‘নীরব ঘাতক’ রদ্রি যেভাবে বিশ্বকাপ–সেরা

গোল্ডেন বল হাতে রদ্রিএএফপি

২০২৪ সালে ফেবারিট ভিনিসিয়ুস জুনিয়রকে পেছনে ফেলে ব্যালন ডি’অর জেতেন রদ্রি। কিন্তু স্প্যানিশ এই মিডফিল্ডারের হাতে ট্রফি উঠলেও অনেকেই সেটি মেনে নিতে পারেননি।

কারও মতে, পুরস্কারটি ভিনিসিয়ুসেরই প্রাপ্য ছিল। ক্ষোভে রিয়াল মাদ্রিদের প্রতিনিধিরা প্যারিসের অনুষ্ঠান পর্যন্ত বর্জন করেছিলেন। বিশ্বকাপ ও গোল্ডেন বল জেতার মধ্য দিয়ে সেই বিতর্কের জবাব গতকাল নিউ জার্সির মেটলাইফ স্টেডিয়ামেই দিয়েছেন রদ্রি! বুঝিয়ে দিয়েছেন, সেদিন ব্যালন ডি’অরের ট্রফিটা তাঁর যোগ্য হাতেই উঠেছিল।

একই সঙ্গে বিশ্বকাপ ও ব্যালন ডি’অর জিতে একাধিক বিরল কীর্তিও গড়েছেন এই স্প্যানিশ মিডফিল্ডার। ইতিহাসে মাত্র একাদশ খেলোয়াড় হিসেবে বিশ্বকাপ, উয়েফা চ্যাম্পিয়নস লিগ ও ব্যালন ডি’অর—এই তিনটি মর্যাদাপূর্ণ শিরোপা জয়ের কৃতিত্ব অর্জন করেছেন তিনি।

পাশাপাশি মাত্র চতুর্থ ফুটবলার হিসেবে বিশ্বকাপ, চ্যাম্পিয়নস লিগ, ব্যালন ডি’অর এবং বিশ্বকাপের সেরা খেলোয়াড়ের পুরস্কার গোল্ডেন বল জিতেছেন রদ্রি। যে তালিকায় আগে থেকে আছেন পাওলো রসি, জিনেদিন জিদান ও লিওনেল মেসি।
রদ্রিকে নিয়ে বিতর্ক অবশ্য কেউ চাইলে এখনো করতে পারেন। কেউ কেউ করছেনও।

গোল্ডেন বল পেলেন না মেসি
এএফপি

লিওনেল মেসির অতিমানবীয় পারফরম্যান্স বাদ দিয়ে রদ্রি কীভাবে গোল্ডেন বল পান, এমন প্রশ্নও সামনে এসেছে। তবে কেউ যদি বিশ্বকাপে রদ্রির পারফরম্যান্সের দিকে একটু সতর্ক দৃষ্টি রাখেন, তবে বুঝতে পারবেন, কীভাবে তাঁর হাতে উঠে এল এই ট্রফি। তা–ও আবার বিশ্বকাপে কোনো গোল বা অ্যাসিস্ট না করেই।

বিশ্বকাপে কোনো গোল না করলেও বলের দখল ধরে রাখা, নিখুঁত পাস, অসাধারণ পজিশনিং ও ম্যাচের গতি নিয়ন্ত্রণে রদ্রির অবদান ছিল অনন্য। টুর্নামেন্টে সবচেয়ে বেশি পাস সম্পন্ন করা, সবচেয়ে বেশি দূরত্ব দৌড়ানো এবং সবচেয়ে বেশি খেলায় সম্পৃক্ত থাকার কৃতিত্ব তাঁর দখলে।

ফাইনালেই চোখ রাখা যাক। জয়সূচক গোলটি করেছেন ফেরান তোরেস। অতিরিক্ত সময়ে নিকো উইলিয়ামসের হেড থেকে আসা বল জালে জড়িয়ে স্পেনকে ট্রফির দেখা করিয়ে দেন এই উইঙ্গার। তবে পুরো ম্যাচে স্পেনের ম্যাচ নিয়ন্ত্রণের মূল চালিকা শক্তি ছিলেন রদ্রিই। ম্যাচে তাঁর দেওয়া ১০৬টি পাসের ১০১টিই ছিল সঠিক (৯৫ শতাংশ), ৯টি লং বলে সফল ৮টিই (৮৯%)।

তবে রদ্রির এমন পর্যায়ে আসা সহজ ছিল না। ২০২৪ সালে অপয়া এক চোট তাঁর ক্যারিয়ারকেই ফেলে দিয়েছিল শঙ্কার মুখে। তবে সেই শঙ্কা উড়িয়ে রদ্রি ঠিকই ফিরেছেন। ঠিক সেভাবে যেমনটা বলেছিলেন পেপ গার্দিওলা। ম্যানচেস্টার সিটি কোচ বলেছিলেন, ‘বিশ্বকাপে আমরা রদ্রির সেরা সংস্করণ দেখব, আর পরের মৌসুমে দেখব আরও সেরা রদ্রিকে।’

শেষ পর্যন্ত সেটিই সত্যি হলো। বিশ্বকাপে রদ্রি ফিরলেন অনন্য, অসাধারণ হয়ে। ফাইনালে এই মিডফিল্ড জেনারেলের বিছানো ফাঁদ এড়িয়ে আর্জেন্টিনা একটি শটও লক্ষ্যে রাখতে পারেনি। এর আগে সেমিফাইনালে ফ্রান্সের বিপক্ষে ২-০ জয়েও তিনি ছিলেন স্পেনের মাঝমাঠের প্রাণভোমরা। শুধু বলের নিয়ন্ত্রণ বা খেলার গতি নির্ধারণই নয়, চোটের পর তাঁর চলাফেরা ও গতিশীলতা নিয়েও যে প্রশ্ন ছিল, সেটিরও জবাব দিয়েছেন মাঠের পারফরম্যান্সে।

তবে নিয়মিত ইতিবাচক ভূমিকা রাখলেও নিজের সেরা দিনে রদ্রিকে থামানো রীতিমতো অসম্ভব। নিজের দিনে তিনি ম্যাচের গতি নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা এতটুকু হারান না। গত সাতটি পূর্ণ প্রিমিয়ার লিগ মৌসুমে তাঁর পাস সফলতার হার ৯১.৮ শতাংশ। একই সময়ে ম্যাচপ্রতি গড়ে তিনি ১০৮.৭ বার বল স্পর্শ করেছেন, যা গত মৌসুমের যেকোনো মিডফিল্ডারের চেয়ে বেশি। সেই একই নৈপুণ্য বিশ্বকাপেও দেখিয়েছেন রদ্রি।

রদ্রির হাতেই বিশ্বকাপ ট্রফি
এএফপি

স্পেন দলে রদ্রির ভূমিকা মূলত ‘সাইলেন্ট কিলারের’। মাঠে তাঁর উপস্থিতি খুব মনোযোগ দিয়ে না দেখলে হয়তো ধরাই যায় না। কিন্তু এটাই তাঁর অস্ত্র। মাঠে রদ্রি যত নীরব, ঠিক ততটাই ভয়ংকর।

নীরবেই তিনি ম্যাচের রূপ, খেলার ধরন ও গতিপ্রকৃতি বদলে দেন। যেখানে তাঁর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কাজ হলো সতীর্থদের জন্য সুরটা ঠিকঠাক বেঁধে দেওয়া। পাশাপাশি রদ্রি যখন নিজের ছন্দ ধরে রেখে মাঠে বিচরণ করেন, তখন প্রতিপক্ষ নিজেদের অর্ধ থেকে বেরই হতে পারে না এবং মাঝমাঠে আলগা বলগুলোও বেশির ভাগ সময় তাঁর নিয়ন্ত্রণে চলে আসে।

আরও পড়ুন

পজিশনিং দুর্দান্ত না হলে এই কাজগুলো এতটা নিখুঁতভাবে করা কখনোই সম্ভব নয়। যে কারণে বিশ্বকাপে স্পেনের ১টির বেশি গোল হজম না করার নেপথ্যে নায়কও রদ্রি।

মিডফিল্ডেই মূলত প্রতিপক্ষের আক্রমণগুলো এমনভাবে গুঁড়িয়ে দেন, ফলে সেগুলো নিজেদের বক্স পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে না। আর যেগুলো পৌঁছায়, সেগুলোকেও দুর্দান্তভাবে কাউন্টার প্রেস করে অঙ্কুরেই বিনাশ করে দেন। এ ছাড়া পুরো ৯০ মিনিট ধরে রদ্রি এত ছোট ছোট অবদান রাখেন যে তা অনেক সময় চোখেই পড়ে না। আর এ কারণেই বিশ্বকাপে রদ্রির অবদান হয়ে উঠেছে হিরণ্ময়।

ফিফার ফুটবল পারফরম্যান্স ইনসাইটসের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, পুরো টুর্নামেন্টে কাউন্টার-প্রেসিংয়ের মাধ্যমে সবচেয়ে বেশি বল পুনরুদ্ধার করেছেন রদ্রিই। অর্থাৎ বল হারানোর কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই প্রতিপক্ষের ওপর চাপ সৃষ্টি করে বল ফিরে পাওয়ার ক্ষেত্রে তিনি ছিলেন অনন্য।

ফাইনাল শেষে অনন্য রদ্রি নিজের অনুভূতি জানিয়ে বলেন, ‘এখনো আমরা যেন বিশ্বাসই করতে পারছি না। মনে হচ্ছে যেন মেঘের ওপর ভাসছি। সত্যি বলতে, এই অনুভূতি ভাষায় প্রকাশ করা কঠিন।’

বিশ্বকাপ–সেরা রদ্রি অবশ্য চাইলে মেঘের ওপর ভাসতেই পারেন। তবে মাঠে আড়াল থেকে পারফর্ম করে স্পেনকে বিশ্বকাপ জেতানো রদ্রিকে সেই মেঘের ভেতর সাধারণ চোখগুলো খুঁজে পাবে কি না, তা বলা মুশকিলই!

আরও পড়ুন