‘অবিশ্বাস্য, এমন রাতের স্বপ্নই দেখে সবাই।’
রাতটা ফেদে ভালভের্দের জন্য স্বপ্নের মতো ছিল বলেই ম্যাচ শেষে মুভিস্টারকে কথাটা বলেছেন। ট্রেন্ট আলেক্সান্দার-আর্নল্ড সেটা দেখেছেন খুব কাছ থেকে। সতীর্থ হওয়ায় ভালভের্দেকে দেখছেন আসলে প্রতিনিয়তই—ম্যাচ থেকে অনুশীলনে। চ্যাম্পিয়নস লিগে গতকাল রাতে ম্যানচেস্টার সিটির বিপক্ষে ভালভের্দের হ্যাটট্রিকের পর ইংরেজ এই রাইটব্যাকের প্রতিক্রিয়াই সব বলে দেয়। ভালভের্দে তাঁর চোখে, ‘বিশ্বের সবচেয়ে অবমূল্যায়িত ফুটবলার।’ ওদিকে রিয়াল মাদ্রিদ কোচ আলভারো আরবেলোয়া বলছেন, ভালভের্দেই রিয়ালের ‘বেঞ্চমার্ক’।
বার্নাব্যুতে সিটির বিপক্ষে শেষ ষোলো প্রথম লেগ ৩-০ গোলে জিতেছে রিয়াল। প্রথমার্ধে ৪২ মিনিটের মধ্যে হ্যাটট্রিক করেন ভালভের্দে। তিনটি গোল করেন ২২ মিনিটের মধ্যে। চোটের কারণে রিয়ালের খেলোয়াড়ের তালিকায় কিলিয়ান এমবাপ্পের নাম না দেখে সিটির সমর্থকেরা নিশ্চয়ই খুশিই হয়েছিলেন। কিন্তু কে জানত, ভালভের্দে এ ম্যাচেই জীবনের অন্যতম সেরা রাতটি কাটাবেন!
প্রথম মিডফিল্ডার হিসেবে রিয়ালের হয়ে চ্যাম্পিয়নস লিগে হ্যাটট্রিক করলেন ভালভের্দে। পূর্ববর্তী সংস্করণ ইউরোপিয়ান কাপও বিবেচনায় নিলে ভালভের্দে রিয়ালের ইতিহাসে হ্যাটট্রিক করা দ্বিতীয় মিডফিল্ডার। ১৯৬৮ সালে সাইপ্রাসের ক্লাব এইএলের বিপক্ষে হ্যাটট্রিক করেন পিরি। ৫৮ বছর পর এ তালিকায় রিয়ালের স্প্যানিশ কিংবদন্তির একাকিত্ব ঘোচালেন ভালভের্দে।
সেটাও কী দারুণভাবে! একে তো দলীয় অধিনায়ক, নেতৃত্ব দিয়েছেন সামনে থেকে। দূরপাল্লার সব শট এবং গোটা মাঠ চষে খেলার জন্য ভালভের্দের আলাদা খ্যাতি থাকলেও গোল করায় তাঁর মুনশিয়ানা তেমন দেখা যায়নি। চ্যাম্পিয়নস লিগে যেমন সিটি বার্নাব্যুতে যাওয়ার আগে ২৬ ম্যাচে ভালভের্দের গোল ছিল না। এই প্রতিযোগিতার ম্যাচে কখনো একটির বেশি গোল করেননি। অথচ দলের প্রয়োজনে এমন ম্যাচে সেই ভালভের্দেই কিনা আস্তিন থেকে বের করে আনলেন ক্যারিয়ারের প্রথম হ্যাটট্রিক!
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে রিয়াল সমর্থকদের মধ্যে ভালভের্দেকে নিয়ে একটি মজার কথা প্রচলিত, ‘পৃথিবীর তিন ভাগ জল আর বাকিটা ফেদে ভালভের্দে।’ অর্থাৎ স্থলভাগের পুরোটা চষে বেড়ান উরুগুয়ে তারকা। রূপক এ কথা আসলে ভালভের্দের গোটা মাঠ চষে খেলার জন্য বলা হয়। জাবি আলোনসো কোচ থাকতে তাঁকে রাইটব্যাকে খেলানো হলেও এই অভ্যাস কাটা পড়েনি। আরবেলোয়া কোচ হয়ে তাঁকে মিডফিল্ডে খেলানো শুরু করলেও অভ্যাসটা ঠিকই থেকে গেছে। এ কারণে গতকালের ম্যাচেও কি রক্ষণ, কি আক্রমণ—বার্নাব্যুর ‘স্থলভাগে’ প্রায় সব জায়গাতেই দেখা গেল ভালভের্দেকে।
আর সেটা দেখে চোট নিয়ে গ্যালারিতে বসে থাকা রিয়ালের মিডফিল্ড জেনারেল জুড বেলিংহামের সে কী আনন্দ! ভালভের্দের তৃতীয় গোলে বিস্ময়ে কিংবা আনন্দে মুখ হাঁ হয়ে গিয়েছিল ইংলিশ মিডফিল্ডারের। অমন নিখুঁত ফিনিশিং দেখে আসন ছেড়ে স্রেফ লাফিয়ে উঠে দাঁড়ান রিয়ালের হয়ে ওই কাজটি যাঁর, সেই কিলিয়ান এমবাপ্পে। যেন বুকভরা গর্ব নিয়ে ভালভের্দেকে সম্মান জানালেন।
ম্যাচ শেষে ট্রেন্ট আলক্সান্দার-আর্নল্ডের কাছে এমবাপ্পের এমন প্রতিক্রিয়ার প্রসঙ্গ টানার পর টিএনটি ও সিবিএস স্পোর্টসকে তিনি বলেন, ‘আমারও (মাঠে) একই রকম লেগেছে। লিভারপুলের হয়ে খেলার সময়ও বলেছি এবং তার প্রশংসা করেছি। সে নিঃসন্দেহে পৃথিবীর সবচেয়ে অবমূল্যায়িত ফুটবলার। তার সঙ্গে খেলার সময় বোঝা যায়, দলকে সে কতটা নিংড়ে দেয়। মাঠের এক ইঞ্চি ঘাসও রেহাই পায় না। এমন কিছু নেই যে করতে পারে না। কোনো অভিযোগ নেই। ম্যাচের পর ম্যাচ নিজেকে শেষ সীমায় ঠেলে দেয়।’
ট্রেন্ট আলেক্সান্দার-আর্নল্ড এরপর নিজের রায়টা বলে দেন, ‘লোকে একমত হোক বা না হোক, সে অবশ্যই বিশ্বের অন্যতম সেরা মিডফিল্ডার এবং সেটা বহু বছর ধরেই।’
রিয়াল কোচ আরবেলোয়ার কাছে ভালভের্দে একুশ শতকের হুয়ানিতো, ‘তাকে যেখানে খুশি খেলাতে পারেন। আমার কাছে সে একুশ শতকের হুয়ানিতো (রিয়াল আইকন)। মাদ্রিদিসিমোদের জন্য বেঞ্চমার্ক। একজন মাদ্রিদ খেলোয়াড়ের যা যা থাকা উচিত, তার মধ্যে সবই আছে। এমন একটি রাত তার প্রাপ্য এবং এই রাত সে কখনো ভুলবে না।’
অবশ্যই না। ভালভের্দে নিজেও বলেছেন সে কথা, ‘আজ সত্যিই উপভোগ করেছি। অনেক দিন পর এমন উপভোগ্য ম্যাচ খেললাম।’
ভালভের্দে প্রতিদিন এমন খেলেন না। সেটা সম্ভবও না। তবে রিয়াল বিপদে পড়লে কীভাবে যেন তাঁর ভেতর থেকে এই খেলাটা বেরিয়ে আসে। গত শুক্রবার লা লিগায় যেমন সেল্তা ভিগোর বিপক্ষে রিয়াল ১-১ গোলে সমতায় থাকতে ৯৪ মিনিটে গোল করে জিতিয়েছেন দলকে। গতকাল রাতেও যেমন এমবাপ্পে-বেলিংহামহীন রিয়ালকে পথ দেখালেন প্রায় একাই। সেটা এতটাই তীব্রতায় যে প্রথমার্ধে করা হ্যাটট্রিকে উঠে আসছে লিওনেল মেসির প্রসঙ্গও।
চ্যাম্পিয়নস লিগের ইতিহাসে ইংলিশ ক্লাবের বিপক্ষে প্রথমার্ধে হ্যাটট্রিক করা দ্বিতীয় খেলোয়াড় ভালভের্দে। প্রথমজনের নাম বলা হয়েছে আগেই!