কথা স্বীকার করে শিরোনাম করেছে, ‘রেকর্ডসংখ্যক সেভ এবং ৮০০ পাসে মৃত্যু’। গোলরক্ষক মার্তিনেজের দারুণ পারফরম্যান্সকে তারা তুলে ধরেছে আর্জেন্টিনার হার না–মানা মানসিকতা হিসেবে।
আর্জেন্টিনার ঐতিহ্যবাহী সংবাদমাধ্যম ‘ক্লারিন’ এই ম্যাচকে দেখছে ফুটবলের এক মহাকাব্যের সমাপ্তি হিসেবে। তাদের মতে, মেসির ছয়টি বিশ্বকাপ খেলার অধ্যায়ের পাশাপাশি সম্ভবত এখানেই শেষ হলো কোচ স্কালোনির এক সফল যুগ। স্কালোনির অধীন আর্জেন্টিনা জিতেছে চারটি শিরোপা, খেলেছে টানা পাঁচটি ফাইনাল।
সবচেয়ে আবেগঘন প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে ‘পেজ ১২’। ২০২১ সালে মারাকানা স্টেডিয়ামে কোপা আমেরিকা জয়ের পর থেকে টানা পাঁচ বছর নয় দিন বিশ্ব ফুটবলে রাজত্ব করেছে আর্জেন্টিনা।
সেই সোনালি সময়ের কথা মনে করিয়ে দিয়ে তারা লিখেছে, ‘যদি এই দুর্দান্ত যাত্রার শেষ হতেই হতো, তবে বিশ্বকাপ ফাইনালের মতো বড় মঞ্চেই হওয়া উচিত ছিল।’ কোনো টাইব্রেকার ছাড়াই ফেরান তোরেসের গোলে শেষ হওয়া এ বিকেলটিকে তারা ‘একবুক আক্ষেপের’ বলে বর্ণনা করেছে।
সংক্ষিপ্ত কিন্তু জোরালো ভাষায় আর্জেন্টিনার এই বিদায়কে সম্মান জানিয়েছে ‘এল গ্রাফিকো’। ১০ জন নিয়ে অতিরিক্ত সময় পর্যন্ত লড়ে যাওয়া আর্জেন্টিনার এই বিদায়কে তারা ফুটবলপ্রেমীদের জন্য এক ‘মন খারাপের দলিল’ বলে উল্লেখ করেছে। আর ‘লা নাসিওন’ তাদের প্রতিবেদনে লিখেছে, টাইব্রেকারের ঠিক আগমুহূর্তের স্তব্ধতা আর্জেন্টিনার সব স্বপ্নের সমাপ্তি টেনে দিল।
আর্জেন্টিনার সংবাদমাধ্যমগুলোর এই প্রতিক্রিয়া বিশ্লেষণ করলে একটি সুরই স্পষ্ট—দলের এই হারে তারা ব্যথিত; কিন্তু যেভাবে শেষ পর্যন্ত খেলোয়াড়েরা লড়েছেন, তাতে তাঁরা গর্বিত। মাঠের পারফরম্যান্সে শ্রেষ্ঠত্ব দেখিয়ে স্পেন হয়তো ট্রফিটা নিয়ে গেছে; কিন্তু আর্জেন্টিনা বিদায় নিয়েছে দেশে তাদের কোটি ভক্তের হৃদয় জয় করে।