বছর যায়, বছর আসে। মাত্রই অতীত হয়ে যাওয়া বছরটার টুকরো টুকরো সব স্মৃতি স্লাইড শোর মতো আসতে থাকে একের পর এক। আসতে আসতে একসময় একে অন্যের সঙ্গে জড়িয়ে যায়। একটা শেষ না হতেই আরেকটা, একটার ওপরে আরেকটা...যেন স্মৃতির এক রঙিন কোলাজ।
নতুন বছরের প্রথম দিনে নস্টালজিয়ার পথে যাত্রা শুরু করা পুরোনো বছরটা কখনো কখনো হিসাব মেলাতে বলে। কী পেয়েছি, কী পাইনি, কীই–বা পাওয়ার কথা ছিল...। কালের চঞ্চলগতি থমকে দেওয়া কোনো একটা মুহূর্ত কখনো সামনে এসে দাঁড়ায়। উঁকি দিয়ে যায় কতগুলো মুখ।
পাখির বাসার মতো মাথাভর্তি কোঁকড়ানো চুল, নির্মল একটা হাসি—একটা মুখ কি হামজা চৌধুরীর মতো দেখায়! অন্য সব বছরের মতো ২০২৫-এর বাংলাদেশের ক্রীড়াঙ্গনেও কত ঘটনার ঘনঘটা। পাওয়া না–পাওয়া, আনন্দ-বেদনার কত গল্প।
সাফল্যে কারও মুখে হাসি, ব্যর্থতায় কারও–বা চোখে জল। আর বড় মঞ্চের খেলাতে কোনো কিছুই তো আর ব্যক্তিগত থাকে না। ব্যক্তির অর্জনে আন্দোলিত হয় সমষ্টি। আবেগ ছুঁয়ে যায় পুরো দেশকে। কেউ কেউ হয়ে ওঠেন সেই আবেগেরই আরেক প্রতিশব্দ। মাত্রই শেষ হওয়া বছরটিতে বাংলাদেশের খেলার জগতে হামজা চৌধুরীর চেয়ে বেশি আর কেউই যা হয়ে উঠতে পারেননি।
নির্দিষ্ট একজন খেলোয়াড়ের কোনো দেশের একটা খেলাকে এভাবে জাগিয়ে তোলার উদাহরণ বাংলাদেশে তো বটেই, বিশ্ব ক্রীড়াঙ্গনেও খুব বেশি খুঁজে পাওয়া যাবে না। সেটাও আবার যেনতেন খেলা নয়। জনপ্রিয়তা ও বিস্তার বিবেচনায় তর্কাতীতভাবে এই বিশ্বের এক নম্বর খেলা। ইউরোপিয়ান ফুটবল আর বিশ্বকাপ নিয়ে মাতামাতি বুঝিয়ে দেয় জনপ্রিয়তায় ফুটবল বাংলাদেশেও এক নম্বরেই আছে। তবে শুধুই বাংলাদেশের ফুটবল বললে অনেক দিনই তা ক্রিকেটের কাছে হারিয়ে ফেলেছে সেই মর্যাদা।
ধুঁকতে থাকা সেই বাংলাদেশের ফুটবলকে জিয়নকাঠির ছোঁয়ায় জাগিয়ে তোলার নায়ক হামজা চৌধুরী। তাঁর কল্যাণেই ফুটবলের মরা গাঙে জোয়ার। হ্যামিলিনের বাঁশিওয়ালার মতো অমোঘ আকর্ষণে টেনেছেন সবাইকে। সবুজ পাসপোর্টে লাল-সবুজের প্রতিনিধিত্ব করার পথ খুলে যাওয়ার পর প্রথম যেবার বাংলাদেশে এসেছেন, সিলেট বিমানবন্দর উপচে পড়েছে মানুষ। সেই জনস্রোত ছুটে গেছে হবিগঞ্জের স্নানঘাটে তাঁর গ্রামের বাড়িতেও।
উপচে পড়া কথাটা অনায়াসে ব্যবহার করা যায় গ্যালারির ক্ষেত্রেও। বাংলাদেশের ফুটবল ম্যাচের টিকিট নিয়ে এমন কাড়াকাড়ি অনেক অনেক বছর দেখেনি কেউ। সেটির এমন সোনার হরিণ হয়ে যাওয়াও। ঢাকার মাঠে হামজার অভিষেক ম্যাচে পুরো বাংলাদেশই যেন থাকতে চাইছিল স্টেডিয়ামে!
ইংল্যান্ডের অনূর্ধ্ব-২১ দলে খেলা হামজা চৌধুরীর বাংলাদেশের হয়ে যাওয়ার গল্পটাও খুব রোমাঞ্চকর। অনূর্ধ্ব-২১ জাতীয় দলে খেলার পর যে কেউই মূল জাতীয় দলে খেলার স্বপ্ন দেখবেন। হামজা চৌধুরীও দেখেছিলেন। সেই স্বপ্নপূরণের আর সম্ভাবনা নেই দেখেই বাংলাদেশের আমন্ত্রণে সাড়া দেওয়া। মায়ের সূত্রে ধমনিতে বইতে থাকা বাংলাদেশি রক্ত সেই পথ তো খুলেই রেখেছিল। চাইলে খেলতে পারতেন ক্যারিবিয়ান দ্বীপরাষ্ট্র গ্রেনাডার হয়েও। বাবার সূত্রে ক্যারিবিয়ান রক্তও তো আছে হামজার শরীরে।
টেলিভিশনে ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগে হামজাকে খেলতে দেখেছে এ দেশের মানুষ। লেস্টার সিটির সেই ফুটবলারকে বাংলাদেশ দলে দেখে রোমাঞ্চিত হওয়াটাই স্বাভাবিক ছিল। মাঠে তাঁর কাছে প্রত্যাশার পুরোটাই মিটিয়ে দিয়েছেন মাঠে। তবে সবার মন জয় করার কাজটা শুধু মাঠের নৈপুণ্যেই সম্ভব ছিল না। হামজার স্মিত ব্যক্তিত্বেরও বড় ভূমিকা এতে।
ইংল্যান্ডে হয়তো খুব বড় তারকা হিসেবে বিবেচিত হন না, তবে বাংলাদেশের ফুটবলে তো অভিষেকের আগে থেকেই তিনি বড় তারকা। ইংল্যান্ডে বেড়ে উঠেছেন, খেলেছেন ইউরোপিয়ান মঞ্চে, বিশ্ব ফুটবলে পেছনের বেঞ্চের ছাত্র বাংলাদেশে তারকাসুলভ অহমিকাকে সঙ্গে করে নিয়েই আসতে পারতেন, যা একদমই আনেননি। ওটা আসলে হামজার চরিত্রেই নেই।
বিনয়ের পরাকাষ্ঠা হয়ে ছোট–বড়নির্বিশেষে সবার সঙ্গে একই রকম সহজভাবে মিশেছেন। তাঁকে নিয়ে দর্শক আগ্রহ কখনো সীমা ছাড়িয়ে ঈষৎ ধাক্কাধাক্কির রূপও নিয়েছে, হামজা চৌধুরীর মুখের হাসিটা তারপরও অমলিনই থেকেছে। নেপালের বিপক্ষে বাইসাইকেল কিকে ওই গোলটা যেমন সবার মনে খোদাই হয়ে গেছে, তেমনি হামজার মুখের ওই হাসিটাও।
মার্কিন সাময়িকী টাইম কাকে ‘পারসন অব দ্য ইয়ার’ নির্বাচন করল, এটা পুরো বিশ্বেই কৌতূহলের বিষয় হয়ে আছে সেই ১৯২৭ সাল থেকে। এই নির্বাচনে বড় বিবেচনা হয়ে থাকে কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের প্রভাব। একই মানদণ্ড মাথায় রেখে ২০২৫ সালে বাংলাদেশের ‘স্পোর্টসপারসন অব দ্য ইয়ার’ নির্বাচন করতে গেলে নিশ্চিত হামজা চৌধুরীর কোনো প্রতিদ্বন্দ্বীই থাকবে না। সাকিব আল হাসান ছাড়া আর কোনো ক্রীড়াবিদকে নিয়ে বাংলাদেশে কখনো এত মাতামাতি হয়েছে বলে মনে হয় না। বছরও ঘোরেনি বাংলাদেশের হয়েছেন, এরই মধ্যে চায়ের কাপে ঝড় তুলেছে এমন আলোচনাও—কে বাংলাদেশের খেলার বড় তারকা, সাকিব আল হাসান না হামজা চৌধুরী? এই প্রশ্নে হামজার উত্তরটাও চিনিয়ে দিয়েছে মানুষ হামজাকে।
হামজা চৌধুরীর আগেও বাংলাদেশ দলে প্রবাসী ফুটবলার খেলেছেন, হামজা-উন্মাদনায় আকৃষ্ট হয়ে এর পরেও অনেকে। এতে বাংলাদেশের ফুটবল নিয়ে আগ্রহ বেড়েছে, মাঠে ছুটে যাচ্ছে দর্শক, আসছে স্পনসরও। কিন্তু হামজা-ছোঁয়ায় এ যে উন্মাদনা, সেটিকে কাজে লাগানোর জরুরি কাজটা কি হচ্ছে? গোছানো ও প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ ঘরোয়া ফুটবলের সঙ্গে তৃণমূলে খেলার নিয়মিত আয়োজন? এটাই তো শুধু তুলে আনতে পারে ভবিষ্যতের হামজাদের। বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশনের কার্যতালিকায় এসব আছে কি না, সেটাই তো সন্দেহ হয়। হামজাকে নিয়ে উন্মাদনা সুদূরপ্রসারী প্রভাব রাখার বদলে ক্ষণিকের বুদ্বুদ হয়ে থাকার আশঙ্কাকে তাই উড়িয়ে দিতে পারি না।
মাথাভর্তি কোঁকড়া চুল হামজা চৌধুরীকে যেমন অনেক দূর থেকেও চিনিয়ে দেয়, আলাদা করে দেয় মাঠে আর দশজনের চেয়ে, চলে যাওয়া বছরটার শেষ দিকে মাথাভর্তি কোঁকড়া চুলের আরেক তরুণও তেমনি চিনিয়েছেন নিজেকে। সতীর্থরা যাঁকে ‘হামজা’ বলে ডাকতে শুরু করেছেন। এতে চুলের মিল যেমন বোঝা যায়, তেমনি বাংলাদেশের ক্রীড়াঙ্গনে হামজার প্রভাবও।
তা কী করেছেন ‘হকির হামজা’? বলছি। গত বছরই প্রথম হকির কোনো বিশ্বকাপে খেলার সুযোগ পেয়েছিল বাংলাদেশ। যুব বিশ্বকাপে খুব যে প্রত্যাশা নিয়ে গিয়েছিল, এমনও নয়। বাংলাদেশের যুবারা চমকেই দিয়েছেন সবাইকে। সবচেয়ে বেশি মাথাভর্তি কোঁকড়া চুলের ওই আমিরুল ইসলাম।
সরলভাবে দেখলে ২৪ দলের মধ্যে ১৭তম হওয়াটাকে খুব বড় অর্জন বলে মনে না-ই হতে পারে, তবে অস্ট্রেলিয়া-ফ্রান্সের মতো দলের চোখে চোখ রেখে লড়াই আর কোরিয়া-অস্ট্রিয়ার মতো দলের বিপক্ষে জয়কে হাততালি দেবেন না? নিচের দিকের আট দলের মধ্যে সেরা হয়ে চ্যালেঞ্জার্স ট্রফি জয় কি মনে একটা আনন্দের ঢেউ তোলে না! অবশ্যই তোলে, তবে প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই একটা দীর্ঘশ্বাসও যে পড়ে।
বছরের পর বছর ঘরোয়া হকি হয় না। দীর্ঘমেয়াদি কোনো পরিকল্পনার তো কোনো প্রশ্নই নেই। এই যে বিশ্বকাপের মতো আসর ড্র্যাগ ফ্লিক দিয়ে মাতিয়ে এলেন ‘হকির হামজা’, ১৮ গোল করে যিনি টুর্নামেন্টের সর্বোচ্চ গোলদাতা, সেই আমিরুল ইসলামের বিশ্বসেরাদের একজন হওয়ার স্বপ্নটা তাহলে পূরণ হবে কীভাবে?
এ প্রশ্ন অবশ্য বাংলাদেশের সব খেলা নিয়েই তোলা যায়। শক্তিশালী ঘরোয়া কাঠামো নেই, তৃণমূল পর্যন্ত বিস্তৃতি নেই, নেই ভবিষ্যৎমুখী কোনো পরিকল্পনাও। ক্রিকেট-ফুটবল হয়তো কিছুটা ব্যতিক্রম, বাকি খেলার খেলোয়াড়দের ন্যূনতম আর্থিক নিরাপত্তাও নেই। ২০২৫-এর দিকে ফিরে তাকিয়ে যে কথাগুলো বলছি, ২০২৬-এর দিকে সামনে তাকিয়েও তা গুঞ্জরিত হচ্ছে মনে। হামজা চৌধুরী বা আমিরুল ইসলামের মতো কেউ না কেউ হয়তো মন রাঙাবেন নতুন বছরেও। কিন্তু বাংলাদেশের রুগ্ণ ক্রীড়াঙ্গন কি সত্যিকার অর্থেই নতুন দিনের গান গাইবে? আশা করতেও এখন ভয় হয়।
উৎপল শুভ্র
প্রধান ক্রীড়া সম্পাদক, প্রথম আলো