শরণার্থীশিবির থেকে বিশ্বকাপের মঞ্চে: অস্ট্রেলিয়ার ফুটবলে আফ্রিকান রূপকথা

আওয়ার মাবিলএএফপি

জন্ম শরণার্থী শিবিরে। বেড়ে ওঠাও সেখানে। আফ্রিকার যুদ্ধবিগ্রহ ও সংঘাতের কারণে বাস্তুচ্যুত হয়ে শরণার্থীশিবিরে বেড়ে এমনই তিন খেলোয়াড় এখন বিশ্ব ফুটবলের সবচেয়ে বড় মঞ্চে—বিশ্বকাপে! শুধু খেলবেনই না, অস্ট্রেলিয়ার আক্রমণভাগের দায়িত্ব সামলানোর ভারও তাঁদের কাঁধে। এই তিন খেলোয়াড়ের নাম মোহাম্মদ তুরে, নেস্তরি ইরানকুন্ডা ও আওয়ার মাবিল।

তিনজনের মধ্যে তুরে ও ইরানকুন্ডার রোমাঞ্চটা একটু বেশিই। আজ তুরস্কের বিপক্ষে অস্ট্রেলিয়ার প্রথম ম্যাচটিই দুজনের বিশ্বকাপ অভিষেক। আর তাঁদের এই স্বপ্নযাত্রায় ‘বড় ভাই’ হিসেবে আগলে রাখার দায়িত্বটা দ্বিতীয়বার খেলতে আসা মাবিলের।

অস্ট্রেলিয়া দলের তিন শরণার্থীর একেকজনের গল্পটা একেক রকম। এই যেমন লাইবেরিয়ার গৃহযুদ্ধ থেকে বাঁচতে তুরের বাবা-মা পালিয়ে গিনির এক শরণার্থীশিবিরে আশ্রয় নিয়েছিলেন, সেখানেই জন্ম তুরের। বুরুন্ডিয়ান বাবা-মায়ের সন্তান ইরানকুন্ডা পৃথিবীর আলো প্রথম দেখেছিলেন তানজানিয়ার এক শরণার্থীশিবিরে।

আর সুদানের গৃহযুদ্ধের কারণে বাস্তুচ্যুত হয়ে মাবিলের ১০টি বছর কেটেছে কেনিয়ার শরণার্থীশিবিরে। আফ্রিকার ভিন্ন দেশ থেকে ভিন্ন ভিন্ন শরণার্থীশিবিরে ঠাঁই নেওয়া এই তিন ফুটবলারের এক হয়েছেন অস্ট্রেলিয়ার অ্যাডিলেডে। তুরে ও ইরানকুন্ডা একসঙ্গে অ্যাডিলেড ইউনাইটেডে খেলেছেনও।

মোহাম্মদ তুরে
ইনস্টাগ্রাম

অস্ট্রেলিয়ার প্রায় ৫ লাখ আফ্রিকান অভিবাসীর কাছে এই ত্রয়ী এখন মহাতারকা। বিশ্বকাপের গ্রুপ পর্বের বৈতরণি পার হয়ে প্রথমবারের মতো কোনো নকআউট ম্যাচ জেতার স্বপ্ন দেখছে অস্ট্রেলিয়া, আর সেই স্বপ্নপূরণের অন্যতম ভরসা এ তিনজনই।

আর তাদের জন্যও এটা শুধু বিশ্বকাপে পারফর্ম করার মঞ্চই নয়, অস্ট্রেলিয়াকে কিছু দেওয়ার সুযোগও। ইংল্যান্ডের দ্বিতীয় সারির লিগে খেলা ২২ বছর বয়সী তুরের কথাটাই শুনুন, ‘অস্ট্রেলিয়া আমাদের বেঁচে থাকার সুযোগ করে দিয়েছে। আমার মনে হয়, দেশের হয়ে অবদান রাখাই হলো সেই ঋণ শোধ করার সেরা উপায়।’

দলেরও তাঁর কাছ থেকে প্রত্যাশা বেশি। মাত্র ১০টি আন্তর্জাতিক ম্যাচ খেলার অভিজ্ঞতা থাকলেও নরউইচ সিটিতে ১১ ম্যাচে ৯ গোল করা এই স্ট্রাইকারই অস্ট্রেলিয়ার কোচ টনি পপোভিচের প্রথম পছন্দ।

আরও পড়ুন

ইরানকুন্ডা তো ২০২৪ সালে বায়ার্ন মিউনিখেও নাম লিখিয়েছিলেন। তবে মূল দলে একটি ম্যাচও খেলার সুযাগ না পেয়ে বর্তমানে তিনি ইংলিশ লিগের দল ওয়ার্টফোর্ডে। ২০ বছর বয়সী এই ফরোয়ার্ড অস্ট্রেলিয়ার হয়ে ১৫ ম্যাচে করেছেন ৫ গোল। মাঠের পারফরম্যান্সের পাশাপাশি গোল উদ্‌যাপনের নজরকাড়া ভঙ্গির কারণেও তিনি অস্ট্রেলিয়ার আলোচিত মুখ।

এই দুজনের মতো ৩০ বছর বয়সী মাবিলের জায়গা অস্ট্রেলিয়া দলে খুব একটা নিশ্চিত ছিল না। স্পেনের দ্বিতীয় বিভাগের দল ক্যাস্তোলিয়নে ভালো খেলে মার্চে জাতীয় দলে ফেরেন ২ বছর বিরতির পর। ২০২২ আসরের পর আবারও সুযোগ পেয়ে মাবিল তাই বড় কিছুই করতে চান, ‘বিশ্বকাপের স্বাদ গতবারই পেয়েছি, তবে এবারের আসরটা আমার জন্য বাড়তি গুরুত্বের। কারণ, গত কয়েক বছর ভালো কাটেনি।’

নেস্তরি ইরানকুন্ডা
ইনস্টাগ্রাম

অস্ট্রেলিয়া দলে শুধু মাবিল, তুরে ও ইরানকুন্ডাই নন, আফ্রিকান বংশোদ্ভূত ফুটবলার আছেন আরও তিনজন। সে হিসাবে এবারের অস্ট্রেলিয়া স্কোয়াডের প্রায় এক-চতুর্থাংশ খেলোয়াড়ই আফ্রিকান, যা ২০২২ কাতার বিশ্বকাপের তুলনায় দ্বিগুণ।

শরণার্থীদের আশ্রয় দিয়ে অস্ট্রেলিয়ান ফুটবল লাভবান হলেও এ নিয়ে বিতর্ক কম নয়। অনেক রাজনীতিবিই প্রায়ই আবাসন সংকট ও সামাজিক সমস্যার জন্য অভিবাসীদের দায়ী করেন। সেই পরিস্থিতি কিছুটা পাল্টে যেতে পারে, যদি তুরে–ইরানকুন্ডারা এবার অস্ট্রেলিয়াকে আনন্দে ভাসান।

আরও পড়ুন