সিঙ্গাপুরের ন্যাশনাল স্টেডিয়ামের গ্যালারির এক বিশাল অংশ তখন লাল-সবুজ আবেগে টইটম্বুর। কর্মব্যস্ততার ক্লান্তি ভুলে প্রায় ৬ হাজার প্রবাসী বাংলাদেশি সেখানে জড়ো হয়েছিলেন সাদা টি-শার্ট পরে। ম্যাচ শুরুর বাঁশি বাজার পর থেকেই তাঁদের গ্যালারি কাঁপানো স্লোগানে মনে হচ্ছিল এটি সিঙ্গাপুর নয়, যেন ঢাকার জাতীয় স্টেডিয়াম।
প্রবাসী সমর্থকদের এমন অফুরান উৎসাহে উজ্জীবিত হয়ে ফুটবলাররা মাঠে আধিপত্য দেখালেও শেষ পর্যন্ত ভাগ্য আর ফিনিশিংয়ের অভাবে আক্ষেপ নিয়ে মাঠ ছাড়তে হয়েছে হামজা চৌধুরীদের। সিঙ্গাপুরের কাছে ১-০ গোলের হার দিয়ে এশিয়ান কাপ বাছাইয়ের মিশন শেষ করল বাংলাদেশ।
আক্ষেপটা আসলে আরও বড় হয়ে উঠছে পুরো বাছাইপর্বের খতিয়ানে চোখ রাখলে। শুরুটা হয়েছিল গত বছর ২৫ মার্চ; হামজা চৌধুরীর অভিষেক ম্যাচে শিলংয়ে ভারতের সঙ্গে দারুণ খেলেও ড্র নিয়ে ফিরতে হয়েছিল। হামজার পর দলে যোগ দিলেন শমিত, ফাহামিদুল, জায়ানরা।
দেশের ইতিহাসের অন্যতম শক্তিশালী দল পেয়ে ফুটবল ভক্তরা আশায় বুক বেঁধেছিলেন—হয়তো ৪৫ বছর পর এশিয়ান কাপের মূল মঞ্চে পা রাখা যাবে। কিন্তু ভালো ফুটবল খেলেও সেই স্বপ্ন আর সত্যি হলো না। ৬ ম্যাচে বাংলাদেশের সংগ্রহ মাত্র ৫ পয়েন্ট।
অন্যদিকে ৬ ম্যাচে সর্বোচ্চ ১৪ পয়েন্ট নিয়ে দীর্ঘ ৪২ বছর পর এশিয়ান কাপের চূড়ান্ত পর্বে জায়গা করে নিয়েছে সিঙ্গাপুর। অবশ্য আগের ম্যাচে হংকংকে হারিয়েই তারা টিকিট নিশ্চিত করে ফেলেছিল। আজ বাংলাদেশের বিপক্ষে জয় সেই সাফল্যে বাড়তি রং চলাল।
২০২৭ এশিয়ান কাপের চূড়ান্ত পর্বে যাওয়ার আশা আগেই শেষ হয়ে গিয়েছিল বাংলাদেশের। তাই সিঙ্গাপুরের বিপক্ষে এই ম্যাচ ছিল মূলত মান বাঁচানোর লড়াই। ঢাকায় প্রথম লেগে ২-১ গোলে হারের পর অ্যাওয়ে ম্যাচেও হারের বৃত্ত ভাঙতে পারলেন না হাভিয়ের কাবরেরার শিষ্যরা। অথচ বল দখল আর আক্রমণে বাংলাদেশ ছিল স্পষ্ট ব্যবধানে এগিয়ে। সিঙ্গাপুরের কৃতিত্ব শুধু এটুকুই, ৩১ মিনিটে হারিস স্টুয়ার্টের করা গোলটা তারা শেষ পর্যন্ত আগলে রাখতে পেরেছে।
ম্যাচের প্রথম ১৫ মিনিট ছিল পুরোপুরি লাল-সবুজদের দখলে। আক্রমণাত্মক ফুটবলের পসরা সাজিয়ে সিঙ্গাপুরের রক্ষণভাগকে তটস্থ করে রেখেছিল বাংলাদেশ। ১৪ মিনিটে গোলের সুবর্ণ সুযোগ নষ্ট করেন কানাডাপ্রবাসী শমিত সোম। উইঙ্গার সাদ উদ্দিনের চমৎকার এক নিখুঁত ক্রস ডি-বক্সের ভেতর একদম ফাঁকায় পেয়েছিলেন শমিত, কিন্তু তাঁর নেওয়া হেডটি লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়ে ক্রসবারের ওপর দিয়ে চলে যায়। মুহূর্তেই গ্যালারির হাজারো সমর্থক হতাশায় মাথায় হাত দিয়ে স্তব্ধ হয়ে পড়েন।
খেলার ধারার বিপরীতে ৩১ মিনিটে এগিয়ে যায় স্বাগতিক সিঙ্গাপুর। মাঝমাঠ থেকে এক ঝোড়ো পাল্টা–আক্রমণে কুয়েহর জোরালো শট বাংলাদেশের গোলরক্ষক মিতুল মারমা ঠেকিয়ে দিলেও বল পুরোপুরি ক্লিয়ার করতে পারেননি। ফিরতি বলে ইখসান ফান্দির পাসে হারিস স্টুয়ার্ট বল জালে জড়িয়ে স্বাগতিকদের উল্লাসে মাতান। ৩৯ মিনিটে বক্সে ফাহিম ফাউলের শিকার হলে পেনাল্টির জোরালো আবেদন জানায় বাংলাদেশ, তবে অস্ট্রেলিয়ান রেফারির সাড়া মেলেনি।
প্রথমার্ধের শেষ মুহূর্তে এক বিরল ইতিহাসের সাক্ষী হয় ফুটবল–বিশ্ব; কুয়েহ চোট পেয়ে মাঠ ছাড়লে নামেন ইলহান ফান্দি। ফলে সিঙ্গাপুরের তিন ভাই—ইখসান ফান্দি, ইরফান ফান্দি ও ইলহান ফান্দি একসঙ্গে জাতীয় দলের হয়ে মাঠে খেলার এক অনন্য কীর্তি গড়েন।
দ্বিতীয়ার্ধে সমতায় ফিরতে মরিয়া বাংলাদেশ একের পর এক আক্রমণ শানায়। কোচ কাবরেরা কৌশল বদলে ৭২ মিনিটে মোরছালিন ও ফাহামিদুলকে তুলে মিরাজুল ইসলাম ও বিশ্বনাথ ঘোষকে মাঠে নামান। ম্যাচের ৭৯ মিনিটে দুর্ভাগ্যের চরমে পৌঁছায় বাংলাদেশ। হামজা চৌধুরীর দারুণ এক ক্রস থেকে মিরাজুল শট নিলেও তা গোলপোস্টে লেগে ফিরে আসে। ৮৫ মিনিটে শমিত সোমের শেষ চেষ্টাও প্রতিপক্ষ গোলরক্ষকের গ্লাভসে জমা পড়লে পরাজয় নিশ্চিত হয়ে যায় বাংলাদেশের।
দাপুটে ফুটবল উপহার দিয়েও স্রেফ গোল করতে না পারার খেসারত দিতে হলো কাবরেরার দলকে। জয় না পাওয়ার বিষাদকে সঙ্গী করেই দেশে ফিরছেন হামজারা।