কেন ডিফেন্ডার বিশ্বনাথকে স্ট্রাইকার হিসেবে খেলালেন ডুলি
ভুটানের বিপক্ষে ১-০ গোলের কষ্টার্জিত কিন্তু মূল্যবান জয় শেষে সংবাদ সম্মেলনে এলেন বাংলাদেশ জাতীয় ফুটবল দলের কোচ টমাস ডুলি। ঢাকার জাতীয় স্টেডিয়ামে জয় দিয়ে ১৫তম সাফ শুরুর স্বস্তি থাকলেও কোচের গলা ভেঙে গিয়েছিল। তবে সব আলোচনা ছাপিয়ে বড় কৌতূহল ছিল ডিফেন্ডার বিশ্বনাথ ঘোষকে হঠাৎ স্ট্রাইকার হিসেবে নামিয়ে দেওয়া হলো কেন?
সংবাদ সম্মেলনের শুরুতেই বিশ্বনাথকে নিয়ে এই সিদ্ধান্তের পেছনের মূল কারণ ও নিজের ফুটবল ভাবনার কথা খোলাসা করেন কোচ। বাংলাদেশ দলে একজন প্রথাগত প্রাকৃতিক ‘নাম্বার নাইন’ বা মূল স্ট্রাইকারের ঘাটতি দীর্ঘদিনের। ভুটানের বিপক্ষে ম্যাচে বিশ্বনাথকে ওপরে খেলানোর কারণ নিয়ে প্রশ্ন করা হলে প্রধান কোচ ডুলি বলেন, ‘আমরা স্বীকার করি যে আমাদের দলে একজন প্রথাগত ‘নাম্বার নাইন’ (প্রথাগত স্ট্রাইকার) নেই এবং আমাদের একজন খুঁজে বের করতে হবে। বিশ্বনাথ অনেক আক্রমণাত্মক খেলোয়াড়।’
বিশ্বনাথকে কখনো ঘরোয়া ফুটবলে স্ট্রাইকার হিসেবে খেলতে দেখা যায়নি। আন্তর্জাতিক ম্যাচে তো নয়ই। সবাইকে চমকে দিয়ে আজ তাঁকে নাম্বার নাইন পজিশনে দাঁড় করান ডুলি; আর এমন সিদ্ধান্ত নেওয়ার পেছনের কারণটাও জানান তিনি, ‘আমি সান মারিনোতে থাকতেই তাকে বলেছিলাম যে তাকে সেন্ট্রাল-ব্যাক হিসেবে খেলালে তার তীব্রতার কারণে প্রতিপক্ষকে পেনাল্টি (উপহার) দেওয়া বা লাল কার্ড খাওয়ার ঝুঁকি থাকে। আমার মনে হয়েছিল সে রাইট-ব্যাক হিসেবে খেলতে পারে; কিন্তু সেখানেও তাকে বক্সের ভেতরে ডিফেন্ড করতে হবে। সান মারিনোর বিপক্ষে আমি তাকে রাইট-ফরোয়ার্ড হিসেবে খেলিয়েছিলাম এবং সে অসাধারণ কাজ করেছিল। সে গোলরক্ষকের সঙ্গে দুটি ওয়ান-অন-ওয়ান সুযোগ পেয়েছিল, আমাদের দ্বিতীয় গোলে অ্যাসিস্ট করেছিল এবং দারুণ এনার্জি দিয়ে প্রতিপক্ষের ডিফেন্ডারদের চাপে রেখেছিল। সে তার পূর্ণ ক্ষমতা দিয়ে খেলে, যা আমার খুব পছন্দ।’
বিশ্বনাথকে বিরতির কিছু সময় কোচ তুলে নেন। তবে যতক্ষণ মাঠে ছিলেন বল প্রেস করছেন, প্রতিপক্ষের রক্ষণে রেখেছেন নিজের ব্যস্ত উপস্থিতি। বলের পেছনে ছুটেছেন। কিছু পাসও খেলেছেন। একটা ভালো হেডও নেন। তবে সেটি পোস্টের বাইরে যায়।
তবে শেষ পর্যন্ত নিজেদের জাল অক্ষত রাখতে পারেনি ভুটান। গোল পেয়েছে বাংলাদেশ। সেই তৃপ্তির সঙ্গে গোটা ম্যাচ নিয়েও বাংলাদেশ কোচ খুশি, ‘ডান পাশে সাদ দারুণ খেলছে এবং তারিক রক্ষণে ভালো করছে। তাই আমি চেয়েছিলাম, বিশ্বনাথ এমন পজিশনে খেলুক, যেখানে সে দলকে সবচেয়ে বেশি সাহায্য করতে পারবে। নাম্বার নাইন হিসেবে আপনাকে সেখানেই যেতে হবে, যেখানে আঘাত পাওয়ার ঝুঁকি থাকে এবং সে এতে মোটেও পিছপা হয় না। আশা করছিলাম, সে আজ গোল পাবে; তবে সুযোগটিতে ভাগ্য সহায় না হলেও তাঁর অবদান নিয়ে আমি অত্যন্ত সন্তুষ্ট।’
মাত্র এক গোলে জিতলেও কোচ সন্তুষ্টির কথাই বললেন, ‘সামগ্রিকভাবে দলের খেলায় আমি খুশি। আমরা ম্যাচটি জিতেছি এবং ৩ পয়েন্ট পেতে চেয়েছিলাম, যা পেয়েছি। প্রথমার্ধে ২০ থেকে ৩০ মিনিট এবং দ্বিতীয়ার্ধে ২০ মিনিট আমরা খুব ভালো বল মুভমেন্ট দেখিয়েছি এবং সুযোগ তৈরি করেছি।’
কোচ প্রশংসা করেন রক্ষণেরও, ‘রক্ষণে আমরা খুবই সুসংগঠিত ছিলাম, যা আমাদের জন্য ভালো ছিল। ইন্দোনেশিয়ার সাম্প্রতিক ম্যাচগুলো থেকে শিক্ষা নিয়ে আমাদের অগোছালো না খেলে সুসংগঠিত থাকতে হয়েছে। একসঙ্গে কাজ করার অল্প সময়ের বিচারে দল যেভাবে খেলেছে, তাতে আমি খুবই আনন্দিত।’
কোচের কথায়, ‘প্রথম ৩০ মিনিটের মতো একই গতি বা তীব্রতায় আপনি পুরো ৯০ মিনিট খেলতে পারবেন না। মনোযোগ হারালে বা ক্লান্ত হয়ে পড়লে প্রতিপক্ষ সুযোগ খুঁজে নেবেই। আপনি যখন পিছিয়ে আসবেন, তখন ভালো মানের খেলোয়াড়েরা খেলার জায়গা পেয়ে যায়। যতক্ষণ আমরা শারীরিক স্পর্শ বজায় রাখি এবং তাদের চাপে রাখি, ততক্ষণ আমরা ভালো খেলি। আমরা প্রায় ১৫ মিনিটের জন্য খানিকটা ব্যাকফুটে চলে গিয়েছিলাম, যা নিয়ে আমরা দলের সঙ্গে পর্যালোচনা করব; তবে সামগ্রিক পারফরম্যান্সে আমি সন্তুষ্ট।’
তবে দলের কিছু সমস্যাও বের করেছেন কোচ, ‘আমাদের অনেক সুযোগ ছিল, কিন্তু আপনি তখনই গোল পাবেন যখন বক্সে পর্যাপ্ত খেলোয়াড় থাকবে। আমরা বিপক্ষের ৭-৮ জন ডিফেন্ডারের বিরুদ্ধে বক্সে মাত্র ১ বা ২ জন খেলোয়াড় নিয়ে খেলছিলাম, যা আমরা ভবিষ্যতে পরিবর্তন করতে চাই।’
ম্যাচে দৌড়াতে দৌড়াতে ক্লান্ত বিশ্বনাথের বদলে নামানো হয় ইব্রাহিমকে, যিনি মাঠে নেমেই গোল করে জয় নিশ্চিত করেন। ইব্রাহিমকে নিয়ে কোচের মূল্যায়ন, ‘নতুন একটি দেশের দায়িত্বে এলে সময়ের সঙ্গে প্রতিটি খেলোয়াড়ের মান বুঝতে হয়। মাঝে মাঝে খেলোয়াড়রা লাজুক হয় এবং অনুশীলনে শুরুতেই সবটা দেখাতে পারে না। ইব্রাহিম সম্প্রতি অনুশীলনে দুর্দান্ত পারফর্ম করে দলে জায়গা করে নিয়েছে।’
বিশ্বনাথ ক্লান্ত হয়ে পড়ছিলেন, আর ইব্রাহিম এমন একজন যিনি বল ধরে রাখতে পারেন। সোহেল ও রাকিবদের মতো মিডফিল্ডারদের সঙ্গে সংযোগ তৈরি করতে পারেন। তাই ইব্রাহিমকে ১০ নম্বর পজিশনে আনেন জানিয়ে ডুলি বলেন, ‘আমি সরাসরি তার কাছ থেকে গোলের আশা করিনি, কিন্তু সে তার ভূমিকা নিখুঁতভাবে পালন করেছে।’